ভালোবাসার নতুন ঠিকানা ‘ফস্টার কেয়ার’

ভালোবাসার নতুন ঠিকানা ‘ফস্টার কেয়ার’

শিক্ষা
Spread the love


 

  • শেখর সাহা

‘দ্যাখো দাদা! ও মেয়েটা কেমন সুন্দর করে গান গাইছে!’ — রিয়ার কথায় তাকিয়ে দেখি, বর্ধমানের একটি শিশু হোমের মাঠে ছোট্ট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। আমি এসেছি এক বন্ধু দম্পতির সঙ্গে। দীর্ঘ কয়েক মাসের আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ তারা এক কন্যাশিশুকে দত্তক নিতে এসেছে। শিশুটিকে কোলে নেওয়ার মুহূর্তে যেন চারপাশের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। রিয়ার চোখে জল, মুখে হাসি। সে বলল, ‘দাদা, পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় আনন্দ কি হয়?’ আমি বলেছিলাম, ‘না, একটা পরিবার পাওয়া মানেই তো পুরো পৃথিবী পাওয়া।’

কিন্তু সেই আনন্দঘন মুহূর্তের মধ্যেই চোখে পড়েছিল আরেকটি ছবি। মাঠের এক কোণে বসে ছিল আরও কয়েকজন— ১০, ১২, ১৫ বছরের কিছু ছেলেমেয়ে। তারা গান গাইছিল না, উচ্ছ্বাসে হাততালিও দিচ্ছিল না। নীরবে তাকিয়ে ছিল শুধু। তাদের চোখে যেন একই প্রশ্ন— ‘আমাদের জন্যও কি কেউ আসবে?’ সেই প্রশ্নটাই গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল আমাকে।

পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এ কোনও বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। পশ্চিমবঙ্গ সহ সারাদেশের সরকারি ও বেসরকারি শিশু হোমগুলিতে ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সি অসংখ্য শিশু-কিশোর আজও পরিবারহীন। অনেকের কোনও আত্মীয় নেই, আবার কারও পরিবার থাকলেও তারা আর্থিক, সামাজিক বা মানসিক কারণে শিশুটির দায়িত্ব নিতে অক্ষম। ফলে বছরের পর বছর তারা হোমেই বড় হয়, পরিবার কী— তার উষ্ণতা, নিরাপত্তা ও পরিচয়ের স্বাদ না পেয়েই।

শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু হোম কখনোই কোনও শিশুর স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না। এটি কেবল অস্থায়ী আশ্রয়। একটি শিশুর মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশের জন্য পারিবারিক পরিবেশ অপরিহার্য। এই বাস্তবতা থেকেই উঠে এসেছে ‘ফস্টার কেয়ার’-এর ধারণা। ফস্টার কেয়ার এমন এক আইনসম্মত ব্যবস্থা, যেখানে কোনও ব্যক্তি বা পরিবার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি শিশুর দায়িত্ব নিতে পারেন। এটি স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি বা জরুরি ভিত্তিতেও হতে পারে। দত্তকের মতো স্থায়ী না হলেও, ফস্টার কেয়ারের মতো সাময়িক ও জরুরি ব্যবস্থায় শিশুটি পায় পরিবারের ভালোবাসা, পরিচর্যা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা— যা তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা গঠনে সহায়ক।

ফস্টার কেয়ারের মাধ্যমে শিশুটি পরিবারে থেকেই পড়াশোনা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। একই সঙ্গে পরিবারও শেখে দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার পাঠ। অথচ দুঃখের বিষয়, আজও বহু মানুষ এই ব্যবস্থার কথা জানেন না বা নানা ভুল ধারণার কারণে এগিয়ে আসতে দ্বিধাগ্রস্ত হন।

সমাজে এমন বহু পরিবার আছেন, যাঁরা ইচ্ছুক ও সক্ষম হয়েও এই মানবিক দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। একটি পরিবার এগিয়ে এলে বদলে যেতে পারে একটি শিশুর জীবনপথ। তাই আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত— ‘একটি শিশুও যেন পরিবারহীন না থাকে।’

ফস্টার কেয়ার হতে পারে সেই সেতুবন্ধন, যেখানে পরিবারহীন শিশু পায় মমতার আশ্রয়, আর পরিবার পায় নতুন অর্থ ও আনন্দের ঠিকানা। আসুন, এই উদ্যোগ সম্পর্কে জানি, জানাই এবং অন্তত একটি শিশুর ভবিষ্যৎ আলোকিত করার দায়িত্ব নিই। বিস্তারিত জানতে www.cara.wcd.gov.in ওয়েবসাইট বা জেলা শিশুসুরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

(লেখক অক্ষরকর্মী। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *