বাবার দুই চেহারা আবিষ্কারের লোভে উঁকি

বাবার দুই চেহারা আবিষ্কারের লোভে উঁকি

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


পি সি সরকার

রিহার্সাল রুমের পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে প্রতুলচন্দ্রের সচেতনতা ছিল দেখবার মতো। তিনি মনে করতেন, মঞ্চে পারফেকশন আনার জন্য রিহার্সালের কোনও বিকল্প নেই। আমাকে যেমন অনেকে প্রশ্ন করেন, ভালো জাদুকর হতে গেলে কী করতে হবে, তেমনই ওঁকেও এই প্রশ্ন অনেকবারই শুনতে হয়েছে।

তিনি বলতেন, ভালো জাদুকর হতে গেলে তিনটি জিনিস খুব দরকার। এক নম্বর হল প্র্যাকটিস। দুই নম্বর হল প্র্যাকটিস। আর তিন? তিন নম্বরেও ওই প্র্যাকটিস। আসলে ম্যাজিকের শতকরা তিরিশভাগ হল বিজ্ঞান, বাকিটা শিল্প বা দেখাবার কায়দা। অর্থাৎ সাধারণ ম্যাজিশিয়ানকেও তার ম্যাজিক দেখানোর জন্য একভাগ বিজ্ঞানের আর বাকিভাগ অভিনয়ের বা উপস্থাপনার সাহায্য নিয়ে করতে হয়। এই ব্যাপারটা ছোট-বড় মাঝারি সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

এর সঠিকভাবে ব্যবহার এবং প্রয়োগই তাকে সাধারণ থেকে অসাধারণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিজ্ঞানকে যে যত বেশি শিল্পসম্মতভাবে, শৈল্পিক রাংতা দিয়ে মুড়ে পরিবেশন করতে পারে, তার তত সুনাম। সে তত জনপ্রিয়। তার জাদু তত ভুবনমোহিনী। এবং এই ব্যাপারটা আয়ত্ত করার জন্য দরকার প্র্যাকটিস, প্র্যাকটিস আর প্র্যাকটিস। প্র্যাকটিস দেবে আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাস দেবে সাবলীলতা। আত্মবিশ্বাস আনে দর্শকের মুগ্ধতা, সেই মুগ্ধতার ওপরই তৈরি হয় জাদুময় পরিবেশ। তাছাড়া বড় মাপের ম্যাজিক মানেই তো একটা টিম গেম।

এই মানসিকতা থেকেই বাবার রিহার্সাল রুমের দরজা সবার জন্য খোলা ছিল না। বা আরও স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, আমাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকত ওই বন্ধ দরজার ভেতরে। চুপচাপ এক কোণে বসে থাকারও অনুমতি মিলত না।

ওখানে ছেলেমানুষির স্থান নেই। সব কিছুই যেন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের মতোই কড়া, কঠিন, গম্ভীর। প্রবেশ নিষেধ। শুধু কি ওই মানসিকতা? মোটেই না। আসলে বাবা ভয় পেতেন স্টেজের ঝলমলে জগৎ আমাদের মাথা বিগড়ে না দেয়। মঞ্চমায়ার জগতের রাস্তা নাকি ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক।

একবার ঢুকলে শুধু সেদিকে এগুতেই হবে। পিছন ফিরে আসা যায় না। লেখাপড়ার হবে জলাঞ্জলি। সেজন্য ওখানে ঢোকা তো দূরের কথা, উঁকি মারাও নিষেধ। কিন্তু আমি দেখতাম ওই বিহার্সাল। দেড়তলার ছোট ঘরের জানলা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে আমি সবকিছু দেখতাম। পেট কেটে জোড়া লাগাবার খেলায় নিরীহ সহকারীর কাজ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা জেনেছিলাম। ফাঁসিকাঠ থেকে কী করে অদৃশ্য হতে হয় তাও জেনেছিলাম। আরও জেনেছিলাম কোন ম্যাজিকে কোন জায়গাটা বেশি করে নজর রাখতে হয় এবং ঢাকতে হয়।

তখন কেমন করে অভিনয় করতে হয়, কখন হাসাটা জরুরি, কখন নয়। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তখন ম্যাজিক করা তো কল্পনাও করা যায় না। আমি যে একক কোনও অনুষ্ঠান করেছি, তাও নয়। কিন্তু মনে মনে আমি সবকিছুই করতাম। বিভিন্ন সহকারী হিসেবে হ্যাঁ। সেই দেখাটা রিহার্সাল দেখা বা ম্যাজিক দেখার লোভে শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল আমার বাবার দুই চেহারা কেমনভাবে এক হয়ে যায় সেটা আবিষ্কার করতে।

বাড়ির বাবাই যে আমার স্টেজের বাবা সেটা তখন সবে বুঝতে শুরু করেছি। বাড়ির বাবাকেও ভালোবাসতে শুরু করেছি। তিনি আড়ালে কী করেন সেটা দেখতে গিয়েই আমার জাদুশিক্ষার শুরু। কাছাকাছি হতে না পেরে নিজেকে তাঁর পাশাপাশি রয়েছি বলে কল্পনা করতাম।

মাঝে মাঝে আমি যতীনবাবু হতাম, একেকবার হতাম মাধববাবু, কখনও-বা বীরেনবাবু, নন্দীবাবু বা পলান। শুধু তা-ই নয়, দুঃসাহসীর মতো নিজেকে বাবা ভেবে মাঝে মাঝে কল্পনাও করতাম যে ম্যাজিক দেখাচ্ছি। প্রচুর দর্শক ছিল আমার, মঞ্চ তো ছিল বিরাট।

