বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন যুদ্ধের অশনিসংকেত

বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন যুদ্ধের অশনিসংকেত

শিক্ষা
Spread the love


গৌতম হোড়

লাইসেন্সটা তো মহাভারতেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধজয়ের জন্য কোনও কিছুই অন্যায় নয়। তাই ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির পর্যন্ত দ্রোণাচার্যকে হত্যা করতে না পেরে পরিকল্পনামতো জোরে জোরে বললেন, অশ্বত্থামা হত, তারপর মৃদুস্বরে বললেন, ইতি গজ। যুধিষ্ঠির এইভাবে যুদ্ধজয়ের জন্য নৈতিকতা বহির্ভূত পন্থায় দ্রোণাচার্যকে পুত্রশোকে কাতর করে দিয়ে যুদ্ধজয়ের পথ প্রশস্থ করে প্রমাণ করে দিয়েছেন, যুদ্ধজয়ে ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই। পরে ভালোবাসার লড়াইও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। তারপর সব লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এখন এটাই নীতি, যুদ্ধে জয়ের ক্ষেত্রে কোনও পন্থাই অন্যায় নয়।

আর যুদ্ধ তো এখন তির-ধনুক দিয়ে হয় না, প্রতিপক্ষকে বিব্রত করতে, বিপাকে ফেলতে সম্ভাব্য সবকিছুই হল অস্ত্র। বর্তমান যুদ্ধ শুধু রণক্ষেত্রে লড়া হয় না। সর্বক্ষেত্রে লড়া হয়। ফলে সরাসরি সংঘাত হলে সেনা, বিমান, নৌ বাহিনী যেমন সক্রিয় হয়ে ওঠে, তেমনই কূটনীতি, অর্থনীতি, প্রচার সবকিছই যুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এমনকি জলও। হবে নাই বা কেন, জল যদি আটকে দেওয়া যায়, নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে প্রতিপক্ষের ত্রাহি রব উঠতে বাধ্য। আর এ কারণেই জল নিয়ে বিরোধ লেগেই আছে। একই দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে, বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের মধ্যে। যত দিন যাচ্ছে, ততই অস্ত্র হিসাবে জল গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইউক্রেনে যা হল

২০২৩ সালের ঘটনা। ইউক্রেনে নিপ্রো নদীর উপর কাখোভকা ড্যামে বিস্ফোরণের ফলে একটা বড় অংশ ধসে গেল। জলাধারের বিপুল জলরাশি ভাসিয়ে দিল প্রচুর শহর ও গ্রাম। নদীর দুই তীর থেকে হাজার হাজার মানুষকে রাতারাতি উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল। সোভিয়েত আমলে বানানো এই ড্যামের রিজার্ভারটি এত বড় যে, মানুষ এটাকে কাখোভকা সমুদ্র বলে ডাকত। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদোমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, ড্যাম ভেঙে যাওয়ার ফলে ১৫০ টন শিল্প-বর্জ্য নদীর জলে মিশে গিয়েছে। আরও ৩০০ টন মিশে যেতে পারে। পরে এই ড্যাম ভেঙে পড়ার ফলে কী হতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা করে একটি গবেষক দল। তারা একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেই রিপোর্টের প্রধান লেখক লাইবনিৎস ইনস্টিটিউট অফ ফ্রেশওয়াটার ইকলজি অ্যান্ড ইনল্যান্ড ফিশারির বিজ্ঞানী আলেকসান্ড্রা শুমিলোভা বলেছেন, এই বিপর্যয় চেরনোবিলে পরমাণু বিপর্যয়ের সমতুল্য। কারণ, এর ফলে লেড, নিকেল সহ ৮৩ হাজার টন হেভি মেটাল জলবাহিত হয়ে নীচে নেমেছে। এটাকে বলা যেতে পারে টক্সিক টাইমবোম।

এই ড্যামে বিস্ফোরণের দায় রাশিয়া বা ইউক্রেন কেউই নেয়নি। রাশিয়ার অভিযোগ, ইউক্রেন এই অন্তর্ঘাত করেছে। কারণ, তারা ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে জল থেকে বঞ্চিত করতে চায়। এই এলাকা ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। আর ইউক্রেন বলেছে, এই কাজ রাশিয়া করেছে। কারণ, মস্কো ভেবেছিল, ড্যামের উপরের রাস্তা দিয়ে ইউক্রেনের সেনা রাশিয়ার অধিকৃত এলাকা ছিনিয়ে নিতে পালটা অভিযান করবে। তারা এই ড্যাম ভেঙে দিয়ে জলকে হাতিয়ার করে ইউক্রেনের ক্ষতিও করতে চেয়েছে। যে পক্ষই করুক না কেন, জল এখানে অস্ত্র, প্রতিপক্ষকে বিপাকে ফেলার অস্ত্র।

সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত

গতবছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহলগামে ২৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে জঙ্গিরা। ভারত জানায়, এটা সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের আরেকটি ভয়াবহ নিদর্শন। ভারত এরপরই সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, রক্ত ও জল একসঙ্গে বইতে পারে না। অর্থাৎ, জলকে হাতিয়ার করল ভারত। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ৬৬ বছর আগে সিদ্ধু জলচুক্তি হয়েছিল। সিন্ধু বদ্বীপ এলাকায় ছ’টি প্রধান নদী আছে। পূর্বদিকের শতদ্রু, বিপাশা ও ইরাবতী এবং পশ্চিমদিকের সিন্ধু, ঝিলম ও চন্দ্রভাগা। পূর্বদিকের নদীগুলির জল ভারত পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারবে। পশ্চিমদিকের নদীগুলির জল পাকিস্তান পুরোপুরি পাবে। সেই জল বন্ধ করতে পারবে না বা পাকিস্তানের সঙ্গে একমত না হয়ে কোনও নির্মাণ করতে পারবে না। চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার কোনও ক্লজ রাখা হয়নি। চুক্তির কোনও সময়সীমাও ধার্য করা হয়নি। এতদিন পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ হয়েছে, সংঘাত হয়েছে, যুদ্ধে হেরে গিয়ে পাকিস্তান কৌশল বদল করেছে। ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান জঙ্গিদের প্রশিক্ষিত করে, পরিকল্পনা করে ভারতে প্রবেশ করিয়ে একের পর এক সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করিয়েছে। তবে জলচুক্তি অক্ষুণ্ণ ছিল।

পহলগাম কাণ্ডের পর ভারত দুটি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারা সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রেখেছে এবং অপারেশন সিঁদুর করেছে। অর্থাৎ, সামরিক প্রত্যাঘাতের পাশাপাশি তারা জলকেও অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছে। ফলে পাকিস্তানকে তিনটি নদীর জল পুরোপুরি ব্যবহার করার দায় আর ভারতের থাকছে না। চুক্তি অনুযায়ী, ওই তিনটি নদীর জল সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য ভারতকে দিতে হত। চুক্তি স্থগিত রাখার ফলে সেই তথ্য দেওয়া ভারত বন্ধ করেছে। জয়েন্ট ইনস্পেকশন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কোনও নদীর জল তো একদিনে বন্ধ করা যায় না। তার পরিকাঠামো তৈরি করতে সময় লাগে। এতদিন পশ্চিমের তিনটি নদীর উপর বাঁধ তৈরির জন্য, খাল কাটার জন্য ভারতের অনুরোধে সম্মত হয়নি পাকিস্তান। চুক্তি স্থগিত হওয়ায় এখন আর পাকিস্তানের সম্মতির কোনও দায় ভারতের থাকল না। তারা খাল কাটতে পারবে, জলাধার তৈরি করতে পারবে, নদীর জল সেইদিকে নিয়ে যেতে পারবে। ফলে পাকিস্তানে এই তিনটি নদীর জল খুবই কমে যাবে। তাছাড়া বর্ষায় প্রচুর জল এসে গেলে কিছু না জানিয়ে সেই জল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ থাকবে। কৃষ্ণগঙ্গা রিজার্ভার থেকে জল ছেড়ে দিয়ে তার পলি পরিষ্কার করে সেখানে আবার জল ভরতে পারবে। চুক্তির বিধিনিষেধ এই ক্ষেত্রেও মানতে হবে না। ভারত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য খাল কেটে নদীর জলকে সেদিকে প্রবাহিত করতে পারবে। ফলে এই জল-অস্ত্র নানাভাবে ব্যবহার করতে পারবে ভারত।

ভারত যদি জল-অস্ত্রকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে তাহলে পাকিস্তানের সবচেয়ে উর্বর এলাকা চাষের জন্য পর্যাপ্ত জল পাবে না। আবার তা বন্যার কবলে পড়ার সম্ভাবনাও থাকছে। ভারত তিনটি নদীর জল-সংক্রান্ত তথ্য না দেওয়ায় তারা ইতিমধ্যেই অসুবিধায় পড়েছে। এই চাপের ফলে ভারতের চাহিদা মেনে তারা কি নীতি বদল করবে? এই প্রশ্নের জবাব ভবিষ্যৎ দেবে, তবে তারা যে চাপে পড়েছে ও পড়বে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

