বোরোলি বাঁচানো বা বাড়ানোর উদ্যোগ নেই

বোরোলি বাঁচানো বা বাড়ানোর উদ্যোগ নেই

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


 

  • মৈনাক ভট্টাচার্য

উত্তরবঙ্গীয়রা নাকি স্বভাবে প্রকৃতির মতো নম্রশ্যামল, জলবায়ুর মতো চোরা উষ্ণতার সঙ্গে এক পশলা বৃষ্টির মতোই শান্ত। শুনতে মিষ্টি লাগলেও এর নেতিবাচক দিকটা কিন্তু ‘গেম অফ চিকেন’ তত্ত্বের অবিশ্বাস। অর্থাৎ কিনা প্রতিযোগিতা না করে নিজের অধিকারের দায় অন্যের দাক্ষিণ্যে প্রহর গোনা ধাতের।

গজলডোবার বাঁধে গিয়ে বসলে কবি বিনয় মজুমদার যখন কানের কাছে এসে ফিশফিশ করেন- একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে/ দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে/ পুনরায় ডুবে গেলো- এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে/ বেদনার গাঢ় রসে আপক্ব রক্তিম হ’লো ফল।” রক্তিম এই ডাঁসা ফল তখন যেন উত্তরের রুপোলি জলজ বোরোলি।

আমরা কথায় বলি মাছে ভাতে বাঙালি, তবু বুক চিতিয়ে অহংকার করতে পারি না- “তোমাদের জামাই অাপ্যায়নের ইলিশ আছে, আমাদের অতিথির মন মজানো বোরোলি।” পাছে সেই স্বভাবজাত ভয়, দুম করে কেউ না সুকুমার রায় আউড়ে দেয়,“বরকে কি আপনি বরকন্দাজ বলেন?- কোথায় চুনো বোরোলি আর কোথায় ইলিশ।”

অথচ কত পর্যটক প্রকৃতি পাহাড়ের টানের সঙ্গে ফি বছর উত্তরবঙ্গে ফিরে ফিরে আসেন স্রেফ বোরোলির মৌতাতে। পরিসংখ্যানে এই খুদে মাছটি জিভে জল আনা স্বাদ গন্ধেও ইলিশের সঙ্গে টেক্কা তো দেয়ই, বাড়তি আকর্ষণ জাতে চুনো হওয়ায় প্রাণীজ প্রোটিনের আধার এবং ভক্ষণে গুরুপাকহীনতা। ঠগের বাজারে তাই বিহারের কোশী নদীর পিয়ালিকে কখনও বোরোলি বলে চালানোর রেওয়াজ।

একদা কোচবিহারের মহারানি ইন্দিরা দেবীর অতি পছন্দের কারণে প্রথম প্রচারের আলোয় আসে উত্তরের রুপোলি শস্য বোরোলির গুণপনা। স্বভাবেও কিন্তু বোরোলি ইলিশের মতোই আদুরে প্রকৃতির, ঝাঁক ধরে চলে, নদীর স্রোতের বিপরীতে সাঁতার  কাটে। বোরোলির বিশেষ পছন্দ উত্তরবঙ্গের নদীপ্রকৃতির পরিবেশ। জলের স্রোত যেখানে সাধারণত দ্রুত এবং বর্ষাকালে উত্তাল থাকে। জল সংকীর্ণ স্থানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে গতি বাড়ায়, পাহাড়ের পাদদেশের এমন স্বচ্ছ জলধারাই বোরোলির আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র। তিস্তা, তোর্ষা, জলঢাকা, কালজানি নদীতেই মেলে বোরোলি। খুব সামান্য হলেও মানসাই, ধরলা,  রায়ডাক, করলা,  বালাসন কিংবা মেচিতেও দেখা মেলে।

বিহারের মিথিলা অঞ্চলের ‘রোহু’ মাছ তার বিশেষ স্বাদের জন্য পরিচিত, তামিলনাডু রামানাথনের ঐতিহ্যবাহী সমুদ্র-লবণ শুঁটকিও পরিচিত। এইসব মাছের জন্য জিআই ট্যাগ অর্জনের চেষ্টা চলছে। কত সম্ভাবনা উত্তরের নিজস্ব এই জলজ ফসল নিয়ে। তবু বোরোলি ফলন বাড়ানোর জন্য কিংবা বাঁচানোর জন্য কোনও প্রকল্পই নেওয়া হয় না।

এর জিআই ট্যাগ কিংবা ব্র্যান্ডিং ভাবনা যে আমাদের অর্থনীতির নতুন দেশা দেখাতে পারে সে ভাবনা নিয়েও  অদ্ভুত এক হিরণ্ময় নীরবতা উত্তরবঙ্গের। এই নীরবতা দেখলে এখন একটা মুখ ভেসে ওঠছে, যিনি বারে বারে মনে করিয়ে দিতে চান- “নীরবতা ভাঙাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।” তিনি আর কেউ নন, এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত এক নারীমুখ। আন্তর্জাতিক বুকার জয়ী কন্নড় সাহিত্যিক বানু মুস্তাক।

(লেখক শিলিগুড়ির ভাস্কর এবং সাহিত্যিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *