বসন্তসেনা : অনুভব, ভাষা ও প্রতিরোধ

বসন্তসেনা : অনুভব, ভাষা ও প্রতিরোধ

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

ভাষা আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জগতের শুধু একটি মাধ্যম নয়; তা ক্ষমতারও একটি কাঠামো। আধুনিক রাষ্ট্র এই সত্য খুব ভালোভাবেই বোঝে। তাই ভাষা আজ কেবল শব্দ বা বাক্যের সীমায় আটকে নেই। ভাষা মানে ডেটা, কোড, শ্রেণিবিন্যাসও। কে কী বলছে, কখন বলছে, কোথায় বলছে- এসবই এক ধরনের নজরদারির কাঠামোর মধ্যে পড়ে। আমরা যে বাস্তবকে দেখি, বুঝি বা প্রত্যাখ্যান করি, সেই প্রক্রিয়াও ভাষার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। ফলে ভাষা নিরপেক্ষ নয়; ভাষাই ঠিক করে কোন অনুভব দৃশ্যমান হবে আর কোনটি আড়ালে থেকে যাবে। এই কারণেই ভাষার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুধু দর্শনের বিষয় নয়, তা রাজনীতিরও কেন্দ্রে পৌঁছে যায়।

ইতিহাসে এই প্রশ্নের দুই ভিন্ন পথ দেখা যায়। একদিকে পাশ্চাত্য লোগোসেন্ট্রিক ধারা- যেখানে চিহ্ন, প্রতীক ও ধারণা বাস্তবের প্রতিনিধিত্ব করে এবং তার উপর প্রভাব বিস্তার করে। অন্যদিকে প্রাচ্য ভার্বসেন্ট্রিক ধারা- যেখানে ক্রিয়া, অনুশীলন ও জীবনের প্রবাহ থেকেই অর্থের জন্ম হয়। এই বিভাজন নিছক তাত্ত্বিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্র, বাজার ও ক্ষমতার গঠন। লোগোসেন্ট্রিক ধারায় ‘অ্যাপিয়ারেন্স’ ও ‘রিয়েলিটি’র মধ্যে একটি নিরাপদ দূরত্ব রাখা হয়। চিহ্ন সেখানে প্রতিনিধি মাত্র- সে বাস্তবকে প্রশ্ন করে না। ফলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হয়। তারিখ, নাম, প্রতীক বা দিবস- সবই এই কাঠামোয় সহজে ব্যবস্থাপিত।

এই ব্যবস্থার রাজনৈতিক দিকও স্পষ্ট। যখন অনুভবকে প্রতীক বা নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ করা হয়, তখন তাকে গণনাযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য করা যায়। যেমন একটি নির্দিষ্ট তারিখকে প্রেমের প্রতিনিধি বানানো হলে অনুভবটি ক্যালেন্ডারের একটি ঘরে বন্দি হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় নানা প্রতীক, উৎসব বা বাণিজ্যিক অনুষঙ্গ। তখন প্রেম আর বিস্তৃত অভিজ্ঞতা নয়; তা হয়ে ওঠে একটি নিয়ন্ত্রিত সামাজিক আচরণ। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও বাজার উভয়ের পক্ষেই মানুষের অনুভবকে ট্র্যাক করা বা শ্রেণিবদ্ধ করা সহজ হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতির বিপরীতে প্রাচ্য ভাবনায় ভাষা জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেয় না; ভাষা নিজেই জীবনের সঙ্গে মিশে থাকে। এখানে ক্রিয়া কেবল বাক্যের অংশ নয়, ইতিহাসেরও চালিকাশক্তি। তাই অনুভবকে আলাদা করে প্রতীকে বন্দি করার প্রয়োজন পড়ে না। প্রেম কোনও নির্দিষ্ট দিন বা অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়; সে ঋতুর মতোই আসে ও ছড়িয়ে পড়ে। বসন্ত যেমন ধীরে ধীরে আসে, প্রকৃতি ও মানুষের ভেতরে নতুন সঞ্চার ঘটায়, তেমনি অনুভবও জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহে প্রকাশ পায়। এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারই তাকে সহজে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখে।

উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে তাই প্রেম ও প্রকৃতি প্রায়ই একসঙ্গে ধরা পড়ে। বর্ষার মেঘ, ঋতুর পরিবর্তন বা প্রকৃতির সঞ্চার মানুষের অনুভবের সঙ্গে মিলেমিশে যায়। এখানে জীবনকে আলাদা অংশে ভেঙে দেখা হয় না; বরং সামগ্রিক অভিজ্ঞতার মধ্যেই তার অর্থ তৈরি হয়। এই সামগ্রিক জীবনবোধ ভাঙনভিত্তিক রাজনীতির বিপরীতে এক ধরনের নীরব প্রতিরোধের ইঙ্গিত দেয়। বসন্ত তাই কেবল রোমান্টিক উপমা নয়; তা এমন এক জীবনবোধের প্রতীক, যা জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহকে গুরুত্ব দেয়। কোনও নির্দিষ্ট দিবস বা প্রতীকের বাইরে থেকেও এই অনুভব মানুষের অভিজ্ঞতায় বারবার ফিরে আসে- নিঃশব্দে, বিস্তৃতভাবে এবং নিজস্ব শক্তিতে।

(লেখক ঔপন্যাসিক ও গল্পকার)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *