আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে জয়প্রকাশ নারায়ণ (বা ‘জে. পি.’) এমন ব্যক্তিত্ব– যিনি বিচিত্র সব মতাদর্শিক পথের যাত্রী হয়েছেন, এবং ব্যক্তিগত সততার ক্ষেত্রে অটুট ও বলিষ্ঠ ভাবমূর্তি বজায় রেখেছেন। তিনি বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী, গান্ধীবাদী, সর্বোদয় কর্মী, বিকেন্দ্রীভূত গণতন্ত্রের প্রবক্তা। তৎসহ রাজনৈতিক জীবনের আধা-অবসর ভেঙে বেরিয়ে এসে ‘জরুরি অবস্থা’-র সময় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরতন্ত্র ও তজ্জনিত দমনমূলক কর্মকাণ্ডকে চ্যালেঞ্জ জানানো একজন প্রবীণ নেতা– যঁার এক জীবনে বহুবিধ রাজনৈতিক সত্তার সমন্বয় ঘটেছিল।
ইন্দিরা-বিরোধিতায় নেমে সমাজতন্ত্রী ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রী জে. পি.– জন সংঘ ও আরএসএসের সঙ্গে জোটে শামিল হয়েছিলেন– যার ফলে হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী শক্তি এক
বৃহত্তর বিরোধী মঞ্চে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল। ফলে প্রশ্নও ওঠে– গণতন্ত্র রক্ষার তাগিদে
তিনি যে-‘জোট’ গড়েছিলেন, তা কি অজান্তেই কোনও রাজনৈতিক শক্তিকে বৈধতা দিয়েছিল,
যে-আদর্শগত অবস্থানের তিনি এক সময় চরম বিরোধিতা করতেন?
আরও পড়ুন:
ছাত্রাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় জয়প্রকাশ নারায়ণ মার্কসবাদের সংস্পর্শে আসেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে প্রগতিশীল চিন্তাধারা নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন।
আরও পড়ুন:
ছাত্রাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় জয়প্রকাশ নারায়ণ মার্কসবাদের সংস্পর্শে আসেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে প্রগতিশীল চিন্তাধারা নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন। ১৯৩৪ সালে গঠিত ‘কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি’-র অন্যতম প্রধান রূপকার তিনি। ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ চলাকালে হাজারিবাগ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তঁার নাটকীয় পলায়ন এবং পরে আত্মগোপন করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা– যা তঁার বুদ্ধিজীবী সত্তার পাশাপাশি এক বিপ্লবী ব্যক্তিত্বের আবহও তৈরি করেছিল।
জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে জে. পি.-র ছিল জটিল এক সম্পর্ক। তঁাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কখনওই ক্ষুণ্ণ হয়নি। জে. পি.-র সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও ব্যক্তিত্বের কারণে নেহরুর সম্ভাব্য উত্তরসূরি রূপে মাঝেমধ্যেই তঁার নাম আলোচিত হত। পঁাচের দশকে সমাজবাদীদের পুনরায় কংগ্রেসে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার জন্য নেহরু– জয়প্রকাশকে ডেকেছিলেন। যদিও সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জে. পি. গান্ধী, বিনোবা ভাবে ও সর্বোদয় দর্শনের দিকে ঝুঁকেছিলেন। এ পরিবর্তনের নেপথ্যে একটি প্রশ্ন নিহিত ছিল, যা তঁার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে যায়– কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেই কি সামাজিক রূপান্তর ঘটানো সম্ভব? ক্রমশই যেন এর উত্তর হয়ে দঁাড়াল– ‘না’। উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও, জে. পি. কোনও সরকারি পদ বা ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। দলীয় রাজনীতি থেকে কার্যত সরে আসেন, এবং ভূদান, সর্বোদয় ও বিকেন্দ্রীভূত গণতন্ত্রের বিভিন্ন পরীক্ষায় নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন।
বিহারের ছাত্র আন্দোলন যখন তঁার নেতৃত্ব চাইল, তখন প্রবীণ এই গান্ধীবাদী নেতা তাতে সম্মত হন– তবে শর্ত দেন– আন্দোলনটি অবশ্যই অহিংস হতে হবে।
সরকারি পদ গ্রহণে জে. পি.-র অস্বীকৃতিও শেষ পর্যন্ত তঁার রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের সরিয়ে সেই স্থান দখলের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যঁারা আক্রমণ করেন, সেসব রাজনীতিকের বিপরীতে জে. পি. জোর দিয়ে বলতে পারতেন– তিনি পদের লোভ করেন না যা তিনি অন্যদের ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
নির্বাচনী রাজনীতি থেকে সরলেও জনজীবন থেকে সরে আসেননি। তাই তো জে. পি. নাগাল্যান্ডের শান্তিপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিলেন, কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে আলোচনার পথ অবলম্বনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন, মুসাহারি এলাকায় কৃষি-সংঘাতের শিকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজ করেছিলেন এবং ১৯৭২ সালে চম্বল উপত্যকায় দস্যুদের আত্মসমর্পণের সময়ও অংশ নেন। শুধুমাত্র ‘জরুরি অবস্থা’-র প্রেক্ষাপটে তঁার কর্মজীবনকে বিচার করলে এসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আড়ালে চলে যায়। ১৯৭৪ সালে জে. পি.-র বয়স প্রায় ৭২। দুর্নীতি, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি অকার্যকারিতার বিরুদ্ধে ছাত্র-বিক্ষোভ তখন বিহারের রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বিহারের ছাত্র আন্দোলন যখন তঁার নেতৃত্ব চাইল, তখন প্রবীণ এই গান্ধীবাদী নেতা তাতে সম্মত হন– তবে শর্ত দেন– আন্দোলনটি অবশ্যই অহিংস হতে হবে। তারপর আন্দোলনকে এমন এক রূপ দিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তঁার নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠল: ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ বা ‘সামগ্রিক বিপ্লব’। ১৯৭৫ সালে এলাহাবাদ হাই কোর্টের রায়ে রায়বেরিলি থেকে ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৭১ সালের নির্বাচনী জয় বাতিল ঘোষিত হওয়ার পরে– সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। ওই সময় দিল্লির রামলীলা ময়দানে এক জনসভায় জে. পি. (জয়প্রকাশ নারায়ণ) পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা এমন কোনও আদেশ পালন না করেন, যা তাদের কাছে বেআইনি বা অনৈতিক বলে মনে হয়। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার এই আহ্বানকে বিদ্রোহের উসকানি হিসাবে অভিহিত করে।
