ভোটের দোরগোড়ায় সিভি আনন্দ বোসকে সরিয়ে রাজভবনে প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্তা আরএন রবি। এই আকস্মিক রদবদল কি নিছকই প্রশাসনিক, নাকি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের ছকে দিল্লির কোনও মাস্টারস্ট্রোক?
জয়ন্ত চৌধুরী
রাজনীতিতে (Politics) চিরস্থায়ী বলে কিছু হয় না, আর বাংলার ক্ষেত্রে সে কথা বোধহয় আরও বেশি সত্যি। এক্কেবারে ভোটের দোরগোড়ায় এসে রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানের আকস্মিক বদল— নিছকই প্রশাসনিক রুটিন, নাকি ক্ষমতা দখলের এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল? মেয়াদ শেষের আগেই সিভি আনন্দ বোসকে সরিয়ে প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্তা আরএন রবিকে রাজভবনে বসানোর পর থেকেই বঙ্গ রাজনীতিতে এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় চমকটি অবশ্য অন্য জায়গায়। আনন্দ বোসের এই আকস্মিক বিদায়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (CM Mamata Banerjee) সোশ্যাল মিডিয়ায় কার্যত ‘শকড’ বা বিস্মিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রচ্ছন্নভাবে নিশানা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা (Amit Shah)-কে।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, কেন্দ্র বোসকে দিয়ে এমন কিছু করাতে চাইছিল যাতে তিনি সায় দেননি, আর সেই কারণেই এই অপসারণ। অথচ গত চার বছর ধরে এই আনন্দ বোসের সঙ্গেই নবান্নের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। যে মুখ্যমন্ত্রীর পুলিশ রাজভবনের অন্দরে নারীঘটিত অপরাধের তদন্তে অতিসক্রিয় হয়েছিল, যিনি নিজে রাজ্যপালের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলার পক্ষে সওয়াল করতেন, তাঁর গলায় বিদায়ি রাজ্যপালের জন্য এমন সহমর্মিতা শুধু বিস্ময়কর নয়, নজিরবিহীনও বটে! একই সঙ্গে তিনি টেনে এনেছেন আগের রাজ্যপাল জগদীপ ধনকরের প্রসঙ্গও। আসলে, এই অনুকম্পার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর রাজনৈতিক অশনিসংকেত, যা রাজ্যের শাসকদল খুব ভালো করেই আঁচ করতে পারছে।
বিরোধী শাসিত রাজ্যকে চাপে রাখতে ‘রাজ্যপাল’ পদটিকে হাতিয়ার করার কৌশল এ দেশে নতুন নয়। ঐতিহাসিকভাবে এই রীতির পথিকৃৎ কংগ্রেস। মজার ব্যাপার হল, জনসংঘের সময় থেকে বর্তমানের বিজেপি বরাবরই রাজ্যে সংবিধানের ৩৫৬ ধারা বা রাষ্ট্রপতি শাসন প্রয়োগের ঘোর বিরোধী ছিল।
কিন্তু কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের যে আগ্রাসী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সেই ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স’ তকমা আজ কার্যত পরিহাসে পরিণত হয়েছে।
কংগ্রেসের ছেড়ে যাওয়া জুতোতেই পা গলিয়ে গটগটিয়ে হাঁটছে তৃতীয় মোদি সরকার। তাই ভোটের মুখে একজন দুঁদে প্রাক্তন আইপিএস অফিসারকে রাজভবনে পাঠানোর এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির নিরিখে ব্যতিক্রমী না হলেও, গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে তা কতটা সুখকর, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যাবে, রাজভবনকে রাজনৈতিক ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহারের রেওয়াজ বাংলায় সেই ষাটের দশক থেকেই চলে আসছে। ১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমল থেকে এর শুরু। ধর্মবীরা, শান্তি স্বরূপ ধাওয়ান থেকে শুরু করে বাম জমানায় এপি শর্মা বা টিভি রাজেশ্বর রাও— প্রত্যেকেই ছিলেন কেন্দ্রের রাজনৈতিক তাস।
