- জয়দীপ সরকার
‘কী করে নিশ্চিত হব যে, যাকে বাস্তব বলে অনুভব করছি সেও আসলে স্বপ্ন নয়?’ রেনে ডেকার্তের এই প্রশ্ন পশ্চিমী দর্শনের জ্ঞানতত্ত্বে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তারা বিশ্বাস করি, রাত গভীর হলে ঘুমের আলিঙ্গনে যখন বাঁধা পড়ে শরীর, তার একটা পর্যায়ে— যখন শরীর নিস্তেজ থাকে কিন্তু মস্তিষ্ক সক্রিয় (বিজ্ঞানের ভাষায় ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট’ ঘুমচক্র)— তখন ঘুমচোখে আমরা যা দেখি তাই স্বপ্ন। জীবনের বাকি যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভব সব বাস্তব। ‘স্বপ্ন’ শব্দটির যদিও একটি বৃহত্তর অর্থ আছে, কারণ দিন বদলের স্বপ্ন দেখে বলেই তো মানুষ ‘মানুষ’, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে ‘স্বপ্ন’ তাই যা মানুষ ঘুমের ঘোরে দেখে। ডেকার্ত যদিও বলেছেন, স্বপ্নের মধ্যে আমরা এমন অভিজ্ঞতা পাই যা জাগ্রত অবস্থার সঙ্গে ইন্দ্রিয়গতভাবে প্রায় একই রকম, যেমন আমরা স্বপ্নে বসতে, হাঁটতে, কথা বলতে, অনুভব করতে পারি— যেন তা বাস্তব, কিন্তু সাধারণভাবে আমরা স্বপ্নকে অবাস্তব বলেই জানি ও মানি।
জন্মের পরে প্রথম কবে, কী স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, নিশ্চয় আমাদের কারোরই মনে নেই। কিন্তু ঘুমের মধ্যে ছোট্ট শিশু হাসলে বা কাঁদলে, সে স্বপ্ন দেখছে, এটা আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই উচ্চারণ করি, যা থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, আমরা বিশ্বাস করি জন্মের খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই আমরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। পৃথিবীতে এমন কোনও মানুষ নেই, যে স্বপ্ন দেখে না। অদ্ভুত মনে হলেও এটা সত্য, জন্মান্ধ ব্যক্তিরাও স্বপ্ন দেখে। একজন জন্মান্ধ ব্যক্তির স্বপ্ন দেখার সঙ্গে আমাদের স্বপ্ন দেখার পার্থক্য শুধু এটুকু— তাদের স্বপ্নে দৃশ্যমান কোনও ছবি থাকে না; থাকে শব্দ, ঘ্রাণ, স্পর্শ ও আবেগের বুনন। ’৯০-এর দশকে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, জন্মান্ধদের স্বপ্নে বর্ণনামূলক কাঠামো অনেক জটিল, কারণ স্বপ্ন এখানে চোখের নয়, মন ও ইন্দ্রিয়ের এক সম্মিলিত রচনা।
মানুষ ভোররাতে বেশি স্বপ্ন দেখে এবং এর নির্দিষ্ট বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আছে। মানুষের একটি পূর্ণ ঘুমচক্র সাধারণত ৯০ মিনিটের হয়। সেই হিসেবে ৭–৮ ঘণ্টার ঘুমের সময়কালে ৪–৫টি ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট’ ঘুমচক্র থাকে। রাতের প্রথম ভাগে এই ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট’ ঘুমচক্র তুলনামূলকভাবে ছোট হয় (সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের), আর শেষের দিকে দীর্ঘ হয় (৩০–৬০ মিনিটের)। ভোররাতে তাই বেশিরভাগ স্বপ্ন দেখা হয়। এই পর্যায় থেকে যদি কেউ ঘুম থেকে জেগে ওঠে, তার পক্ষে স্বপ্ন মনে রাখার সম্ভাবনাও অনেক বেশি তৈরি হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ গড়ে ৯৫% পর্যন্ত স্বপ্ন ঘুম থেকে ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভুলে যায়। কেবলমাত্র ৫%–১০% স্বপ্নই স্পষ্টভাবে মানুষের মনে থাকে— সেটাও সাধারণত ঘুম থেকে ওঠার প্রথম ১–৫ মিনিটের মধ্যে মনে না রাখলে দ্রুত মিলিয়ে যায়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষভাবে চিহ্নিত করা যায় এমন স্বপ্ন না ভুলে যাওয়া ব্যক্তিরা সপ্তাহে ৩–৫টি স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন, আর সাধারণ মানুষ হয়তো সপ্তাহে ১–২টি।