সেই মঞ্চে পর্দা, আলো এবং বাজনা সবই ছিল। প্রতিটি প্রদর্শনীই আমার হাউসফুল যেত। কত হাততালি, মজা হত সেই প্রদর্শনীতে। কিন্তু কেউই সেটা জানতেন না। পুরো জগৎটাই তো আমার মনের ভেতরে। ভয় পেতাম, কারণ আমি যে মনে মনে ম্যাজিক দেখাই সেটা জানতে পারলে বাবা প্রচণ্ড বকাবকি করবেন।

বিকেল হলেই বাবা গাড়ি নিয়ে বড়বাজার, অথবা চাঁদনি চক, নয়তো সরস্বতী প্রেস, তিমির প্রেস, কোথাও-না-কোথাও চলে যেতেন। ম্যাজিকের যন্ত্র তৈরি করতে, তাঁর কল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে, বিজ্ঞানভিত্তিক যন্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনমাফিক কব্জা বা অন্য কিছু সংগ্রহ করা বা আলোচনা করা ছিল তাঁর নিত্যদিনের কাজ। বাবা বেরিয়ে গেলেই আমার রাজত্ব শুরু হত।

পা টিপে টিপে বাবার আপিসঘরে গিয়ে ঢুকতাম। বাড়ির অন্য একটা তালার চাবি দিয়েও যে এ ঘরের তালা খোলা যায় তা আমরা আবিষ্কার করেছিলাম। সেই ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে লক করে দিতাম। বাইরে থেকে বোঝা যেত না যে ভেতরে কেউ আছে। ভেতরে যে কী তুলকালাম কাণ্ড চলছে তা কি কেউ জানে?

আমি ঘরে ঢুকতেই হাততালির ঝড় বয়ে যেত। ঢুকে বলতাম, ‘আশা করি আমি বেশি দেরি করিনি, রাস্তা পরিষ্কার ছিল না তাই আসতে দেরি হল।’

আমার কাল্পনিক জগতের ম্যাজিক শুরু হত। মাঝেমধ্যে যখন দৃশ্যান্তর হত তখন দর্শকরা কেউ থাকতেন না। মনে মনে ভাবতাম, গুপ্তধনের খোঁজে জাদুগুহায় ঢুকেছি। চারদিকে সব মণিমাণিক্য ছড়িয়ে আছে। ওগুলো চোখ দিয়ে দেখতাম কিন্তু স্পর্শ করতাম না। ছুঁলেই বাবা বুঝে যাবেন কেউ ঘরে ঢুকে তাঁর জিনিসে হাত দিয়েছে। এভাবে পড়তাম বাবার লেখা বিভিন্ন ‘নোট’, প্ল্যানিং-এর অনেক কিছু।

কী কী উনি করতে চাইছেন এবং কোনটা সবার আগে করতে হবে। জাদুশিক্ষার্থী হিসেবে সে সব ছিল আমার আসল লেখাপড়ার জিনিস। তাছাড়া বাবার লাইব্রেরির বিভিন্ন ম্যাজিকের বই তো বটেই, টারবেল-এর কোর্স অফ ম্যাজিক পড়ে আত্মস্থ করলাম। কিন্তু মন ভরল না। ওতে শুধু কৌশল শেখানো আছে। উপস্থাপনার কথা শেখানো বিশেষ নেই।

এই সব কৌশল যে কেউই পয়সা খরচ করে ম্যাজিক বেচার দোকান থেকে কিনতে পারে। কিন্তু উপস্থাপনা, প্রদর্শন ভঙ্গি- সেটাই তো আসল। সেটা তো বই পড়ে শেখা যায় না। নইলে এই বই তো হাজার হাজার কপি ছাপা হয়েছে। হাজার হাজার উঁচু জাদুকর তো সৃষ্টি হয়নি। একই খেলা দেখিয়েও মানুষের মন জয় করতে পারে না। পড়লাম স্কার্নের এনসাইক্লোপিডিয়া অফ কার্ড ট্রিক্স, বাইসের এনসাইক্লোপিডিয়া অফ সিল্ক ম্যাজিক ইত্যাদি। কিন্তু মানুষের মন জয় করতে পারে না।

১৯৫৮ সালের কথা। ক্লাস এইটে পড়ি। নিউ এম্পায়ারে ম্যাজিক দেখাবেন বলে বাবা তৈরি হচ্ছেন। সব ঠিকঠাক। মনে আছে অনুষ্ঠানের ঠিক দু’দিন আগে নন্দীবাবু, পলান এবং আরও দু’-চারজন সহকারী বাবাকে এসে চাপ দিলেন মাইনে বাড়াবার জন্য। একটু-আধটু বাড়ানো নয়, ওঁদের দাবি একেবারে দ্বিগুণ।

ওঁদের বক্তব্য, মাইনে যদি বাড়ানো না হয়, ওঁরা এখনই দল ছেড়ে দেবেন। বাবাকে জীবনে কোনওদিন হারতে দেখিনি। সোজা দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, বেরিয়ে যাও। তোমাদের ছাড়াও চলবে। সেদিনের কথা আমি কখনও ভুলব না। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরিয়ে গেছে। অগ্রিম টিকিটও বিক্রি হয়ে গেছে। এই সময়ে চাপ দিলে পি সি সরকার নিশ্চয়ই মাইনে বাড়াতে বাধ্য হবেন। কী চমৎকার চক্রান্ত!

কিন্তু ওঁদের চমকে দিয়ে পি সি সরকার ওঁদের বাদ দিয়ে দিলেন। বললেন, ‘ভেবো না, তোমাদের ছাড়া আমার ম্যাজিক আটকাবে। একটু কষ্ট হবে প্রথম কয়েকটা দিন। কিন্তু আমার শো তোমরা নষ্ট করতে পারবে না।’

ঘটনাটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। সে কথা অন্য আরেক দিন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *