মাধ্যমিকের টেস্ট শুরুর আগে ছাত্রছাত্রীদের শেষ ক্লাস নিলেন চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকরা। পড়ুয়ারা অনেকে নিশ্চিত, তাদের স্যর-ম্যামরা আবার ক্লাসে ফিরবেন। কিন্তু এসএসসি’র ২০১৬ প্যানেলে নিযুক্ত ও পরে চাকরিহারা শিক্ষকরা জানেনই না, নতুন বছরে তাঁদের কপালে কী আছে?
টেট-এ নিয়োগে অনিয়মের মামলায় ৩২০০০ প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বহালের নির্দেশে খুশি হলেও প্রায় ২৬০০০ চাকরিহারা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা এখন আক্ষেপ করছেন। তাঁদের মনে হচ্ছে, প্রাথমিকের ক্ষেত্রে যেমন হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের দুই বিচারপতি দীর্ঘ ন’বছরের শিক্ষকতা এবং ৩২০০০ পরিবারের কথা মাথায় রেখে সকলের চাকরি বহালের নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনই তাঁদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা এবং হাজার হাজার পরিবারের কথা বিবেচনা করে চাকরিটা বহাল রাখতে পারত শীর্ষ আদালত।
চাকরিহারাদের মতে, প্রাথমিকের মতো এসএসসি-তে নিযুক্ত সকলেই দুর্নীতিতে যুক্ত নন। কেউ কেউ হয়তো যুক্ত। সুতরাং কয়েকজনের জন্য সকলে দুর্ভোগ পোহাবেন কেন? এখন দাগি শিক্ষাকর্মীদের তালিকা প্রকাশের পর একই বক্তব্য চাকরিচ্যুত যোগ্য শিক্ষাকর্মীদের।
এসএসসি’র ২০১৬ প্যানেলের চাকরিহারারা সত্যিই দুর্ভাগা। এর মধ্যে নতুন করে একাদশ-দ্বাদশ, নবম-দশমের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ইন্টারভিউয়ের তালিকায় নাম নেই অনেক যোগ্য শিক্ষকের। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশমতো তাঁদের চাকরি ডিসেম্বর পর্যন্ত। তারপর কী হবে? শীর্ষ আদালতের নির্দেশ ছিল, ২০১৬ সালের প্যানেলের একমাত্র চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকরাই এই পরীক্ষায় বসতে পারবেন। যোগ্যরা প্রথমে জেদ ধরেছিলেন, তাঁরা কিছুতেই আর পরীক্ষায় বসবেন না। চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেননি তাঁরা। কিন্তু ফের পরীক্ষা দিয়েই বা কী হল?
ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট এসএসসি’র সব মামলা হাইকোর্টে ফেরত পাঠিয়েছে। হাইকোর্টই যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেবে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, একজন দাগিকেও চাকরি দিতে পারবে না কমিশন। অভিযোগ, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দাগি বিশেষভাবে সক্ষম নিযুক্তদের সুযোগ দিয়েছিল এসএসসি। তা বাতিল করে হাইকোর্ট। মামলা সুপ্রিম কোর্টে গেলে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, একজন দাগিকেও পরীক্ষায় বসতে দেওয়া যাবে না।
শীর্ষ আদালতের প্রশ্ন, চাকরিহারাদের সঙ্গে নতুন চাকরিপ্রার্থীদের পরীক্ষায় কেন বসতে দেওয়া হল? অন্যদিকে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, সাম্প্রতিক নিয়োগ পরীক্ষার সমস্ত ওএমআর শিট ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে আদালতে জমা দিতে হবে। সত্যি বলতে কী, নানা কারণে পুরো ব্যাপারটাই নতুন করে জটিল হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, যোগ্য চাকরিহারাদের অনেকে ইন্টারভিউয়ে ডাক পাননি। দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্ট বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও নতুন নিয়োগ পরীক্ষায় দাগিদের বসতে দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টের বারণ সত্ত্বেও নতুনদের পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়েছে। চতুর্থত, নতুন চাকরিপ্রার্থীরা মামলার হুমকি দিয়েছেন। পঞ্চমত, অভিজ্ঞতার জন্য ১০ নম্বর দেওয়া নিয়ে নতুন চাকরিপ্রার্থীরা সরব।
আদালতে বিষয়টি খারিজ হয়ে গেলে আবার নতুন তালিকা বানাতে হবে। অর্থাৎ পুরো ব্যাপারটাই বিশবাঁও জলে। গত এপ্রিলে শীর্ষ আদালত ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল করলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথা দিয়েছিলেন, একজনেরও চাকরি যাবে না। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, তাঁর প্ল্যান এ, বি, সি, ডি, ই- সব তৈরি আছে।
কিন্তু এখন নতুন জটিলতায় চাকরিহারাদের কারও চাকরি আর নিশ্চিত নয়। মামলার পর মামলা হয়ে চলেছে। প্রশ্ন উঠেছে, যাঁরা নিজের যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছিলেন, কমিশন ও সরকারের দুর্নীতির মাশুল কেন গুনতে হবে তাঁদের? ৩২০০০ চাকরি বহালের রায়ে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী খুব খুশি। সেজন্য আশার আলো দেখছেন এসএসসি’র চাকরিহারা শিক্ষকরা। রাজ্যকে দিয়ে আরও একবার শীর্ষ আদালতে আবেদন করানোর ভাবনাচিন্তা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