মানুষের স্বপ্নের ইতিহাসও কিন্তু তার স্বপ্নের মতোই জটিল। প্রাচীন মিশরীয় মানুষেরা বিশ্বাস করতেন, স্বপ্নের মাধ্যমে দেবতারা মানুষকে বার্তা পাঠান। প্রাচীন মিশরে এজন্য ‘স্বপ্ন পুস্তিকা’ তৈরি করা হত, যেখানে স্বপ্নের প্রতীক ও তাদের ভবিষ্যদ্বাণীমূলক অর্থ লেখা থাকত। প্রাচীন সাহিত্য বা রূপকথা যদি আমরা দেখি, আমরা দেখব, মহাকবি হোমারের ‘ইলিয়াড’-এ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত আসে দেবদত্ত স্বপ্নের মাধ্যমে; বাইবেলে যোসেফ স্বপ্ন ব্যাখ্যা করে রাজার ভাগ্য নির্ধারণ করেন; বুদ্ধের জন্মের আগে মায়াদেবীর স্বপ্নে শুভ লক্ষণ ধরা পড়ে। ইতিহাস সাক্ষী, প্রাচীন ব্যাবিলন ও অ্যাসিরিয়ার রাজারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বপ্ন বিশ্লেষকদের পরামর্শ নিতেন। এবং প্রাচীনকাল থেকে এভাবেই স্বপ্ন মানবসভ্যতার ভাবনায় এক গভীর স্থান অধিকার করে এসেছে।
পৃথিবীর মহৎ চিন্তাবিদদের মধ্যে অ্যারিস্টটলই প্রথম মানুষ যিনি বলেছিলেন, স্বপ্ন বাইরের দেবতার কাজ নয়, বরং ইন্দ্রিয় ও মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ফল। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞানে স্বপ্ন ব্যাখ্যার নতুন যুগ শুরু হয় সিগমন্ড ফ্রয়েডের মাধ্যমে। ফ্রয়েডই প্রথম বলেন, প্রতিটি স্বপ্নই আসলে এক ধরনের অবদমিত ইচ্ছার পরিপূরণ। ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্নের মাধ্যমে অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছাগুলো প্রতীকীভাবে বাস্তবায়িত হয়। এমনকি দুঃস্বপ্নের মধ্যেও অবচেতন কামনার প্রতিফলন থাকে। ফ্রয়েড তাই স্বপ্নকে বলেছেন ‘মনের অবচেতনে পৌঁছানোর রাজপথ’।
কিন্তু ফ্রয়েডের শিষ্য কার্ল গুস্তাভ ইয়ং আরও এক গভীর দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, স্বপ্ন কেবল অবদমিত ইচ্ছার প্রকাশ নয়; বরং এটি মানবজাতির সম্মিলিত অবচেতনের প্রতীকী প্রকাশ। ইয়ং স্বপ্নের প্রতীককে মিথ, রূপকথা ও পুরাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তিনি বলেন, স্বপ্ন আসলে আত্ম-উন্মোচনের এক প্রাকৃতিক পথ— যেখানে মন নিজের সঙ্গে কথোপকথনে নামে।
স্বপ্নের চরিত্র, দৃশ্য ও অনুভূতি সবই তৈরি হয় আমাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও আবেগের ভাণ্ডার থেকে। আমরা এমন কোনও মুখ বা স্থান নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি না, যা আমাদের মস্তিষ্ক কোনও না কোনওভাবে কখনও সংরক্ষণ করেনি। এমনকি যে ‘অচেনা’ মুখ আমরা স্বপ্নে দেখি, তা আসলে আমাদের দেখা কোনও এক মুখের অবচেতন ছাপ। এই দিক থেকে স্বপ্ন একদিকে যেমন ব্যক্তিগত স্মৃতির পুনর্লিখন, অন্যদিকে তেমনি সাংস্কৃতিক প্রভাবেরও প্রতিফলন।
সাংস্কৃতিক ভিন্নতার পাশাপাশি, লিঙ্গভেদেও স্বপ্নের প্রকৃতি পালটে যায়। হ্যল এবং ক্যাসল (১৯৬৬)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের স্বপ্নে প্রায় ৬৭% চরিত্রই পুরুষ, অথচ নারীদের স্বপ্নে দুই লিঙ্গের উপস্থিতি প্রায় সমান সমান। নারীদের স্বপ্ন তুলনামূলকভাবে আবেগপ্রবণ ও দীর্ঘস্থায়ী, আর পুরুষদের স্বপ্নে সহিংসতা ও প্রতিযোগিতার প্রবণতা বেশি। এছাড়া মানুষের প্রায় ৮% স্বপ্নই যৌনতা সম্পর্কিত— যাও আবার লিঙ্গভেদে ভিন্ন রূপ ধারণ করে। পুরুষদের স্বপ্নে অপরিচিত নারী ও অপরিচিত স্থান বেশি দেখা যায়, নারীরা প্রায়ই নিজেদের অচেনা পরিবেশে অর্ধনগ্ন অবস্থায় নিজেদের বা পরিচিতদের আবিষ্কার করে— যা মূলত তাদের অবচেতনের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন। আবার সুইজিবল তাঁর ২০০২ সালের গবেষণায় দেখিয়েছেন, টেলিভিশনের সাদাকালো যুগে মানুষের সাদাকালো স্বপ্নের আধিক্য ছিল, আর আজকের রঙিন দৃশ্যপটে মানুষ অনেক বেশি, প্রায় ৮৮ শতাংশ ক্ষেত্রে, রঙিন স্বপ্ন দেখে।
তবে স্বপ্ন আমরা যাই দেখি না কেন, স্বপ্ন দেখাটা কিন্তু সুস্থ শরীর এবং মনের জন্য খুব জরুরি। উইলিয়াম ডিমেন্ট, যাঁকে ঘুমের চিকিৎসার জনক বলা হয়, তাঁর ’৬০-এর দশকে করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যদি একজন মানুষকে বারবার র্যাপিড আই মুভমেন্ট চক্রকালীন ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হয়, তবে কিছুদিনের মধ্যেই সে হ্যালুসিনেশন ও মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে শুরু করে। এর বিপরীতে, যাঁদের স্বপ্নে বাধা দেওয়া হয় না, তাঁদের স্মৃতি ও মানসিক স্থিতিশীলতা উন্নত হয়। যেন স্বপ্ন আমাদের মানসিক ঘর গোছানোর এক অদৃশ্য গৃহপরিচারিকা। স্বপ্ন মানুষের সৃজনশীলতাকে বাড়িয়ে তোলে। অনেক সময়ই স্বপ্নের মধ্যে মানুষ এমন কিছু ধারণা পায়, যা থেকে জন্ম নেয় কোনও মহৎ সাহিত্য বা শিল্পকর্ম বা বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন।
মধ্যযুগে ইউরোপীয় সাহিত্যে স্বপ্নদৃষ্ট কাব্যধারা বিশেষভাবে বিকশিত হয়েছিল। এই ধারার কাব্যে কবি বা নায়ক স্বপ্নে এক রূপক জগতে প্রবেশ করেন, যেখানে তিনি ধর্ম, নৈতিকতা ও সমাজসংক্রান্ত দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন। উইলিয়াম ল্যাংল্যান্ড তাঁর ‘পিয়ার্স প্লাওম্যান’ কবিতায় একাধিক স্বপ্নদৃষ্টির মাধ্যমে সমাজ ও আধ্যাত্মিক সত্য অনুসন্ধান করেছেন। জিওফ্রে চসারও তাঁর ‘দ্য বুক অফ দ্য ডাচেস’-এ স্বপ্নে এক শোকাহত ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনে প্রবেশ করেন— যা ব্যক্তিগত বেদনা ও মৃত্যুচেতনার এক প্রতীকী প্রকাশ।
বাংলা সাহিত্যেও মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যকারদের মধ্যে বিজয় গুপ্ত, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, কেদার ভট্ট প্রমুখ কবি স্বপ্নে দেবী বা দেবতার আদেশ পেয়েই তাঁদের কাব্য রচনা শুরু করেছিলেন বলে তাঁরা তাঁদের কাব্যের শুরুতেই উল্লেখ করেছেন। এই স্বপ্নদর্শন যেমন তাঁদের কাব্যের ধর্মীয় বৈধতা ও কাব্যিক প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু, এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখি আমাদের উত্তরবঙ্গেরই কবি সন্তোষ সিংহ রাতের পর রাত ঘুমের ঘোরে কবিতা উচ্চারণ করে যান, আর তাঁর স্ত্রী শারীরিক অসুস্থতা, একঘেয়েমি, বিরক্তি ইত্যাদিকে তুড়ি মেরে সেই স্বপ্ন-উচ্চারিত কবিতাগুলো শ্রুতি লিখন করে যান রাতের পর রাত, যা থেকে জন্ম হয় এক অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ ‘স্বপ্নের কবিতা ঃ সূর্যাস্তের ভাষা’।
কবিতার পাশাপাশি আমরা যদি সালভাদর দালির মতো শিল্পীদের সুররিয়ালিস্ট চিত্রকলা দেখি, আমরা দেখব যে সেগুলো মূলত স্বপ্ন ও অবচেতনের প্রভাবেই গঠিত। দালি খুবই সচেতনভাবে স্বপ্নকে শিল্পসৃষ্টির হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। তিনি একটি মজার ‘হিপনোগোজিক’ কৌশল ব্যবহার করতেন— একটি ধাতব চামচ হাতে নিয়ে আরামকেদারায় আধঘুমে যেতেন। যখন ঘুমাতে শুরু করতেন, চামচটি হাত থেকে পড়ে যেত এবং তার শব্দে তিনি হঠাৎ জেগে উঠতেন। এই ঘুম–জাগরণের মধ্যবর্তী ক্ষণিক ‘স্বপ্নের ঝলক’ তিনি আঁকতে শুরু করতেন। এবং দালি শুধু শিল্পেই নয়, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক, আচরণ— সবকিছুতেই নিজেকে ‘জীবন্ত স্বপ্ন’ বানিয়ে তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ঃ ‘আমি নেশা করি না, কারণ আমিই নেশা।’
আমরা সাধারণ মানুষরা কেউই দালি নই, কিন্তু আমাদের স্বপ্নগুলোকে মনে রাখার কিছু দায় যদি বইতে পারি জীবনে, হতেই পারে, আমার-আপনারই ঘুম চোখের গভীর থেকে জেগে উঠবে কোনও ‘সূর্যাস্তের ভাষা’র মতো কবিতা বা ‘স্মৃতির স্থায়িত্ব’-র মতো ছবি।