সেই রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ১৯৭৭ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সংঘ জাতীয় সরকারের অংশ হয়ে ওঠে।
২৫ জুন ১৯৭৭, দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি হয়। জে. পি.-সহ বহু ইন্দিরা-বিরোধী নেতা গ্রেফতার হন। সংবাদপত্রের উপর সেন্সরশিপ আরোপ এবং নাগরিক স্বাধীনতা কঠোরভাবে সংকুচিত করা হয়। বন্দিদশায় স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটায় ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে স্বাস্থ্যগত কারণে মুক্তি পান জে. পি.। যদিও কিডনি অকেজো হওয়ায় ডায়ালিসিসের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। তখন ক্রমশ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়ে রাজনৈতিক জোট গড়তে জন সংঘ ও আরএসএস-কে সঙ্গী করাকে জে. পি.-র জীবনের অন্যতম বিতর্কিত পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হয়।
সমালোচকরা সংঘকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলায় তখন জে. পি.-র বিখ্যাত মন্তব্য– যদি সংঘ ফ্যাসিবাদী হয়, তবে তিনিও ফ্যাসিবাদী। সেদিনের জে. পি.-র বার্তা ছিল যে, কেউ তঁার এই আন্দোলনের অহিংস নীতি ও গণতান্ত্রিক লক্ষ্য মেনে চললে, তিনি অংশ নিতেই পারেন। এই আন্দোলনের ফলে সংঘ ও আরএসএস ভারতের অন্যতম শ্রদ্ধেয় সমাজতন্ত্রী-গান্ধীবাদী ব্যক্তিত্বের নৈতিক আশ্রয়ে একটি বৃহত্তর বিরোধী জোটের অংশ হয়ে কাজ করার সুযোগ পায়। সেই রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ১৯৭৭ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সংঘ জাতীয় সরকারের অংশ হয়ে ওঠে।
সেই সমঝোতা বা অন্তর্ভুক্তির তাৎপর্যকে জে. পি. সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন কি না– তা এখনও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। তবে জে. পি.-র আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিরোধী শিবিরের নানা গোষ্ঠী ১৯৭৭ সালে একত্র হয়ে ‘জনতা পার্টি’ গঠন করে ইন্দিরা কংগ্রেসকে পরাজিত করে। মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে স্বাধীন ভারতের প্রথম অ-কংগ্রেসি কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করে। যদিও তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। অভ্যন্তরীণ কোন্দল জনতা পার্টিকে গ্রাস করে। ওই জোট, জে. পি.-র ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবের কারণে গড়ে উঠলেও, অভিন্ন প্রতিপক্ষকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তা আর অটুট থাকেনি। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে জে. পি. যখন প্রয়াত হন, তখন তঁার অত্যন্ত প্রত্যাশা-জড়ানো সেই রাজনৈতিক পরীক্ষাটিই ভেঙে পড়ার মুখে।
জে. পি.-র রাজনৈতিক যাত্রাজুড়ে যে বিষয়টি গভীরভাবে কাজ করেছে, তা হল, ক্ষমতার প্রকৃতি ও সীমাবদ্ধতা– অর্থাৎ, সরকার কি এককভাবে সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম?
এর মধ্যেই যেন এক চমকপ্রদ পরিহাসও নিহিত ছিল। জে. পি. দশকের পর দশক ধরে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন, রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন না ঘটিয়ে কেবল শাসক বদল করলে বিশেষ সুফল পাওয়া যাবে না। জনতা পার্টির আমলের অভিজ্ঞতা তঁার সেই আশঙ্কারই সত্যতা প্রমাণ করেছিল: সরকার বদলালেও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বদলে ফেলা ছিল অনেক বেশি কঠিন কাজ। মার্কসবাদ থেকে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র ও সর্বোদয়ের পথে তঁার যাত্রা, কিংবা দলীয় রাজনীতি থেকে সরে দঁাড়ানো থেকে শুরু করে গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া– সবকিছুকে সরল আদর্শিক যাত্রাপথ রূপে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। একইভাবে জে. পি.-কে কেবলমাত্র ইন্দিরা গান্ধীকে চ্যালেঞ্জ জানানো একজন ব্যক্তি হিসাবে বোঝা সম্ভব নয়; আবার আরএসএসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েও তঁার রাজনৈতিক জীবনকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।
জে. পি.-র রাজনৈতিক যাত্রাজুড়ে যে বিষয়টি গভীরভাবে কাজ করেছে, তা হল, ক্ষমতার প্রকৃতি ও সীমাবদ্ধতা– অর্থাৎ, সরকার কি এককভাবে সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম? নাগরিকদের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ ছাড়া প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র কি আদৌ প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক থাকতে পারে? জে. পি. সন্তোষজনকভাবে সমাধান করতে পারেননি এসব প্রশ্নের। সম্ভবত ঠিক এ কারণেই লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণকে নিয়ে নতুন করে আলোচনার অবকাশ ও গুরুত্ব রয়ে যায়।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক সাংবাদিক
[email protected]
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