তৎকালীন বামপন্থীরা বিশ্বাস করতেন, ভোটে হেরে কেন্দ্র ঘুরপথে বাংলার ক্ষমতা দখল করতে চাইছে। ধাওয়ান-ধর্মবীরাদের তারা ‘আধা ফ্যাসিস্ট’ তকমা দিয়েছিল। আবার ২০১০ সালের কথা ভাবুন। রাজ্যে তখন পালাবদলের হাওয়া, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-নেতাই পর্ব শেষে দোর্দণ্ডপ্রতাপ বামেদের প্রশাসনিক রাশ আলগা।
ঠিক সেই সময় ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসানে ইউপিএ সরকার রাজভবনে পাঠিয়েছিল প্রাক্তন আইপিএস এমকে নারায়ণনকে। অর্থাৎ, যখনই বাংলার ক্ষমতা দখলের প্রশ্ন উঠেছে, দিল্লি তাদের বিশ্বস্ত আমলা বা গোয়েন্দা কর্তাকে রাজভবনে পাঠিয়েছে। সেই ট্র্যাডিশন আজও সমানে চলছে।
এবারের পরিস্থিতি অবশ্য আরও জটিল এবং সময়টা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী ৭ মে বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হলে তবেই নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হবে।
কিন্তু বর্তমানে চূড়ান্ত তালিকার প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের নাম নিয়ে তীব্র আইনি বিতর্ক চলছে, মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট থেকে রাজপথে।
এই জটে যদি নির্বাচন পিছিয়ে যায় এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগে নতুন সরকার গঠিত না হয়, তবে রাজ্যের শাসনভার পরোক্ষভাবে চলে যাবে রাজ্যপালের হাতে।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই আরএন রবির মতো এক কড়া ধাতের প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্তার রাজভবনে এন্ট্রি মোটেই কোনও লঘু ‘রুটিন মাফিক’ বদল নয়। মনে রাখা দরকার, এর আগে তামিলনাডুর রাজ্যপাল থাকাকালীন সেখানকার অবিজেপি সরকারের সঙ্গে রবির তীব্র সংঘাতের রেকর্ড সর্বজনবিদিত। তাই ভোটের মুখে রাজভবনে এই নতুন ‘রবি’-র উদয়ে নবান্ন যে প্রবল চাপ অনুভব করবে, সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রশ্ন হল, দিল্লি রাজভবনকে হাতিয়ার করে কতটা সফল হবে? ইতিহাস অন্তত দিল্লির পক্ষে কথা বলছে না। রাজভবনকে ব্যবহার করে বা রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে বাংলায় কোনও কালেই খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি কেন্দ্রের শাসকদল।
বাম জমানাতেও এই কৌশল যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তৃণমূল জমানাতেও ছবিটা বদলায়নি। দ্বিতীয় তৃণমূল সরকারের আমলে জগদীপ ধনকরকে দিয়ে লাগাতার চাপ তৈরি করেও রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে পারেনি বিজেপি।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুটমার্চ, বুথে সিসিটিভি, আর রাজভবনে প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্তার উপস্থিতি— এসব রাজ্যের শাসকদলের ওপর স্নায়ুর চাপ বাড়াবে, তাদের রাজনৈতিক ব্যস্ততা বাড়িয়ে দেবে ঠিকই। কিন্তু শুধুমাত্র প্রশাসনিক কলকাঠি নেড়ে বাংলার ক্ষমতা দখল করা সহজ নয়।
তৎকালীন বামেদের চেয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সাংগঠনিক ভিত্তি এবং তৃণমূল স্তরে তাদের নিরঙ্কুশ পরাক্রম অনেক বেশি মজবুত। বাংলার মানুষ বারবার প্রমাণ করেছেন, রাজভবনের অঙ্গুলিহেলনে তাঁদের জনাদেশ বদলায় না।
দিল্লির এই নতুন চাল কি শেষপর্যন্ত কিস্তিমাত করতে পারবে, নাকি আগের মতোই বুমেরাং হবে? উত্তর লুকিয়ে আছে আসন্ন ২০২৬-এর ব্যালট বক্সে।
(লেখক সাংবাদিক)
