বাস চালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট! ট্রাম্পের ঘুম ছোটানো কে এই মাদুরো?

বাস চালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট! ট্রাম্পের ঘুম ছোটানো কে এই মাদুরো?

বৈশিষ্ট্যযুক্ত/FEATURED
Spread the love


সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: একদা ছিলেন বাসচালক। সেখান থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম। তারপর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট পদে উথ্থান। শনিবার এই নিকোলাস মাদুরেই বন্দি করেছে মার্কিন সেনা। অপহরণ করা হয়েছে তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও। তারপরই বিশ্বজুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। কিন্তু কীভাবে প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত হলেন মাদুরো? কেনইবা তাঁর উপর ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প?

শ্রমিক নেতার পুত্র নিকোলাস মাদুরাই ১৯৬২ সালের ২৩ নভেম্বর ভেনেজুয়েলার কারাকাসে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলে পড়াকালীনই তিনি বিদ্যালয়ের ছাত্র সংঘের সদস্য হন। এর মাধ্যমেই তিনি পা রাখেন রাজনীতিতে। তবে পাকাপাকিভাবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৮৬ সালে। আদর্শগত পাঠের জন্য যখন তিনি কিউবায় যান। বেশ কয়েকবছর সেদেশে থাকার পর তিনি ফিরে আসে। তবে কিউবান সরকারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ভেনেজুয়েলায় ফিরে আসার পর, মাদুরো কারাকাস সাবওয়ে সিস্টেমে একজন বাস চালক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি সেখানকার ইউনিয়নের একজন নেতা হয়ে ওঠেন। ৯০-এর দশকে ভেনেজুয়েলার গোয়েন্দা সংস্থাগুলি মাদুরোকে একজন বামপন্থী উগ্রপন্থী হিসাবে চিহ্নিত করেন।

এদিকে ১৯৯২ সালে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হুগো চাভেজ তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে একটি রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। কিন্তু তা ব্যর্থ হন। এরপর তিনি কারাবন্দি হন। অবশেষে ১৯৯৪ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ক্ষমা ‘প্রেসিডেনসিয়াল পার্ডন’ (তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়) পান। তারপর হুগো ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন। হুগোর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মাদুরো তখন বাস চালকের চাকরি ছেড়ে দেন এবং সেই রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেন। হুগোর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন মাদুরো। ১৯৯৯ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন হুগো। তার সরকারের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন মাদুরো। এরপর ২০০৬ সালে তিনি ভেনেজুয়েলার বিদেশমন্ত্রী নিযুক্ত হন। সেই সময় তিনি একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ এবং হুগোর সবচেয়ে কাছের মানুষ বলে পরিচিত ছিলেন।  

২০১৩ সালে হুগোর মৃত্যুর পর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট পদে বসেন মাদুরো। কিন্তু তাঁর শাসনকালে ভেনেজুয়েলা তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে—মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। মাদুরোর শাসন ব্যবস্থা লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দেয়। ৭৭ লক্ষেরও বেশি ভেনেজুয়েলাবাসী সেই সময় দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। নাভিঃশ্বাস ওঠে আমজনতার। এরপর ভেনিজুয়েলার রাজপথে শুরু হয় বিক্ষোভ। আন্দোলন দমাতে কড়া পদক্ষেপ করেন মাদুরো।

অভিযোগ ওঠে, সরকারের বিরোধীতা করলেই তাঁদের জেলে বন্দি করে দিতেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। এমনকী কয়দিদের উপর চরম নির্যাতনেরও অভিযোগ ওঠে। গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন মাদুরো। শুধু সামাজিক বা অর্থনৈতিক সংকট নয়, মাদুরোর শাসনকালে দেশের অন্দরে রাজনৈতিক অস্থিরতাও চরম আকার ধারণ করে। বারবার বিরোধী-কণ্ঠ দমনের অভিযোগ ওঠে মাদুরোর বিরুদ্ধে। ফলে ভেনেজুয়েলা সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ে। চাপানো হয় নিষেধাজ্ঞাও।

২০১৭ সালে প্রথমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে বসেন জোনাল্ড ট্রাম্প। তখন থেকেই তিনি মাদুরোর সঙ্গে বিবাদে জড়ান। মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন ট্রাম্প।পাশাপাশি, ভেনেজুয়েলার উপর আরোপ করেন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও। আমেরিকার অভিযোগ, সর্বশেষ নির্বাচনে বামপন্থী মাদুরো রিগিং করে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। মার্কিন প্রশাসনের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করেই দক্ষিণ আমেরিকার তেল সমৃদ্ধ এই দেশের প্রেসিডেন্টের গদিতে ফের বসেছিলেন মাদুরো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরবারই মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে মাদক চক্র চালানোর অভিযোগ তুলেছেন। সেই সঙ্গে আমেরিকার দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অভিবাসীদের ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে। ট্রাম্পের আরও অভিযোগ, মাদুরো ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র ধ্বংস করছেন।

মূলত আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে মাদুরো সরকারের পতন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল বলে ঠারেঠোরে গত কয়েক মাস ধরেই বোঝাতে চাইছিল আমেরিকা। গত সেপ্টেম্বর থেকে তাই ক্যারিবীয় এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ভেনেজুয়েলার একের পর এক জলযানে হামলা চালাতে শুরু করে আমেরিকা। ওই সব নৌকায় মাদক পাচার করা হত বলে দাবি ওয়াশিংটন দাবি করলেও মাদুরো প্রশাসনের বক্তব্য, বেশির ভাগ হামলাতেই প্রাণ গিয়েছে সাধারণ মৎস্যজীবীদের। এর মধ্যেই ভেনেজুয়েলার তেলবাহী দু’টি ট্যাঙ্কারও বাজেয়াপ্ত করে আমেরিকান নৌবাহিনী। ট্রাম্প প্রশাসনের নজর যে আসলে তাঁর দেশের খনিজ তেলের উপরে, তা আগেও বহু বার স্পষ্ট করেছেন মাদুরো। আমেরিকা এর মধ্যেই ভেনেজুয়েলার দু’টি সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী তকমা দেয়। যার একটির মাথায় ছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট মাদুরো। ওই সংগঠনগুলির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা থেকে সমুদ্রপথে আমেরিকায় মাদক ঢুকছে বলে দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। নিউ ইয়র্কের ফেডেরাল আদালতে মাদুরোর বিচার হবে বলে জানিয়েছে আমেরিকা। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্কের জেলে বন্দি।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *