শেখর বসু
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বাড়ি সিয়ার্স টাওয়ারের একশো তিনতলার স্কাইডেক থেকে নীচে নেমে এসে মনে হয়েছিল, সত্যি-সত্যিই আকাশ থেকে নেমে এলাম। আবার সেই শিকাগো শহরের কংক্রিটে বাঁধানো চওড়া রাস্তা, দু’পাশে স্কাইস্ক্র্যাপার। ভরদুপুর, কিন্তু চারপাশ একটু অন্ধকার অন্ধকার। মেঘ জমেছে নাকি আকাশে?
স্কাইস্ক্র্যাপারের শহরে আকাশ দেখা কঠিন। অনেক কসরত করার পর যেটুকু দেখা গেল, তা বেশ কালো। বৃষ্টি হবে নাকি? এখানে শুনেছি খুব বৃষ্টি হয়। সঙ্গে থাকে ঝোড়ো হাওয়া।
শিকাগোর একটা নাম ‘উইন্ডি সিটি’। পাশেই প্রায় সমুদ্রের মতো দেখতে মিশিগান লেক। ঝড় নাকি ওখানেই ওঠে। তারপর তা ধেয়ে আসে শহরের দিকে। তবে কেউ-কেউ বলে থাকেন, এই নামটি অন্য কারণে দেওয়া। শহরের প্রতিপত্তিশালী ও অহংকারী সব ‘লবিইস্ট’ এবং রাজনীতিকদের মধ্যে অবিরাম ‘লবিয়িং’ হয়—সেই জন্যেই অমন নাম। এই নামটি দিয়েছে নিউ ইয়র্ক প্রেস।
শহরের নাম ‘শিকাগো’ হওয়ার আখ্যানটিও চমকপ্রদ। একদা শিকাগো নদীর ধারে বিস্তর বুনো পেঁয়াজ ফলত। স্থানীয় ভাষায় ওই পেঁয়াজকে ‘শিকাকা’ বলা হত। আদতে ওটি ছিল মিয়ামি-ইলিনয় শব্দ। সেই সময় ফরাসি অভিযাত্রীদের আকর্ষণ করেছিল এই এলাকাটি। মস্তবড় একটি বন্দর হিসাবে এটি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখে তারা এখানে আস্তানা গেড়েছিল। এদিকে মস্ত দুটি নদী, সুবিশাল হ্রদ, ওদিকে মিসিসিপি। নতুন বন্দর-এলাকায় থিতু হয়ে বসা ফরাসি অভিযাত্রীদের জিভে স্থানীয় ওই শব্দ ‘শিকাকা’ ধীরে ধীরে ‘শিকাগো’ হয়ে উঠেছিল।
মাথার মধ্যে নামের ইতিহাস আর একটুখানি নড়াচড়া করার পরেই জোরালো হাওয়া উঠল। উইন্ডি সিটির হাওয়া। ঠান্ডা-ঠান্ডা হাওয়া। বোধহয় বৃষ্টি নামবে।
শহরের এই কেন্দ্রে মাথা বাঁচানো খুব একটা সমস্যা নয়। দু’দিকে বড় বড় দোকান আছে, যে কোনও একটায় ঢুকে পড়লেই হল। কিন্তু আমার চোখ ছিল একটু দূরের মস্তবড় ইংরেজি ‘এম’ হরফ লেখা দোকানটার ওপর। ঝড়বৃষ্টি জাঁকিয়ে নামবার আগেই ওখানে পৌঁছোতে হবে।
‘এম’ আসলে ‘ম্যাকডোনাল্ড’স—পৃথিবীখ্যাত ফাস্ট ফুড চেনের রেস্তোরাঁ। ফুড সার্ভিস এই রিটেলারের উৎস আমেরিকা, কিন্তু এখন ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর প্রায় একশো কুড়িটিরও বেশি দেশে। মোট রেস্টুরেন্টের সংখ্যা তিরিশ হাজারেরও বেশি। আমাদের রাজ্যে এখন বেশ কয়েকটা দোকান।
ঝোড়ো হাওয়া আর একটু বাড়তেই বৃষ্টি শুরু হল ঝিরঝির করে। আমি আমার গন্তব্যস্থলে পৌঁছেই গিয়েছিলাম প্রায়। শেষ কয়েক পা’র জন্যে একটু ছুট লাগাতে হয়েছিল, তারপরেই ঢুকে পড়েছিলাম আরামপ্রদ রেস্টুরেন্টে।
