বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যে হারানো এক রিক্ত সমাজ

বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যে হারানো এক রিক্ত সমাজ

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


(অন্ধকার ঋণের জালে বন্দি মেকি আভিজাত্য থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন সুস্থ মূল্যবোধ ও গভীর আত্মসমালোচনা)

সাহানুর হক

বছর তিনেক আগে লোকদেখানোর খাতিরেই গ্রামের বাবুনদা পরিবার সহ শহরে চলে যান। শহরে যাওয়ার পরই মাথা তুলে দাঁড়াল দোতলা বাড়ি। প্রথমে ছিল বাইক, তারপর চার চাকার গাড়ি। এসব দেখে গ্রামের বহু মানুষের মুখে শোনা যায়— বাবুনদারা অত্যন্ত সুখী পরিবার। অথচ একদিন বাবুনদার গুরুতর অসুস্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, মাথায় পঁচিশ লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা তাঁর। শুনে বিস্ময় জাগে। আদৌ কি দরকার ছিল এমন কৃত্রিম সুখের? আদতেই এমন জীবন কতটা স্বস্তির?

বাবুনদা ও তাঁর পরিবারের মতো অনেকেই আজ আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছেন। লোকদেখানো জীবনযাপনে অভ্যস্ত এইসব মানুষ অন্যকে নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য দেখালেই বোধহয় তৃপ্তি পান। অথচ দিনশেষে আত্মতৃপ্তির বেলায় দেখা যায়, ডাল বা আলুসেদ্ধ দিয়ে ভাত খেয়ে অথবা না খেয়েই হয়তো রাত কাটাচ্ছেন তাঁদের অনেকেই। অর্থাৎ পেটে অন্ন না থাকুক, অন্যের সামনে নিজেদের প্রদর্শন করাতেই হবে। প্রাচীনকাল থেকেই এমন প্রবণতা থাকলেও ইদানীংকালে এর বাড়বাড়ন্ত অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে। ধীরে ধীরে এই প্রদর্শনীই যেন বর্তমান সমাজের ‘ট্রেন্ডিং’ বা মূল ধারা হয়ে উঠছে, যা শহর থেকে গ্রামেও ছড়িয়ে যাচ্ছে লতাগুল্মের ডালের মতোই।

আগে যেখানে পরিচয় নির্ধারিত হত মূল্যবোধ, জ্ঞান বা কর্মে, এখন তা নির্ধারিত হচ্ছে বাহ্যিক সাফল্য, ব্র্যান্ডেড জীবনযাপন এবং ভার্চুয়াল সুখ প্রদর্শনীর ওপর। যার ফলস্বরূপ ‘আমি কে’— এই মৌলিক প্রশ্নটি বদলে যাচ্ছে ‘আমি কী দেখাতে পারি’-এর অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। এই প্রেক্ষিতে তরুণ প্রজন্মের কথা না বললেই নয়। বাবা দিনমজুরি করে সংসার চালান, অথচ জন্মদিনে জাঁকজমকপূর্ণ রেস্তোরাঁয় সব বন্ধুকে বিরিয়ানি পার্টি দিতেই হবে হতভাগ্য বাবার কলেজ পড়ুয়া সন্তানকে। তা না হলে বন্ধুদের সামনে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয়! এভাবেই এক অবাস্তব সমাজের সদস্য হয়ে উঠছি আমরা।

এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও একই ছবি। বন্ধু বৃত্তের কেউ কেউ নিয়মিত দামি রেস্তোরাঁ থেকে ডুয়ার্সের পাহাড়ি রিসর্টে ভ্রমণের ছবি পোস্ট করাতেই মগ্ন। আজ ‘অমুক’ এটা করেছেন তো কাল ‘তমুককে’ সেটা করতেই হবে। এমনই এক ভার্চুয়াল প্রতিযোগিতায় ভেসে বেড়াচ্ছে সমাজ। প্রশ্ন একটাই, এত রং মাখানো জীবন বা আনন্দঘন মুহূর্তের ছড়াছড়ি একে অপরকে দেখিয়ে কী লাভ, যদি দিনশেষে নিজেরাই নিজেদের তৃপ্ত চোখে দেখতে না পারি?

সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতের কমবেশি সত্তর শতাংশ আইফোন ব্যবহারকারী নাকি ইএমআই দিয়ে ফোন কিনে থাকেন। এই তথ্য শোনার পর হাসবেন না কাঁদবেন, তা ভাববার বিষয়। একবার ভেবে দেখুন, শৌখিনতার সীমারেখা ছাড়িয়ে আমরা ঠিক কোন অতলে পৌঁছেছি। এই সামাজিক ব্যাধি থেকে উত্তরণের জন্য এখনই প্রয়োজন মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ও আত্মসমালোচনার চর্চা। এই শৌখিন মানুষের জানা দরকার— মানুষের প্রকৃত মূল্য তার চরিত্রে, সহমর্মিতা ও দক্ষতায়; বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়।

অস্থির সময়ের দৈনন্দিন যাপনের পর শব্দহীন রাতে পরিবারের সঙ্গে খাবার টেবিলে বসলে বোঝা যায়, আমাদের বৈচিত্র্যময় জীবনে গদ্য ও পদ্যের ভ্রমের মাঝেই আসল সংগ্রাম। তবুও সংবিৎ ফিরছে না জীবনের এই অতল বিপাকে। প্রত্যেকেই যেন হাজারো কঠিন ব্যাধির ঘাড় চেপে ‘শো-অফ’ নামক খেয়ায় চড়ে বাবুনদাদের মতোই দিনকে রাত আর রাতকে দিন মনে করে অজান্তেই এক অনন্তের দিকে এগিয়ে চলেছি। কী জানি কোন উদ্দেশ্যে, কোথায় এই যাত্রার শেষ? সমাজ-বৈচিত্র্যের এই ব্যাধি থেকে মুক্তির পথ কবে সুগম হবে?

(লেখক গ্রন্থাগারিক। দিনহাটার বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *