ভোটের বাঁশি বাজতে না বাজতে কেন্দ্রীয় বাহিনী (Central Drive) পৌঁছে গেল পশ্চিমবঙ্গে। বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে রুটমার্চ। বিধানসভা নির্বাচনের (West Bengal Meeting Election 2026) ঘোষণা হবে সম্ভবত মার্চের মাঝামাঝি। খাতায়-কলমে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হয়ে গিয়েছে। বিধানসভার মেয়াদ যেহেতু ৭ মে শেষ হচ্ছে, তার আগে নতুন সরকার গড়তেই হবে। বাংলার ভোটে শুধু দেশ নয়, গোটা বিশ্ব তাকিয়ে থাকে বললে অত্যুক্তি হয় না।
লোকসভা-বিধানসভা-পুরসভা-পঞ্চায়েত- যে নির্বাচনই হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে অশান্তি না হওয়ার নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন। বামফ্রন্ট জমানায় ২০০৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটে হিংসার বলি হয়েছিলেন বহু মানুষ। তৃণমূল আমলেও ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসায় মৃত্যু হয় অনেকের। কোনও লোকসভা ও বিধানসভা ভোট পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ হয় না। সংঘর্ষ-অশান্তি লেগেই থাকে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হয়েছিল ১১০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। এবার এখনও পর্যন্ত এরাজ্যে ভোটের আগেই ৪৮০ কোম্পানি বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২৪০ কোম্পানি পৌঁছেও গিয়েছে ইতিমধ্যে। বাকি ২৪০ কোম্পানি আসবে ১০ মার্চের মধ্যে। বাংলায় ভোট করাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্য নেওয়া কার্যত নিয়ম হয়ে গিয়েছে।
শয়ে-শয়ে কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এরাজ্যে পাঠানো হয়। সাধারণ মানুষের মন থেকে ভয় তাড়ানোর নামে ভোটের আগে থেকে এলাকায় এলাকায় বাহিনীর রুটমার্চ চলে। অশান্তি ঠেকানোর যুক্তি দেখিয়ে ভোটের পরেও বাহিনী কিছুদিন রেখে দেওয়া হয়। অথচ কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে প্রশ্ন কম থাকে না। এরাজ্যে প্রতিবার দেখা গিয়েছে, ভোট চলাকালীন বহু জায়গায় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বসিয়ে রাখা হয়। কেননা, রাজ্য না চাইলে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সেভাবে ব্যবহারের সুযোগ থাকে না।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন খাস কলকাতায় কাঁকুড়গাছি এলাকায় বিজেপি কর্মী অভিজিৎ সরকারকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল। সেসময়ও অভিযোগ উঠেছিল, রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বসিয়ে রেখেছে। প্রয়োজনের সময় তাদের কাজে লাগানো হয় না। অর্থাৎ বঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী থেকেও কার্যত না থাকার শামিল।
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল সেকারণে সম্ভবত এবার আগাম বলে রেখেছেন, ‘শুধু বসিয়ে রাখার জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনী আনা হচ্ছে না। বাহিনী ব্যবহারের দায়িত্ব নিতে হবে জেলা শাসকদের।’ বাস্তবে সেই তৎপরতা দেখা যাবে কি না, তা সময় বলবে।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের এতকাল রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে রাখা হত। এবারও তার অন্যথা হবে না। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) (SIR)-র কাজে রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষকদের সিংহভাগ এবং হাইস্কুলের শিক্ষকদের বিরাট অংশকে গত চার মাস ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ফলে শিক্ষায়তনে পঠনপাঠন কার্যত বন্ধ আছে।
এরপর নির্বাচনের কারণে জওয়ানদের থাকার জন্য অধিকাংশ স্কুল, কলেজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে পড়ুয়াদের পড়াশোনা আরও শিকেয় উঠবে। ২০২৪-এর লোকসভা এবং ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন- দুটো ক্ষেত্রেই বহু দফা ভোটের কারণে কেন্দ্রীয় বাহিনী দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ছিল। পশ্চিমবঙ্গে যেহেতু ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়মিত ঘটনা, তাই নির্বাচনপর্ব মিটে যাওয়ার পরেও জওয়ানদের রেখে দেওয়া হয়।
জওয়ানদের থাকা যত দীর্ঘায়িত হবে, স্কুল-কলেজে পঠনপাঠন তত লাটে উঠবে। এসআইআর-এর কারণে এবার ইতিমধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সুতরাং নির্বাচন সংক্রান্ত নানা প্রয়োজনে শিক্ষায়তন ব্যবহারের বিষয়টি এখন সরকারের গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অবশ্য দায় চাপিয়েছেন কেন্দ্রের ঘাড়ে। তিনি বলেছেন, ‘শিশুদের ভবিষ্যতের বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত কেন্দ্রের।’
আদতে মানুষের ভোটাধিকার, গণতন্ত্র, নয়া সরকার গঠন ইত্যাদি যেমন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই দেশের ভবিষ্যৎপ্রজন্মের পঠনপাঠনও হেলাফেলার বিষয় নয়।
