পল্লব বসু
বাংলার মাটি এখন আর দুর্জয় ঘাঁটি নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে দুর্নীতি আর নৈতিক অবক্ষয়ের এক অবাধ চারণভূমি। এখানকার বিচার ব্যবস্থা যেন ব্যস্ত রাস্তার ট্রাফিক জ্যামে আটকে, আর অপরাধীরা পায় ভিআইপি ট্রিটমেন্ট, সাইরেন বাজিয়ে বেরিয়ে যায় আইনের ফাঁক গলে। গত কয়েক বছর ধরে টেলিভিশনের পর্দায় বা খবরের কাগজের পাতায় আমরা যা দেখছি, তা কোনও টানটান ক্রাইম থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। পার্থক্য শুধু একটাই—সিনেমায় শেষে ভিলেনের শাস্তি হয়, সত্যের জয় হয়। আর আমাদের এই পোড়া রাজ্যে? ভিলেনরা জামিন পেয়ে গলায় রজনীগন্ধার মালা পরে বিজয়োল্লাস করেন, যেন জেল থেকে ফেরাটাই এখনকার রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা।
টানা তিন মেয়াদে তৃণমূল সরকারের আমলে দুর্নীতির যে পাহাড়প্রমাণ আবর্জনা জমেছে, তাতে মনে হয় এ বাংলা আর রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-নেতাজির বাংলা নেই; এ এখন ‘দাদা-দিদি আর ভাইপো’র প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ’ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাট থেকে কোটি কোটি টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার সেই দৃশ্য বাংলার মানুষ কোনওদিন ভুলবে না। নোটের বান্ডিল গুনতে গিয়ে মেশিনের দম ফুরিয়ে যাচ্ছিল, ইডি’র অফিসারদের ঘাম ছুটে যাচ্ছিল, অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল—তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দম যেন মাঝপথেই ফুরিয়ে গেল! যে ক্ষিপ্রতা নিয়ে তারা ঝাঁপিয়েছিল, সেই ক্ষিপ্রতা এখন উধাও।
নারদ কাণ্ডে মন্ত্রীদের তোয়ালে মুড়িয়ে টাকা নেওয়ার ফুটেজ তো ছিল ‘ওপেন অ্যান্ড শাট’ কেস। ফরেন্সিক ল্যাবে সব প্রমাণিত, অথচ সেই ফাইল আজও হিমঘরে ধুলো খাচ্ছে। সাধারণ মানুষের চোখে যাঁরা কবেই দোষী সাব্যস্ত, তাঁরা দিব্যি রাজনীতির ময়দান দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রশ্ন জাগে, এত অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেন এঁদের শাস্তি হচ্ছে না? সিবিআই বা ইডি’র মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বোকামি হবে। তারা যথেষ্ট দক্ষ, কিন্তু সমস্যা দক্ষতার নয়, সমস্যা ‘ইচ্ছাশক্তি’র—বা আরও স্পষ্ট করে বললে, সমস্যা তাদের রাজনৈতিক প্রভুদের রিমোট কন্ট্রোলের।
আজকের রাজনীতির অলিন্দে কান পাতলে শোনা যায়, দিল্লির কেন্দ্র সরকার এই দুর্নীতিবাজদের আদৌ জেলে ভরতে আগ্রহী নন। বরং তারা এঁদের ব্যবহার করছেন ‘বারগেনিং চিপ’ বা দাবার বোড়ে হিসেবে। রাজনীতির এই সমীকরণে বিজেপি খুব ভালো করেই জানে, মমতা বা অভিষেককে চাপে রাখলে লাভ তাদেরই। মমতার বিকল্প হিসেবে যদি অন্য কোনও রাজনৈতিক শক্তি আবার মাথাচাড়া দেয়, তবে তা বিজেপির কাছে বেশি মাথাব্যথার কারণ হবে। তার চেয়ে বরং দুর্নীতিগ্রস্ত, দুর্বল তৃণমূল ক্ষমতায় থাকুক, যাদের ঘাড়ে দুর্নীতির খাঁড়া ঝুলিয়ে রেখে যখন খুশি ব্ল্যাকমেল করা যাবে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখলে মমতা-অভিষেক যে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে বিরোধীদের চেয়ে বিজেপির সঙ্গেই সমঝোতা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন—এই অঙ্কটা চাণক্য শাহের অজানা নয়।
