মুম্বই: দুর্গাপুজো হোক বা ছট, উৎসবের মরশুমে সাধারণ মানুষের জন্য ট্রেনের টিকিট কাটা যেন এক অলিম্পিক দৌড়। সকাল ৮টায় সবেমাত্র রেলের অনলাইন টিকিটের উইন্ডো খুলেছে—আপনি নাম, ঠিকানা টাইপ করছেন, ক্যাপচা কোড ভরছেন—আর ওদিকে ঘড়ির কাঁটা মাত্র ১৫ সেকেন্ড পার করার আগেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই পরিচিত বার্তা: ‘সব টিকিট বুক হয়ে গিয়েছে!’ সাধারণ মানুষ যখন ধাপে ধাপে নিয়ম মেনে টিকিট কাটতে চেষ্টা করছেন, তখন এক উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারক চক্র অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে লক্ষ লক্ষ টিকিট লুঠ করে নিচ্ছে। এই টিকিট-চুরির নেপথ্যে রয়েছে কিছু পিলে-চমকানো সফটওয়্যার। ‘ব্রহ্মোস’, ‘টেসলা’, ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ এবং ‘ডঃ ডুম’ নামের ওই অবৈধ প্রোগ্রামগুলিই বানচাল করে দিচ্ছে আপনার টিকিট কাটার চেষ্টাকে।
রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্সের নজরে এখন এই আন্তঃরাজ্য প্রতারক চক্র। দীর্ঘদিন ধরে এই হাইটেক তছরুপ পদ্ধতিতে সাধারণ যাত্রীদের বঞ্চিত করে টিকিট লুঠ করে চলেছে কিছু অসাধু লোক। চক্রের মধ্যে রয়েছে সফটওয়্যার ডেভেলপার, অনলাইন অ্যাডমিন, সুপার সেলার এবং অবশ্যই দালাল টাউট।
রেলের এক আধিকারিক জানাচ্ছেন, যেখানে একজন সাধারণ মানুষকে টিকিট কাটার আগে ধাপে ধাপে ফর্ম ভরতে এবং ওটিপি, ক্যাপচা ভেরিফিকেশন পেরোতে হয়, সেখানে এই সফটওয়্যারগুলি একটি ‘সমান্তরাল প্রক্রিয়া’ চালিয়ে কাজ হাসিল করে নেয়। এই প্রোগ্রামগুলিতে আগে থেকেই যাত্রীর সব তথ্য ভরা থাকে। ঠিক সকাল ৮টায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সফটওয়্যারগুলি একসঙ্গে ওটিপি এবং ক্যাপচা কোড সিস্টেমে গুঁজে দেয়। ফলে ম্যানুয়ালি টিকিট বুক করতে যত সময় লাগে, তার ভগ্নাংশ সময়ে (খুব বেশি হলে ১০-১৫ সেকেন্ড) টিকিটগুলি চলে যায় দালালদের পকেটে।
এই অবৈধ কারবার থেকে চক্রের লাভ কিন্তু আকাশছোঁয়া। এই আধুনিক সফটওয়্যারগুলি মাসিক সাবস্ক্রিপশনে বিক্রি হয় এবং টিকিট প্রতি ৯৯ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। লাভজনক এই টিকিটগুলি এরপর কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি করে দালালরা। উদাহরণস্বরূপ, স্লিপার ক্লাসের ৮০০ টাকার টিকিট বিক্রি হয় ২,০০০ টাকায়। উৎসবের মরশুমে উত্তরপ্রদেশ বা বিহারগামী ট্রেনের থার্ড এসি টিকিট (যার আসল দাম প্রায় ২,৩০০ টাকা) বিক্রি হয় ৪,০০০ টাকা বা তারও বেশি দামে।
তবে এই ‘বিড়াল-ইঁদুর খেলা’ রুখতে এবার কোমর বেঁধে নেমেছে আরপিএফ। ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ডেভেলপার, সুপার সেলার ও দালাল সহ প্রায় ৫০ জনকে। রেল এখন পালটা চাল হিসাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছে। যেমন, এখন থেকে শুধুমাত্র আধার-ভেরিফায়েড আইডি দিয়েই টিকিট বুকিং করা যাবে এবং সকাল ৮টার পর ৩৫ সেকেন্ড পার হলে তবেই পেমেন্ট করা যাবে। রেলের এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এ সাধারণ যাত্রীদের কিছু সুবিধা হোক না হোক, জালিয়াতদের কিন্তু ঘুম ছুটে গিয়েছে!
