বিদ্রোহের ভড়ং, সার্বিক দেউলিয়াপনা প্রতীক কাণ্ডে

বিদ্রোহের ভড়ং, সার্বিক দেউলিয়াপনা প্রতীক কাণ্ডে

ব্লগ/BLOG
Spread the love


গৌতম সরকার

কলার খোসায় বিদ্রোহের হোঁচট। অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে সিপিএমের একাংশে আশা জাগিয়েছিলেন প্রতীক উর রহমান (Pratik Ur Rahman)। প্রশ্নগুলি প্রাসঙ্গিক। কিন্তু নটেগাছটি মুড়িয়ে যাওয়ার পথে। তাঁর তোলা প্রশ্নগুলি সিপিএমের আরও অনেকের। দলীয় নেতৃত্বের ফাঁকফোকর ও মতাদর্শগত দেউলিয়াপনা বেআব্রু হচ্ছিল তাঁর কথায়। দলের একাংশ সবে মনে মনে প্রতীকের বিদ্রোহের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। এক সপ্তাহের মধ্যে স্পষ্ট হল, বিদ্রোহ নয় মোটেও, পেছনে অন্য উদ্দেশ্য ছিল।

ব্যক্তিগত বিদ্রোহে ইতি ফেলার পাশাপাশি সিপিএমের মধ্যে প্রশ্ন করার বা প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার সাহসের গোড়ায় জল ঢেলে দিয়ে চলে যাচ্ছেন প্রতীক। সিপিএমেরও (CPIM) তাঁকে হিরো থেকে জিরো করে দেওয়া সময়ের অপেক্ষামাত্র। দলের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিলে তাঁর আস্ফালনের আর মূল্য থাকবে না। আসলে চারদিকে তাঁকে মহান বানানোর সচেতন প্রয়াসের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন প্রতীক।

ফাঁদটা যেমন দলের একাংশের, তেমনই অন্যদলের পরিকল্পিত। প্রতীক স্বেচ্ছায় সেই ফাঁদে ধরা দেওয়ায় সিপিএমের মধ্যে যাঁরা প্রথমদিকে তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, ইতিমধ্যে তাঁদের মোহভঙ্গ হয়েছে। অন্য দলে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই যে তাঁর এই বিদ্রোহের ভড়ং, তা একরকম স্পষ্ট। নীতি, নৈতিকতা না থাকলে কমিউনিস্ট পার্টি হয় নাকি লিখে যিনি ফেসবুকে ঝড় তুলেছিলেন, সেই তিনিই নিজের এতদিনের বিশ্বাসে অটল থাকলেন না।

ওঁর সমসাময়িক দলের এক ঝাঁক উজ্জ্বল ছেলেমেয়ের মনে আশা জাগিয়ে যেমন তিনি বিশ্বাসভঙ্গ করলেন, তেমনই যে কোনও মতাদর্শে অবিচল থাকার প্রাচীরের আরও কয়েকটি ইট খুলে ফেললেন প্রতীক। শুধু সিপিএম বলে নয়, সার্বিকভাবে আদর্শগত রাজনীতি যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তার চরম সর্বনাশও করলেন তিনি। স্বচ্ছ, সুস্থ রাজনীতির প্রতি তরুণ প্রজন্মের বিমুখতার চলতি প্রবণতায় হাওয়া জোরালো হল তাঁর বিদ্রোহের ভড়ংয়ে। অথচ তাঁর প্রশ্নগুলি যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত ও নৈতিক ছিল।

তিনি বলেছিলেন, পার্টি চালান যাঁরা, তাঁদের একাংশ হাজার হাজার প্রতীক উরকে চুপ করিয়ে রাখতে চান। এমন কিছু লোক আছেন, যাঁরা দলের নয়, ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁদের একাধিপত্যে দলের অনেক সদস্য নিপীড়িত হচ্ছেন। নেতৃত্বের সমালোচনা সহ্য করা হয় না। করলে তাঁকে কোণঠাসা করা হয়। অভিযোগগুলি যে দলে অনেকের, তা পার্টি সদস্যরা বুকে হাত রেখে অস্বীকার করতে পারবেন?

তৃণমূলে (TMC) বা বিজেপিতে (BJP) এত গোষ্ঠীবাজি নিয়ে কথা হয়। সিপিএমেও তার কমতি নেই। শুধু দুই লাইনের লড়াইয়ের আদর্শগত মোড়কে সেই ভড়ংকে ঢেকে রাখা হয়। পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় থাকাকালীন বিরুদ্ধ স্বরকে আমল না দেওয়া ছিল নিয়ম। এমনভাবে বিরোধিতাকে দমন করা হত যাতে বাইরে বা দলে সেই স্বর ভিলেন হয়ে যায়। একসময় কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন পার্টিঅন্ত প্রাণ সৈফুদ্দিন চৌধুরী। আজ সেই কংগ্রেসের হাত ধরতে সিপিএম নেতৃত্বের কত আকুলিবিকুলি।

ইউপিএ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের একগুঁয়েমির প্রতিবাদ করায় সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পর্যন্ত রেয়াত করেনি িসপিএম। অথচ সংসদীয় রাজনীতিতে সিপিএমের ক্ষয়ের সূত্রপাত ঘটেছিল সেই সমর্থন প্রত্যাহারে। আত্মপক্ষ সমর্থনের ব্যবস্থা আছে বলে সিপিএমের দলিলে লেখাটাও আসলে আরেক ভড়ং। প্রতীক উরকে তো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগই দেওয়া হল না। রাজ্য কমিটির সদস্য হলেও তাঁকে বৈঠকে ডাকল না সিপিএম নেতৃত্ব।

প্রতীককে নিয়ে প্রশ্ন করায় মহম্মদ সেলিমের সংবাদমাধ্যমকে কলার খোসা দেখানো রাজ্য সম্পাদক সুলভ আচরণ কি? বরং চরম ঔদ্ধত্যের প্রতিফলন দেখা গেল। এই তাচ্ছিল্য সিপিএমের অনেকের মধ্যে বহুদিন ধরে হতাশা তৈরি করে চলেছে। নতুন প্রজন্ম এই ঔদ্ধত্যের কারণে সিপিএমের প্রতি বিমুখ হয়। ঔদ্ধত্যের জন্যই এই শতকের প্রথম দশকে বাংলার সংসদীয় রাজনীতিতে সিপিএমে ঘুণ ধরেছিল।

২০০৮-এর পঞ্চােয়ত নির্বাচনে প্রথম ঘুণটা টের পাওয়া গিয়েছিল। ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনে যা ঝড় হয়ে আছড়ে পড়ে। তৃণমূলের প্রতি আস্থার চেয়ে মানুষের বিবেচনায় বড় হয়ে উঠেছিল সিপিএমের একশ্রেণির নেতার ঔদ্ধত্য ও অহংকার, যা অসহ্য হয়ে উঠেছিল তাঁদের কাছে। সেই মনোভাব নেতারা যে এখনও ছাড়েননি, তা আবার স্পষ্ট হল। প্রতীক আসলে সেই দেউলিয়াপনার ফসল। মোটেও বিদ্রোহের, আদর্শের ধ্বজাবহনকারী নন।
বিদ্রোহের দামামা বাজিয়ে, নিজেকে আগমার্কা বিপ্লবী প্রতিপন্নের চেষ্টা করে প্রতীক উর সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। তিনি তৃণমূলে যোগ দেবেন কি না, হয়তো এই লেখা ছেপে বেরোনোর সময় স্পষ্ট হয়ে যাবে। তবে তাঁর কিছু কথাকে তো তার লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে। যেমন, তিনি হঠাৎ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভূয়সী প্রশংসা করতে আরম্ভ করেছেন কিংবা সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলায় সওয়াল করার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুখ্যাতি শোনা যাচ্ছে তাঁর মুখে।

তাতে অবশ্য তাঁর তোলা প্রশ্নগুলির গুরুত্ব লঘু হয়ে যায় না। যেমন তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন, রাজ্য কমিটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তাঁর ইস্তফাপত্র দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে তা ভাইরাল হল কী করে? কিংবা বিমান বসু যে তাঁকে ফোন করেছিলেন, সেটাই বা বাইরে প্রচার করলেন কে? যে প্রশ্নগুলি থেকে স্পষ্ট, প্রতীককে ঝেড়ে ফেলার দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া দলে চলছিলই।

তাঁর জন্য প্রতীকের দায় আছে কি না কিংবা দীর্ঘদিন তাঁকে কোণঠাসা করে রাখায় হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে কি না অথবা হুমায়ুনের সঙ্গে দলের সখ্য তৈরির প্রয়াসের প্রতিবাদের জন্য কি না, তা সিপিএমের ঘরোয়া ব্যাপার। সংসদীয় রাজনীতিতে শূন্য হয়ে যাওয়া দলটি সম্পর্কে এত কথা বলার একটাই কারণ, প্রতীক এপিসোড রাজনীতির সার্বিক দেউলিয়াপনাকে তুলে ধরল।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *