দেবরাজ রায় চৌধুরী
আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতার মাপকাঠি আর শুধু সেনাবাহিনী, যুদ্ধজাহাজ বা তেলের ভাণ্ডার নয়। ক্রমশ সেই ক্ষমতার কেন্দ্র সরে আসছে এক অতি ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বস্তুতে- সিলিকন চিপ। পাতলা আর ছোট্ট, মোবাইলের সিম কার্ডের আকারে, কিন্তু তার ভেতরেই গেঁথে দেওয়া আছে কয়েক লক্ষ পরস্পর সংযুক্ত বৈদ্যুতিক সার্কিটের অণুবীক্ষনিক অংশ যেমন ট্রানজিস্টার, রেসিস্টর, ক্যাপাসিটর ইত্যাদি। মূল উপাদান সিলিকন যা সামান্য বালির মধ্যেও যথেষ্ট পরিমাণে আছে। আমাদের স্মার্টফোন, গাড়ি, চিকিৎসা সংক্রান্ত যন্ত্র সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, উপগ্রহ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মূলে রয়েছে এই সিলিকন চিপ। ভারতে ডিজিটাল লেনদেন থেকে শুরু করে মহাকাশ অভিযান কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি- সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে সেমিকনডাক্টর যার মূলে সিলিকন চিপ। ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে চিপ প্রযুক্তি আজ বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন কেরামতি দেখানোর ময়দান।
সিলিকন বর্ম এবং তাইওয়ানের কৌশলগত গুরুত্ব
তাইওয়ান আয়তনে ছোট হলেও আজ তার গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকনডাক্টর চিপের উৎপাদন হয় এখানেই। এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘সিলিকন বর্ম’ বা ‘সিলিকন শিল্ড’ ধারণাটি। এর অর্থ তাইওয়ানের চিপ উৎপাদন শিল্প যদি বিপর্যস্ত হয়, তবে গাড়ি শিল্প থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন উৎপাদন পর্যন্ত গোটা বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র ধাক্কা খাবে। এই কারণেই তাইওয়ানের অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত গুরুত্ব তাকে একপ্রকার অদৃশ্য সুরক্ষা বলয় প্রদান করে, কারণ তাইওয়ানের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষের মূল্য বিশ্বব্যাপী সবাইকে দিতে হবে- ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়।
চিপ ক্ষমতার জন্য কি চিন তাইওয়ানের দিকে পা বাড়িয়ে?
চিন দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে এবং পুনর্সংযুক্তি একপ্রকার অনিবার্য বলে জানিয়ে দিয়েছে। যদিও রাজনৈতিক ঐক্যই চিনের সরকারি ব্যাখ্যা, বাস্তবে চিপ প্রযুক্তি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চিন এখনও উন্নত প্রযুক্তির চিপের জন্য বহুলাংশে আমদানির উপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে। তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ পেলে এই নির্ভরতা অনেকটাই কমে যেতে পারে। তবে চিনের দিক থেকে সরাসরি সামরিক আক্রমণের অর্থ হবে আমেরিকার নেতৃত্বে আরোপিত বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং বড় ধরনের সংঘর্ষের সম্ভাবনা। ফলে তাইওয়ানের চিপ প্রযুক্তি শিল্প একদিকে যেমন তাকে রক্ষা করে, অন্যদিকে তেমনই তাকে বিশ্বের শক্তিধর দেশের সামনে চরম ঝুঁকির মুখেও ঠেলে দেয়।
আমেরিকা বনাম চিন : বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে চিপ যুদ্ধ
আমেরিকা ও চিনের দ্বন্দ্ব আর শুধু বাণিজ্য কর বা বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন এক পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত সংঘাত। গত কয়েক দশকে চিন পরিকল্পিত সরকারি বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে চিপের নকশা ও উৎপাদনে দ্রুত অগ্রগতি করেছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে আমেরিকা উন্নত প্রযুক্তির চিপ এবং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির রপ্তানির উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। লক্ষ্য একটাই- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অতিগণনা এবং সামরিক প্রযুক্তিতে চিনের অগ্রগতি থামানো। এটি নিছক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক কৌশলগত যুদ্ধ।
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই ‘প্রযুক্তিগত ঠান্ডা যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। বিংশ শতাব্দীর ঠান্ডা যুদ্ধ যেখানে আদর্শ (ধনতন্ত্র বনাম সমাজতন্ত্র) এবং পারমাণবিক অস্ত্র ঘিরে ছিল, সেখানে এই নতুন সংঘাত মূলত তথ্য সংগ্রহ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেই তথ্যের দ্রুত বিশ্লেষণ এবং গণনার ক্ষমতাকেন্দ্রিক। দেশগুলিকে এখন বেছে নিতে হচ্ছে- কোন প্রযুক্তির উপর ভরসা করবে, কোন মাপকাঠিই বা গ্রহণ করবে এবং কোন সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর নির্ভর করবে বিশেষত অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে। ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে এটি এক জটিল সমীকরণ, যেখানে বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
