ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায়নি এখনও পাশার দাগ। কুরুসভায় দ্রৌপদীর অপমান, যুধিষ্ঠিরের সর্বস্ব হারানো কিংবা কুরুক্ষেত্রের মহাসংঘাতের আগে যে খেলাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নিয়তির নির্মম পরিহাস, সেই পাশাই আজ অন্য এক আখ্যানের জন্ম দিচ্ছে বীরভূমের মাজিগ্রামে। এখানে নেই রাজসিংহাসন, নেই রাজ্য জয়ের আকাঙ্ক্ষা, নেই সর্বস্ব বাজি রাখার উন্মাদনা। আছে একটি জীর্ণ কাপড়ের বোর্ড, কয়েকটি কাঠের ঘুঁটি আর অতীতকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার এক অনাড়ম্বর আয়োজন।
গ্রামের বাসিন্দা প্রশান্ত ঘোষ জানান, তাঁর বাবা ও দাদুরাও এই খেলায় অভ্যস্ত ছিলেন। ছোটবেলায় তাঁদের কাছেই পাশার হাতেখড়ি। একসময় হারিয়ে যাওয়া বোর্ডটি প্রায় ছয়-সাত মাস আগে ফের খুঁজে পাওয়ার পর নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে আসর।
আরও পড়ুন:
সিউড়ি-২ ব্লকের এই গ্রামে সন্ধ্যা নামলে অন্নপূর্ণা মন্দিরে জড়ো হন কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের কাছে পাশা কেবল সময় কাটানোর উপকরণ নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এক স্মৃতির ভাণ্ডার! যে খেলায় একদিন রাজসভায় ভাগ্য নির্ধারণের কাহিনি রচিত হয়েছিল, সেই খেলারই গ্রাম্য সংস্করণে মেতে ওঠেন এখানকার মধ্যবয়স্ক ও প্রবীণরা। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলে সেই আসর। কাপড়ের তৈরি বোর্ডটির গায়ে সময়ের ক্ষত স্পষ্ট। কোথাও ছেঁড়া কাপড়, কোথাও সেলাইয়ের চিহ্ন। কাঠের ঘুঁটি আর তিনটি ডাইসকে সঙ্গী করেই টিকে রয়েছে খেলাটি। ডাইসগুলি হাতির দাঁতের তৈরি বলে দাবি স্থানীয়দের। প্রাচীন এই খেলার সমস্ত নিয়ম অবশ্য তাঁদের জানা নেই। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা পদ্ধতিই প্রজন্মান্তরে বহন করে চলেছেন তাঁরা।

গ্রামের বাসিন্দা প্রশান্ত ঘোষ জানান, তাঁর বাবা ও দাদুরাও এই খেলায় অভ্যস্ত ছিলেন। ছোটবেলায় তাঁদের কাছেই পাশার হাতেখড়ি। একসময় হারিয়ে যাওয়া বোর্ডটি প্রায় ছয়-সাত মাস আগে ফের খুঁজে পাওয়ার পর নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে আসর। মহাভারতে পাশার ছক ছিল কূটবুদ্ধির অস্ত্র। মাজিগ্রামে সেই ছকের সঙ্গে জড়িয়ে নেই কোনও আর্থিক লেনদেন। রথীনকুমার ঘোষের কথায়, খেলতে গিয়ে মাঝেমধ্যে ঝগড়া হলেও পরক্ষণেই তা মিটে যায়। পরদিন ফের সবাই একসঙ্গে বসেন।
ইতিহাসবিদ অমিয় ঘোষের মতে, পাশা ভারতীয় জ্ঞান-ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। ডাইসগুলি সত্যিই হাতির দাঁতের তৈরি হলে বোর্ডটি কোনও সম্ভ্রান্ত পরিবারের পুরনো সম্পদও হতে পারে। বিশ্বভারতীর ইতিহাসের অধ্যাপক অতীগ ঘোষের কথায়, প্রাচীন এই খেলা বাংলার মাটি থেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি, এটাই আশার বিষয়। মহাকাব্যের পাশা কেড়ে নিয়েছিল রাজ্য, মর্যাদা, স্বজনের শান্তি। আর মাজিগ্রামের পাশা ফিরিয়ে আনছে হারিয়ে যেতে বসা এক সামাজিক পরিসর। ইতিহাসের সেই একই খেলা এখানে আজ পরাজয় বা বিজয়ের চেয়ে বড় করে তুলেছে মানুষের একসঙ্গে বসার আনন্দকেই।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