এই অশুভ আঁতাত-এর ফলেই আজ পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়রা জামিনে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ান। শুধু তাই নয়, সন্দেশখালির ত্রাস শেখ শাহজাহান বা শিক্ষা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত মনোজিৎ মিশ্র, কুন্তল ঘোষদের মতো নেতারা এতদিন কী দাপটটাই না দেখিয়েছেন! অথচ এঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাহাড় প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, মামলার গতি শ্লথ। র্যাশন দুর্নীতিতে গরিবের চাল চুরির অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে, তাঁরাই আবার বড় বড় ভাষণ দেন। আর এই সুযোগে চলছে নির্লজ্জ দলবদলের খেলা। তৃণমূলের তথাকথিত ‘ওয়াশিং মেশিন’-এ ঢুকে বিজেপিতে নাম লেখালেই সাত খুন মাফ! শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে অর্জুন সিং—তালিকায় নামের শেষ নেই। যারা গতকাল চোর ছিল, বিজেপির পতাকাতলে আজ তারাই সাধু। আর যাঁরা দল বদলাচ্ছেন না, তাঁরাও জানেন—‘দিল্লি আছে পাশে, ভয় কি আর আসে?’
সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য হল, একদিকে যখন যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা ধর্মতলায় গান্ধিমূর্তির পাদদেশে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ১০০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে ধর্নায় বসে আছেন, তখন অন্যদিকে নেতাদের বান্ধবীদের ফ্ল্যাট থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থীদের চোখের জল আর নেতাদের বিলাসবহুল জীবন—এই বৈপরীত্যই আজকের বাংলার ট্র্যাজেডি। যে বাংলা একসময় মাস্টারদা সূর্য সেন, নেতাজি সুভাষ, বাঘা যতীনের মতো অগ্নিশলাকা জন্মে গর্বিত হত, সেই বাংলা আজ পরিচিতি পাচ্ছে ‘চোর’ আর ‘চিটিংবাজ’দের আস্তানা হিসেবে।
বাস্তব এটাই যে, সেই বিখ্যাত বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণি আজ রাজনীতি থেকে বিলুপ্তপ্রায়। তার জায়গা নিয়েছে উদ্ধত, দুর্নীতিপরায়ণ এবং নীতিহীন এক নতুন শ্রেণি। যারা মুখে বিদ্যাসাগর-বিবেকানন্দের নাম জপে, কিন্তু কাজে ধূলিকণা পরিমাণ আদর্শও মানে না। পার্থ বা শোভন চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেতারা প্রকাশ্যেই তাঁদের ‘বান্ধবী’দের নিয়ে যে তামাশা দেখিয়েছেন, তা কয়েক দশক আগেও মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে অকল্পনীয় ছিল। ক্ষমতা আর টাকার গরমে এঁরা ভুলে গিয়েছেন, জনসেবা আর বিলাসিতা এক জিনিস নয়। সাদা পাঞ্জাবি আর হাওয়াই চটি পরা সেই অনাড়ম্বর রাজনীতিকরা আজ ইতিহাসের জাদুঘরে, আজকের নেতারা এসইউভি ছাড়া মাটিতে পা রাখেন না।
অবশ্য আঙুল তুললেই শাসকদল পালটা সিপিএমের তন্ময় ভট্টাচার্য বা কংগ্রেসের নেতাদের পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে শুরু করে। কিন্তু মনে রাখা দরকার—‘Two wrongs don’t make a proper.’। অন্যের গায়ে কাদা ছিটিয়ে নিজেদের নোংরা জামা পরিষ্কার করা যায় না। বিরোধীদের স্খলন নিশ্চয়ই নিন্দনীয়, কিন্তু যাঁরা রাজ্যের শাসনভার সামলাচ্ছেন, তাঁদের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। দুর্নীতির টাকা উদ্ধার হয়, কিন্তু তা কোষাগারে ফেরে না। নেতারা জেলে যান, আবার জামিনে বেরিয়ে এসে হিরোর মতো ঘোরেন। আর আমরা, আমজনতা, বোকার মতো সেই তামাশা দেখি।
(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