একটি চিপের বিশ্বভ্রমণ
একটি সিলিকন চিপ সাধারণত এক দেশে তৈরি হয় না। কাঁচামাল আসতে পারে ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকা থেকে, পরিকল্পনা ও নকশা সংক্রান্ত সফটওয়্যার আসতে পারে চিন, আমেরিকা বা জাপান থেকে, আবার উৎপাদন হতে পারে তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কোনও দেশে আবার হয়তো তৈরি চিপ বাজারজাত করা হতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এই দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল দেখায় বিশ্বের দেশগুলো একবিংশ শতাব্দীতে এসে কতটা পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা অতিক্রম করার লক্ষ্যেই যাবতীয় সংঘাতের সূত্রপাত। ভারতের মতো দেশ, যেখানে চিপ আমদানির উপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে যুদ্ধ বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উৎপাদনে বিস্তর প্রভাব ফেলতে পারে।
সরবরাহ শৃঙ্খলের শিক্ষা ও ভারতের সুযোগ
কোভিড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে অতিরিক্ত বৈশ্বিক নির্ভরতার ঝুঁকি। চিপের জোগানে ঘাটতির কারণে গাড়ি উৎপাদন ধাক্কা খেয়েছে, ইলেক্ট্রনিক পণ্যের দাম বেড়েছে, এবং শিল্পক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার অনেক কমে গিয়েছে। ভারতও এর প্রভাব অনুভব করেছে। আজ ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র আওতায় দেশীয় সেমিকনডাক্টর বাস্তুতন্ত্র গড়ার চেষ্টা চলছে। যদিও এটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, তবুও বর্তমান চিপ সংঘাত ভারতের সামনে এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে- একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে ওঠার।
সিলিকন রাজনীতি : ভারতের সামনে কঠিন প্রশ্ন ও সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত
সিলিকন চিপ ঘিরে দুনিয়ার শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে সংঘাত আমাদের এক কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। একবিংশ শতকে যুদ্ধ আর শুধু সীমান্তে হয় না- তা ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলকারখানায়, গবেষণাগার ও উন্নয়নকেন্দ্রে তাছাড়া তথ্যকেন্দ্রে। তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ, মার্কিন-চিন বৈরিতা এবং বিশ্বব্যাপী ভঙ্গুর সরবরাহ শৃঙ্খল এগুলো এই মুহূর্তে কোনও দূরবর্তী কূটনৈতিক গল্প নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার উপর।
বিশ্ব যখন ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি ব্লকে বিভক্ত হচ্ছে, তখন ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। কোনও একটি শিবিরে অন্ধভাবে ঢুকে পড়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনই দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তহীনতাও ক্ষতিকর। দিল্লি যদি সত্যিই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষমতার কেন্দ্র হতে চায়, তবে তাকে শুধু বাজার নয়, প্রযুক্তির উৎপাদক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সেমিকনডাক্টর চিপের ক্ষেত্রে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের আত্মনির্ভরতা কোনও বিলাসিতা নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
আজ সিলিকন চিপ প্রমাণ করে দিয়েছে- আকারে ক্ষুদ্র হলেও তার ক্ষমতা সীমাহীন। যে দেশ চিপ নিয়ন্ত্রণ করবে, সে দেশ ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করবে- অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি পরিবহণ এবং কূটনীতি সব ক্ষেত্রেই। সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাবলি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার আর সুযোগ নেই। প্রশ্ন শুধু একটাই : সিলিকন চিপ যখন বিশ্ব-শক্তির নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠেছে, তখন ভারত কি কেবল অন্যের তৈরি প্রযুক্তির উপভোক্তা হয়েই থাকবে, নাকি এই বিশ্ব-সরবরাহ শৃঙ্খলের এক অপরিহার্য ‘কৌশলগত স্তম্ভ’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে? অবশ্যই ভারত এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মাঝে আগামীদিনে শুধু বাজার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে, সেই পরিকাঠামো এবং মানবসম্পদ ভারতের আছে। তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কেবল রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, প্রয়োজন এক নিবিড় ও সুসংহত জাতীয় প্রস্তুতি।
(লেখক মালদা পলিটেকনিকের অধ্যাপক)