ব্রহ্মপুত্র নিয়ে ভারত-চিন বিরোধ

পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে সুবিধাজনক জায়গায় ছিল ভারত। কারণ, ভারত থেকে নদীগুলি পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে ভারত অসুবিধাজনক জায়গায় আছে। কারণ, এখানে ব্রহ্মপুত্র নদের জল আসছে চিন থেকে এবং ভারত ও চিনের মধ্যে কোনও জলবণ্টন চুক্তি নেই। অরুণাচলপ্রদেশ সীমান্তের খুব কাছে মেডংয়ে চিন বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করছে। বিশাল জলাধার তৈরি হচ্ছে। আর এখানেই ভারতের আপত্তি। ভারত মনে করছে, শুখা মরশুমে ব্রহ্মপুত্রের জল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে চিন। জলাধারের জলকে ‘ওয়াটার বম্ব’ হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে। তাহলে অসম ও অরুণাচল বিপর্যস্ত হবে। ভারত মনে করছে, উত্তর-পূর্ব ভারত হল ভূমিকম্প-প্রবণ এলাকা। ফলে সেখানে এই জলাধার ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র করার অর্থ, ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া।

কিন্তু চিন ভারতের কথায় কান দিচ্ছে না। ইন্ডিয়া টুডের করা আরটিআই থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, চিন ২০২২ সাল থেকে ব্রহ্মপুত্রের জল সম্পর্কিত তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চিনের সু চাও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর চায়না গ্লোবালাইজেশনের সহ সভাপতি ভিক্টর গাও বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত যা করছে, তা চিন কখনও করবে না। কিন্তু তিনি এটাও বলেছেন, তুমি সেই ব্যবহার অন্যের প্রতি কোরো না, যেটা তুমি মনে করো অন্যরা যেন তোমার প্রতি না করে। সিন্ধুর ক্ষেত্রে ভারত একমাত্র আপস্ট্রিম দেশ নয়, চিন হল আসল আপস্ট্রিম দেশ। যদি ভারত এটা করতে থাকে, তাহলে তার পরিণতি কী হবে? যদি চিন এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ে তাহলে কী হবে? অর্থাৎ, জল-অস্ত্র চিনের হাতেও আছে। তারাও সেটা ব্যবহার করতে পারে, এই হুমকিটা আগাম জানিয়ে রেখেছেন গাও। তিনি এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, সিন্ধুর উৎপত্তিস্থল হল তিব্বত। সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে তা কাশ্মীরে ঢুকেছে। তাই চিন হল এক্ষেত্রে প্রকৃত আপস্ট্রিম দেশ। অনেক অস্ত্রই তো দু-ধারওয়ালা তলোয়ার হয়। জলও সেরকমই একটা অস্ত্র।

তিস্তার জল

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার জলবণ্টন নিয়ে চুক্তি হলেও তিস্তা নিয়ে হয়নি। মনমোহন সিংয়ের সময় এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরেও শেষপর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর প্রবল আপত্তিতে চুক্তি সই হয়নি। নরেন্দ্র মোদির আমলে এই চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গকে রাজি করানো যায়নি। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা চুক্তি চাইছে। তাদের দাবি, শুখা মরশুমে তিস্তার জল কমে যায়। ফলে তারা বিপুল অসুবিধার মধ্যে পড়ে। তাই তিস্তার জলের সমবণ্টন হোক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের দাবি, তিস্তা চুক্তি হলে উত্তরবঙ্গ শুকিয়ে যাবে। তারা তা হতে দেবে না। ফলে তিস্তা চুক্তি এখন বিশ বাঁও জলে। দেশের ভিতরে জল নিয়ে দেশের ভিতরেও তো সংঘাত কম হয়নি। কাবেরী জলবণ্টন নিয়ে কর্ণাটক ও তামিলনাডুর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। যমুনার জল পাওয়া নিয়ে হরিয়ানার সঙ্গে দিল্লির বিরোধও দীর্ঘদিন ধরে চলছে। প্রতিবার বর্ষার সময় পশ্চিমবঙ্গে বন্যা হলেই মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ডিভিসি না জানিয়ে জল ছেড়েছে, যা অস্বীকার করে ডিভিসি। জলবিরোধ বা জল নিয়ে অস্ত্রের প্রয়োগ তো ভারতের মধ্যেই দেখে আসছি আমরা।

জল-যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী?

এখন বিশ্বে একাধিক সংঘাত চলছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার কথা বলছেন অনেকে। কিন্তু যে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা তুলনায় কম, তা হল, এই জল নিয়ে ভবিষ্যতে সংঘাত আরও অনেকটাই বাড়তে পারে। জল নিয়ে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ছে। এই যুদ্ধ শুরু হলে তা সর্বব্যাপী হতে বাধ্য।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *