ভোটের মরশুম পড়তেই বাংলায় সক্রিয়তা বাড়ল ইডি’র। তৃণমূলের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছর ধরে চলা কয়লা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের দপ্তর এবং সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে হানা দেয় ইডি। এই অভিযানের খবর পেয়ে বিশাল পুলিশবাহিনী নিয়ে দুটি স্থানে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা অতীতে কোনও রাজ্যের কোনও মুখ্যমন্ত্রীকে করতে দেখা যায়নি।
ইডি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’র আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সবুজ রংয়ের ফাইল ও ল্যাপটপ কার্যত ছিনিয়ে নিয়ে প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান মমতা। তারপর সোজা চলে যান আইপ্যাকের দপ্তরে। সেখানেও ইডি ও কেন্দ্রকে কড়া ভাষায় নিশানা করেন। তারপর কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তৃণমূলকে রাজ্যজুড়ে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছেন তিনি। নিজেও কলকাতায় দীর্ঘ প্রতিবাদ মিছিলে হেঁটেছেন। দিল্লিতেও প্রবল ঠান্ডা উপেক্ষা করে তৃণমূলের একাধিক সাংসদ অমিত শা’র দপ্তরের বাইরে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। তাঁদের পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ।
বিজেপি এত বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে রাজনীতি করলেও তাঁকে যে এখনও চিনতে পারেনি, সেটা ভোটের মুখে ইডি’র অভিযানে স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা বঙ্গ সফরে এসে বারবার দাবি করছেন, এবার তাঁরাই রাজ্যে সরকার গড়বেন। তার জন্য একের পর এক রণকৌশল তৈরি হচ্ছে, নেতাদের দিল্লি-কলকাতা ডেইলি প্যাসেঞ্জারি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
কিন্তু ইডি, সিবিআই, আয়কর দপ্তরের মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে সামনে রেখে ভোটের মুখে কিছু তল্লাশি বা গ্রেপ্তারির কৌশল এর আগেও সাফল্য পায়নি। এর আগে দিল্লি ও ঝাড়খণ্ডে ভোটের মুখে এজেন্সিগুলির সক্রিয়তা দেখা গিয়েছিল। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। মোদি জমানায় ভোটের মুখে বিরোধীদের ভাতে মারার চেষ্টাও হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ তার ব্যতিক্রম নয়।
কিন্তু বারবার একই অস্ত্রের ব্যবহার ভোটারদের কাছে কার্যকারিতা হারাতে পারে। সারদা, নারদ, নিয়োগ, র্যাশন, কয়লা, গোরু পাচার ইত্যাদি তৃণমূল জমানায় দুর্নীতির অভিযোগের তালিকা বেশ লম্বা। কিন্তু এত কেলেঙ্কারির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একটি মামলাতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সি। শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, গত ১২ বছরে ভারতের কোনও রাজ্যে কোনও দুর্নীতির মামলাতেই কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলি সাফল্যের মুখ দেখেনি। অথচ ইডি, সিবিআইয়ের মতো সংস্থার হাতে তদন্তভার রয়েছে প্রচুর।
বিজেপি নিয়মিত কংগ্রেস, তৃণমূল সহ বিরোধীদের দিকে দুর্নীতির আঙুল তোলে। কিন্তু ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর কীভাবে তাদের দলের তহবিল ফুলেফেঁপে উঠল, তার ব্যাখ্যা মেলে না গেরুয়া শিবিরের কাছে। সেই কোটি কোটি টাকার উৎস কী ও কেন বিজেপির দলীয় তহবিলে ঢুকল, তার তদন্ত ইডি, আয়কর দপ্তর কখনও করে না। আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ কোনও বিরোধী নেতা পদ্ম শিবিরে যোগ দিলে তাঁদের অভিযোগগুলি নিয়েও এজেন্সিগুলিকে চুপ হয়ে যায়।
এতদিন চুপ থাকার পর বিধানসভা ভোটের মুখে পশ্চিমবঙ্গে কেন কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্ত হঠাৎ খবরের শিরোনামে চলে এল, কেন আইপ্যাক ও তাদের কর্ণধার ইডি’র আতশকাচের তলায় চলে এল আর কেন মুখ্যমন্ত্রী সদলবলে ইডি’র অভিযানের মধ্যে ঢুকে নিজের বিরোধী নেত্রী মার্কা ভাবমূর্তিকে জাগিয়ে তুললেন, তার উত্তর বের করা খুব কঠিন নয়। ইডি’র অভিযানের মাঝপথে কীভাবে মুখ্যমন্ত্রী নথি নিয়ে চলে গেলেন, কেন তাঁকে কেউ বাধা দিল না- সেটাও একটা ধাঁধা। এই তল্লাশি আদৌ কোনও তদন্ত প্রক্রিয়ার অঙ্গ কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট ধন্দ। এসআইআর নিয়ে জোড়াফুল বনাম পদ্মফুলের লড়াইয়ের তপ্ত আবহের পারদ তুঙ্গে তুলে দিয়েছে ইডি’র পদক্ষেপ। তৃণমূল নেত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন, কেন্দ্র বুনো ওল হলে তিনি বাঘা তেঁতুল।
The publish বেনজির দ্বৈরথ appeared first on Uttarbanga Sambad.
