অনিন্দিতা গুপ্ত রায়
‘প্লিজ, আমাকে আর নতুন কিছু দিও না! আলমারি ভর্তি নতুন জামা এখনও পরে শেষ করে উঠতে পারিনি’- ননদিনীর কাতর আবেদনে বৌমণি মোটেই অবাক হন না। এই সময়কালের এটাই যে নিয়ম বা ট্রেন্ড। পুজোয় আর আলাদা করে নতুন পোশাক চাই না! প্রয়োজনীয় অন্য কিছু দিতে পারো, কিন্তু প্লিজ জামাকাপড় না!
অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির দরুন প্রকৃতিতে সেভাবে শরতের ছোঁয়া না লাগলেও ক্যালেন্ডারের পাতায় পুজো এসে গিয়েছে। পুজোর যাবতীয় অনুষঙ্গ, যেমন ওই শিশির শিউলি কাশ, ভোরবেলার হালকা শীত শীত ভাব, আকাশের নীল-সাদা পাল তোলা নিরুদ্দেশ মেঘের দল ইত্যাদি সবকিছু একঘেয়ে শোনালেও এক রয়ে গিয়েছে। শুধু বাঙালির পুজোর বাজার সারা বছরের অনলাইন বা অফলাইন শপিংয়ে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে।
পুজো বা শরৎ নিয়ে লিখতে বসলে যত চর্বিতচর্বণই মনে হোক না কেন, কিছু স্মৃতিকাতর অনুষঙ্গ বা শব্দবন্ধ বাদ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। কেননা, পুজোর সময়ের কিছু নিজস্ব ইন্দ্রিয়ঘন উপস্থিতি থাকে, যা চক্ষু-কর্ণ-নাসিকার মধ্যে দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। পুজোর গন্ধ, পুজোর ‘না বলা বাণী নিয়ে আকুলতা’ বেজে ওঠা অলক্ষ্য বাঁশির সুর- সবের মধ্যেই একটা ছুটি ছুটি আলো আলো মনকেমনিয়া টান।
এই পুজো মানে যে উপাসনা নয়। উৎসব যে নিশ্চয়, সেটা আর আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে না। এসবের অন্যতম আকর্ষণ পুজোয় নতুন জামা। সঙ্গে জুতোও, যা এক বিখ্যাত জুতো প্রস্তুত কোম্পানির বহুকালের ট্যাগ লাইন, ‘পুজোয় চাই নতুন জুতো!’ সদ্য বর্ষার জল ডিঙিয়ে শতচ্ছিন্ন ব্যবহৃত জুতোটিকে বদলে নেওয়ারও এই তো অবকাশ। মা-বাবার সঙ্গে নতুন জামা-জুতো কিনতে যাওয়া, পুজোসংখ্যা নিয়ে টানাটানি, নতুন গানের ক্যাসেট বা সিডি কেনার হিড়িক- এসব তো ‘বঙ্গজীবনের অঙ্গ।’
ভুল হল, মধ্যবিত্ত তথা ভদ্রবিত্ত জীবনের বলা যায়। যে জীবনের সূচকগুলো বদল হলে আমরা সামগ্রিকতার প্রতিই জাজমেন্টাল হয়ে উঠি। সেই জীবন কবে যেন ড্রয়িংরুমে রাখা বোকাবাক্সের জমানা টপকে এখন হাতের মুঠোর কয়েক ইঞ্চি পর্দায় এক্কেবারে নিজেকে সেঁধিয়ে ফেলেছে। পয়লা বৈশাখের একপ্রস্থ নতুন জামাকাপড় সহ নানাবিধ প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় অবান্তর বস্তুসামগ্রীর মারকাটারি হইহই সামলাতে না সামলাতে আচমকা মুঠোর স্ক্রিনে হাসিমুখের ঘোষণা, ‘সামনেই তো পুজো! কিনে ফেলুন পুজো স্পেশাল জামাকাপড়!!’