ঝকঝকে-তকতকে রেস্টুরেন্ট। ওই মুহূর্তে রেস্টুরেন্টে খদ্দেরের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। প্রশস্ত ফ্লোরে অনেকগুলো চেয়ার-টেবিল সাজানো। কিছু খদ্দের খাওয়াদাওয়া সারছে। মাঝামাঝি জায়গায় লম্বা কাউন্টার। ওপাশে জনাচারেক মহিলা দু-হাত অন্তর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। পেছনে ক্যাশ কাউন্টার, সার্ভিসের লোকজন। কাউন্টারের মাথায় খাবারদাবারের সচিত্র হোর্ডিং, কোনটার কত দাম—সব লেখা। ব্রেকফাস্টের একরকম হোর্ডিং, লাঞ্চের সময় আর একরকম, সন্ধের খাদ্যতালিকাতেও কিছু রদবদল থাকে।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে খাবারের তালিকায় চোখ ঘোরাচ্ছিলাম। মুখরোচক নানা ধরনের খাবার আছে। সব অবশ্য আমাদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিলবে না। তবে কিছু কিছু পদ তো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। এই যেমন বার্গার, হট ডগ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন নাগেট।
প্রিমিয়াম স্যালাডেরও খুব চাহিদা। তাতে থাকে লেটুস, চেরি, টমেটো ইত্যাদি। জুস পাওয়া যায় নানা ধরনের। ট্রপিকানা অরেঞ্জ জুস, অ্যাপেল জুসের কাটতি খুব। এখানকার সুগন্ধি কফিরও বিরাট চাহিদা। কফির গ্লাসের আকার তিনরকম—স্মল, মিডিয়াম আর লার্জ।
খেতে খেতে বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম। ফুটপাথে লোকজনের সংখ্যা বেশ কমে গিয়েছে। যারা হাঁটছিল তাদের মাথায় বড় মাপের ছাতা। ফুটপাথে লোক কমলেও রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা একটুও কমেনি।
এখানকার বৃষ্টির মতিগতি নিয়ে কোনও ধ্যানধারণাই আমার নেই। শুধু জানা আছে, এখানে হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি নেমে আসে, কিন্তু সে বৃষ্টি কতক্ষণ চলে জানি না।
খাওয়ার পরিমাণ যথেষ্টই। ভরপেট লাঞ্চ হয়ে গেল আমার। কফির গ্লাসে চুমুক দেওয়ার সময় দেখলাম, বৃষ্টি একটু ধরেছে। আকাশের আলোও ফুটেছে খানিকটা। মনে হয় শিগগিরই থেমে যাবে বৃষ্টি।
বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়ার পরে সাইডওয়াক, রাস্তা আরও চকচকে হয়ে উঠেছিল। রাস্তার ওপাশের স্কাইস্ক্র্যাপারের গ্রাউন্ডফ্লোরের ইট-পাথরের দেওয়ালেও বুঝি বিশালত্বের ছাপ। কত বয়স হবে বাড়িটার? শতখানেক হতে পারে, কিংবা তার চাইতেও বেশি।
বিশ শতকের গোড়ার দিকেই শিকাগোর আর্থিক বিকাশটি রীতিমতো চোখে পড়ার মতো হয়ে উঠেছিল। ভাগ্য ফেরাবার জন্য অনেকেই তখন পাড়ি দিয়েছিল এই শহরে। দূরের গ্রাম থেকেও বিস্তর লোকজন এসেছিল। ইউরোপ থেকে বহু অধিবাসীও হাজির হয়েছিল এখানে। এখানকার অনেক কলকারখানায় উৎপাদন তখন বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ। রিটেল সেক্টরেরও প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল মিডওয়েস্ট। প্যাকিং ট্রেডের মাথায় উঠে এসেছিল শিকাগো ইউনিয়ন স্টক ইয়ার্ড।
সামনের ওই গম্ভীর চেহারার স্কাইস্ক্র্যাপারটি হয়তো দূর অতীতের ওইসব ঘটনার সাক্ষী। শুধু ভালো-ভালো ঘটনাই নয়, বেশকিছু মন্দ ঘটনাও দেখেছে নিশ্চয়ই। ‘গ্রেট মাইগ্রেশন’-এর সময় দক্ষিণ থেকে হাজার হাজার কালো রঙের মানুষও হাজির হয়েছিল এই শহরে।
জনসংখ্যা রাতারাতি খুব বেড়ে যাওয়ায় নানারকম সামাজিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল তখন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ের চেহারা তো নিদারুণ। সাদা-কালো বর্ণবৈষম্য নিয়ে ভয়ংকর দাঙ্গাও হয়ে গিয়েছিল এখানে। মারা পড়েছিল কালো রঙের অসংখ্য মানুষ, তুলনায় সাদার সংখ্যা কম।
কিন্তু আস্তে আস্তে শিকাগোর অবস্থা আবার সহজ-স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। বর্ণ নয়, অন্য কোনও বৈষম্য নয়, মানবাধিকারই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সব স্তরে। গত শতকের আটের দশকের গোড়ার দিকে যিনি এই শিকাগো শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন—তিনি ছিলেন কৃষ্ণবর্ণের মানুষ। দিন আরও পালটেছে, কালো রঙের ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সে যাই হোক, বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। পলিথিনের ট্রে আর কফির গ্লাস ওয়েস্ট বিনে ফেলে বেরিয়ে পড়েছিলাম রাস্তায়। বৃষ্টির পরে শীত একটু বেড়ে গিয়েছিল, তবে তেমন কিছু নয়।
শহর দেখতে হলে শহরের রাস্তায় রাস্তায় একটু লক্ষ্যহীন হয়ে ঘুরে বেড়ানো দরকার। আমার হাতে সময় আছে, তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। স্কাইস্ক্র্যাপারের শহর। রাস্তাগুলোও বিরাট বিরাট। এই রাস্তাটা সোজা চলে গিয়েছে বহু দূর। একটু পরপরই ক্রসিং, ডানদিক বাঁদিকের রাস্তাগুলোও চওড়া এবং সমান্তরাল। দু’পাশে মস্ত মস্ত শো-রুম। কত রকমের দোকানপাট। আর সাজানোরই বা কি বাহার! চোখ ফেরানো কঠিন।
ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছিলাম সাউথ মিশিগান অ্যাভিনিউয়ের মুখে। আরে! ওই তো সেই আর্ট ইনস্টিটিউট অফ শিকাগো। শরীরের মধ্যে মৃদু উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। আজ থেকে প্রায় একশো বত্রিশ বছর আগে অখ্যাত, অজ্ঞাত, তরুণ এক বাঙালি সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ এখানেই অত্যাশ্চর্য এক বক্তৃতা দিয়ে গোটা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।
সুবিশাল আর্ট ইনস্টিটিউট। ভেতরে ঢোকা-বেরুবার তিনটি বড় গেট। সামনে চওড়া সিঁড়ির সারি। পায়ে পায়ে, খানিকটা বোধহয় তীর্থযাত্রীর ভঙ্গিতেই রাস্তা পেরিয়ে এসেছিলাম। না, আজ আর ভিতরে ঢোকা যাবে না। ইনস্টিটিউট বন্ধ হয়ে গিয়েছে বিকেল পাঁচটায়। শুধু বৃহস্পতিবার খোলা থাকে রাত আটটা পর্যন্ত। অন্যান্য দিন সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা।
