ভবিষ্যতের অনেক ভুল সিদ্ধান্ত, বিপর্যয়, হা-হুতাশ এড়ানো যেতে পারে যদি গোড়া থেকে আর্থিকভাবে সচেতন হওয়া যায়। আর তার জন্য ছোট থেকেই আর্থিক শিক্ষা দেওয়া দরকার। শুধু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলেই হবে না। সেই অ্যাকাউন্টের সঠিক পরিচালনা সম্ভব অর্থের মূল্য বুঝে, সঠিক দিশায় বিনিয়োগ করলে, তবেই। বিশ্লেষণ করলেন বিশ্বনাথ মণ্ডল।
গত কয়েক বছরে দেশের মানুষকে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ অনেকেই সহজে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন, মোবাইল ফোনে টাকা লেনদেন করছেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল পদ্ধতিতে আর্থিক পরিষেবা ব্যবহার করছেন। এগুলি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
আরও পড়ুন:
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায় যে, শুধু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলেই কি একজন মানুষ আর্থিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন? উত্তর হল, একদমই না। যদি ছোটবেলা থেকেই শিশুরা অর্থের মূল্য, সঞ্চয়ের গুরুত্ব, বাজেট তৈরি, বিনিয়োগের মৌলিক ধারণা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়ানোর শিক্ষা না পায়, তাহলে বড় হয়ে তারা সহজেই ভুল আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তাই সময় এসেছে আর্থিক শিক্ষাকে শুধুমাত্র পরিবারে আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে বিদ্যালয়ের শিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত করার। যেমন আমরা অঙ্ক, বিজ্ঞান বা ভাষা শিখি, তেমনি যদি শিশুদের জন্য সহজ ভাষায় সঞ্চয়, বিনিয়োগ, চক্রবৃদ্ধি, ক্ষুদ্র এবং দায়িত্বশীল অর্থব্যবস্থাপনার ধারণা শেখানো হয়, তাহলে তারা ভবিষ্যতে শুধু ভাল চাকরি বা ব্যবসাই করবে না-নিজের অর্থও বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবে। একটি আর্থিকভাবে সচেতন প্রজন্ম গড়ে ওঠা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো দেশের অর্থনীতির জন্যই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। শিশুর প্রথম বিনিয়োগ হোক আর্থিক শিক্ষা।
একটি প্রশ্ন। ভেবে দেখুন তো, আমরা কি আমাদের সন্তানকে অর্থ উপার্জনের শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি অর্থকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার শিক্ষা দিচ্ছি? আজকের পৃথিবীতে অনেক তরুণ ভাল আয় করেও আর্থিকভাবে এগোতে পারেন না। কারণ তঁারা উপার্জন করতে শিখেছেন, কিন্তু অর্থের সঙ্গে সঠিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে শেখেননি। প্রথম বেতন হাতে পেয়েই অপ্রয়োজনীয় খরচ, ক্রেডিট কার্ডের অতিরিক্ত ব্যবহার, সামাজিক মাধ্যমে অন্যকে দেখে ব্যয় করা, কিংবা দ্রুত লাভের আশায় না বুঝে বিনিয়োগ–এই সব ভুলের পিছনে একটি সাধারণ কারণ রয়েছে। আর সেটা হল আর্থিক শিক্ষার অভাব।
এই শিক্ষা কর্মজীবন শুরু হওয়ার পর নয়, শুরু হওয়া উচিত শৈশব থেকেই। একটি পিগি ব্যাঙ্কে নিয়মিত টাকা জমানো, জন্মদিনে পাওয়া উপহারের টাকার একটি অংশ ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া, চাহিদা আর ইচ্ছার পার্থক্য বোঝানো কিংবা পরিবারের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ নিয়ে সহজ ভাষায় আলোচনা–এইসব ছোট, ছোট অভ্যাসই শিশুর মনে বড় মূল্যবোধ তৈরি করে। তখন সে বুঝতে শেখে, প্রতিটি টাকা শুধু খরচ করার জন্য নয়। সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেটি ভবিষ্যতের সুযোগেও পরিণত হতে পারে। শিশুকে যদি ছোটবেলা থেকেই ‘ইনভেস্টমেন্ট’ শব্দটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সে শুধু টাকা বাড়ানোর ধারণাই নয়, ধৈর্য্য-শৃঙ্খলা-পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার মূল্যও শিখবে। যে শিশু অর্থের মূল্য, সময়ের গুরুত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা ছোটবেলায় শেখে, সে বড় হয়ে শুধুমাত্র সফল উপার্জনকারী নয়, একজন বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীও হয়ে ওঠে।
সন্তানের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বড় উপহার হল এমন আর্থিক শিক্ষা, যা তাকে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়ে তোলার ক্ষমতা দেয়। কারণ উত্তরাধিকার হিসাবে পাওয়া অর্থ একদিন শেষ হতে পারে, কিন্তু সঠিক আর্থিক জ্ঞান এমন একটি সম্পদ যা আজীবন থাকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সমৃদ্ধ করে। অর্থ নয়। আর্থিক শিক্ষাই হোক সন্তানের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