চমকে উঠে ক্যালেন্ডারে দেখি, জামাইষষ্ঠী আসার আগেই দুর্গাষষ্ঠীর পসরা হাজির, কেনাকাটাও শুরু। সঙ্গে নানাবিধ আকর্ষণীয় ছাড়ের হাতছানি। বুদ্ধিমান বাঙালি নাকি চৈত্র সেলেই পুজোর বাজার সেরে ফেলে- এমন গল্প শুনে অবাক হয়েছি একসময়। তবে যে ছোটবেলায় মা-বাবা, ভাইবোনদের সঙ্গে নতুন জামা-জুতো কিনতে যাওয়ার চল ছিল! কেনাকেটা শেষে মোগলাই আর আইসক্রিম খাওয়া, সারা গায়ে লাল টমেটো সস মেখে রিকশা চেপে বাড়ি ফেরা ছিল, সেসব দিন কি ফুরোল?
না, আসলে ঠিক তা নয়, ফুরোয়নি সে সব। বরং বিশ্বজোড়া বাজার আর মল-সংস্কৃতির জাঁতাকলে শব্দগুলি অনুষঙ্গ বদলে রক্তে-মজ্জায় এমনভাবে ঢুকে পড়েছে যে, ফুরোনো তো দূরে থাক, আমরা শুধুই মার্কেটিং ও শপিং করে চলেছি রাতদিন, বছরভর। তারজন্য ঘর হতে দুই পা ফেলিবার প্রয়োজনও ইদানীং ফুরাইয়াছে। সারা বছর কারণে-অকারণে কাজে-অকাজে অনলাইন শপিংয়ের কত পার্সেল যে না খোলাই পড়ে থাকে কতজনের ঘরে! বাজার করা ক্রিয়াটি প্রয়োজন থেকে কবে যেন নেশায় পরিণত হয়েছিল, নিজেরা টেরটিও পাইনি।
তাহলে কি পুজোর সময় কেনাকাটার পাট আদৌ আর নেই? বিশেষত নতুন জামা? আছে বৈকি! তবে তার অধিকাংশই হয়তো আর পুজোয় পরার বা দেওয়ার জন্য নয়। নিছক অভ্যাসে, যা নেশায় পরিণত, কিছুটা বাজারে নতুন জিনিস আসার খোঁজে যাতে ফ্যাশন দুনিয়ায় পিছিয়ে যেতে না হয়। কিছু আবার পুজো স্পেশাল অফারের হাতছানিতে। সঙ্গে শরতের আকাশ-বাতাস, পুজো ঘিরে বিরাট ব্যবসায়িক আদানপ্রদানের বৃহত্তর বিজ্ঞাপনী চমক আর সাজসজ্জা, ক্রেতাদের আরও আরও বাজারমুখী করে তোলার চেষ্টায় অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসায়ী, যাঁরা সারা বছর মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন প্রতিযোগিতায়, তাঁদেরও নতুনভাবে মাথা তোলার জন্য কিছু চমক- এসবই জমজমাট আকর্ষণের কাজ করে।
তিরিশ বছর আগে পুজোর পর পাঠানো বিজয়ার চিঠির মতো এখন আত্মীয়স্বজনের পুজোয় উপহার দেওয়া অনেক সংকুচিত হয়ে এসেছে। পুজোয় মা-বাবার কাছ থেকে খুব বেশি হলে দুই সেট জামা আর বাকি সবই কাকু, পিসি-মাসি, মামাদের দেওয়া, যা দিয়ে গুনে গুনে ষষ্ঠী থেকে দশমী অবধি দিব্যি চলে যেত। সেই উপহার দেওয়া এবং নেওয়ায় উভয়ের মধ্যে যে আদর-স্নেহ আর তৃপ্তি ছিল, তা এখন অন্তর্হিত সময়ের নিয়মে।
পুজোয় জামাকাপড় দিতে চাইলে বিরক্ত হন অধিকাংশজন। নিজেরা টাকা পাঠিয়ে দিতে পছন্দ করেন এক পাড়ায় থাকা প্রিয়জন বা আত্মীয়কেও। ঝামেলামুক্ত স্মার্ট ও শহুরে ব্যবস্থা বৈকি! মানতে যাঁর অসুবিধে, তিনি হয়তো কিছু পুরোনো বাতাস বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা নিজেদের জিনিস নিজেরা পছন্দ করে সারা বছর ধরে কিনে রেখে মা-বাবার চাপ হালকা করে দিচ্ছে।
ব্যক্তি স্বাধীনতার বা রুচির এই কদর পূর্ব জমানার যে মা-বাবারা শুনলে স্পর্ধা ভাবতেন, তাঁরা দিব্যি নাতি-নাতনিদের জন্য এই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছেন। অভিযোজন হয়তো এরই ডাকনাম। সময় বা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ নেওয়ায় দোষের কিছু নেই।
তার পরেও আছেন এক বিরাট নাগরিক সমাজ, যাঁরা সত্যিই আজও সপরিবার পুজোর বাজার করতে যান শহর, শহরতলি বা মফসসল বা আরও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে। অনলাইন শপিংয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যান। তাঁরাই আসলে প্রথাগুলোকে হারিয়ে যেতে দেন না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জোয়ারে বিশেষ পরিবর্তন সংখ্যাগুরু দেশবাসীরই আসলে হয়নি।
সারাবছর বেতনের টাকার নিশ্চিন্ত সরবরাহ নেই যাঁদের, ব্যবসার ওঠাপড়া বা পেশার অনিশ্চয়তায় হাতে আসা উদ্বৃত্ত অর্থটুকু সন্তানের শিক্ষা বা পরিবারের স্বাস্থ্য খাতে সঞ্চয়ের জন্য রাখতে হয় যাঁদের, উৎসবের দিন মানে যাঁদের কাছে বিনোদন নয়, বেড়াতে যাওয়ার অবকাশ নয়, বরং সেই উপলক্ষ্যগুলির ভরসায় সেগুলিকে কাজে লাগিয়ে কিছু বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা, তাঁদের পরিবারে যে কোনও উৎসবকে কেন্দ্র করে নতুন পোশাক কেনা আজও বিশেষ মুহূর্ত বৈকি।
তাই প্রতিদিনের বাজারি দুনিয়ায় কলের পুতুল হয়ে নেচে চলা আলোর বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে বন্ধ কারখানা বা চা শ্রমিকের সন্তান, যার সারা বছরে কেনা একটিও নতুন পোশাক নেই। নিজের চোখে দেখেছি, স্কুল থেকে পাওয়া ইউনিফর্মের টিউনিক ফ্রক বা হাফপ্যান্ট পরে ঠাকুর দেখতে বেরোনো বালক-বালিকার চোখে বিস্ময়মিশ্রিত বেদনার অন্ধকার। যার কাছে পুজো প্যান্ডেলের সব উজ্জ্বলতা ম্লান হয়ে আসে।
সারাবছর প্রবাসে পরিযায়ী শ্রমিক নামধারী বাবা বাড়ি ফেরার পর যে নতুন জামাকাপড় তাঁর ব্যাগ থেকে বের হয়, তার রং মেখে হেসে ওঠা পরিবারে আজও পুজো মানে নতুন জামার গন্ধ। যে কোনও পাওয়া আসলে বাহুল্যে ম্লান ও অর্থহীন। আমরাই কেড়ে নিয়েছি নতুন জামার আনন্দ। তারই খোঁজে তাই বাহুল্যহীন প্রাচুর্যহীন মুখগুলোর কাছে শারদপ্রাতে হাত পেতে দাঁড়ানো কারও কারও।
না, দাক্ষিণ্যের ডালি নিয়ে নয়, আনন্দ ফিরে পাওয়ার কাঙালপনায়। নতুন জামা, নতুন বই, জুতো, রং পেন্সিলের গন্ধ মেখে হাসিতে উজ্জ্বল মুখগুলির আয়নায় যে আগমনী বাজে, সেখানেই গচ্ছিত আছে আজন্মের শারদীয়া সম্ভার। দুর্গাপুজো সেখানেই চিরন্তন মাতৃবন্দনা।