পথঘাট থেকে দুপুরের ওই বৃষ্টির জল শুকিয়ে গিয়েছে একদম। হাঁটছি বহুক্ষণ থেকে। আর্ট ইনস্টিটিউটের সিঁড়িতে বসে বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে কিছুক্ষণ। সিঁড়ির ধাপে বসার পরেই চমকে উঠেছিলাম আর একবার। সামনের লাইটপোস্টে রাস্তার নামের ফলক— স্বামী বিবেকানন্দ ওয়ে। ওপরে ছোট করে লেখা— অনারারি।
খুব স্বাভাবিক কারণেই শহর কর্তৃপক্ষ সুপ্রাচীন মিশিগান অ্যাভিনিউ নামটা পালটে দেননি, কিন্তু পথের সাম্মানিক একটি নামকরণও করেছেন। আমাদের দেশ থেকে বহু দূরে, পৃথিবীর অপর প্রান্তের বিশাল এক শহরের কেন্দ্রে ওই নামটি দেখে যে কোনও ভারতবাসীই গর্ববোধ করবেন। বাঙালিদের গর্বের মাত্রা হয়তো আর একটু বাড়বে।
এখান থেকে খানিকটা আকাশ দেখা যায়। আকাশে বেলাশেষের আলো। কিন্তু শিকাগো শহরের এই প্রাণকেন্দ্র উজ্জ্বল বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করছে। সামনে চওড়া রাস্তার ক্রসিং।
আচ্ছন্নতা ছড়িয়ে পড়ল শরীরে। আর্ট ইনস্টিটিউটের কলম্বাস হলে সেদিন সম্পূর্ণ অপরিচিত তিরিশ বছরের এক সন্ন্যাসী তাঁর প্রথম বক্তৃতাতেই জগদ্বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মুখ থেকে বেদান্তের নবতর ব্যাখ্যা শুনে শিহরন জেগেছিল গোটা পশ্চিমে। তারিখটা আমাদের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে— ১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর।
এই ধর্মমহাসভা পর্যন্ত পৌঁছোনো তাঁর কাছে সহজ ছিল না। কখনো-সখনো তা অত্যন্ত কঠিনও হয়ে পড়েছিল। আর্ট ইনস্টিটিউটের সিঁড়িতে বসে আমি ইতিহাসের পেছনদিকে ছুট লাগিয়েছিলাম।
সেপ্টেম্বরে মহাসভা, জুলাই মাসে শিকাগোতে এসে পৌঁছেছিলেন বিবেকানন্দ। সম্পূর্ণ একা। চেনাজানা কেউ কোথাও নেই। সেই যুগের আমেরিকা, শুধুমাত্র বিদেশ-বিভুঁই বললে কিছুই বোঝানো হয় না। মাসদুয়েকের জাহাজ সফর সেরে কানাডা হয়ে শিকাগো এসে পৌঁছেছিলেন সন্ন্যাসী। এদেশের রীতি-নীতি, আদবকায়দা সবই তাঁর কাছে অজানা। কোথায় যাবেন, কী করবেন কিছুই তখন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। গায়ের রং, বিচিত্র পোশাক তাঁকে বিপদে ফেলেছিল বারবার।
ধনীর দেশ আমেরিকা, হোটেল খরচ বিরাট। যে হারে টাকা খরচ হচ্ছে, তাতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এখানে থাকা কঠিন। কয়েকটি দিন ওখানে কাটাবার পরে সেই দুঃসংবাদটি কানে এল। ভালো রকমের পরিচয়পত্র না থাকলে কেউ ওই মহাসভার প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারে না। তাছাড়া প্রতিনিধি বাছাইয়ের শেষ তারিখ পেরিয়ে গিয়েছে অনেকদিন আগেই। এবার? সেকথা অন্য কোনও একদিন।
