বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ভারতে আন্তর্জাতিক শিশু দিবস পালিত হল ২০ নভেম্বর। অবশ্য ১৪ নভেম্বর পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর জন্মদিনে এদেশে শিশু দিবস পালিত হয়। যে দিনটিকেই পালন করা হোক না কেন, বর্তমান ভারতে অধিকাংশ শিশু ভালো নেই। শুধু অতিরিক্ত পড়াশোনা নয়, আরও অনেক বিষয়ে বাকিদের থেকে এগিয়ে থাকার চাপ তাদের ওপর।
সমাজে এমনভাবে শিশুদের গড়েপিঠে নিচ্ছে যাতে তারা যেন কোনও ভুল করতেই পারে না। ভুল হলে শিশুটিকে বকাবকি থেকে রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। বরং শাসনের নামে অন্যদের সামনে এমনভাবে অপমান করা হচ্ছে যাতে শিশুটি মানসিক অবসাদের শিকার হয়। অনেক সময় চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। শিশু-কিশোরদের এই বিপজ্জনক মানসিকতা ক্রমশ শাখাপ্রশাখা বিস্তার করছে।
দিল্লির নামজাদা একটি স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র শৌর্য পাতিল কিংবা জয়পুরের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীটির ঘটনায় তা স্পষ্ট। এতে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি। শৌর্যের ‘অপরাধ’ ছিল, স্কুলের অনুষ্ঠানের মহড়ায় সে ঠিকমতো নাচতে পারেনি। শুধুমাত্র এই কারণে শিক্ষক এমনভাবে তাকে তার সহপাঠীদের সামনে বকাবকি করেন যে, অপমানে কাঁদতে শুরু করে সে।
কান্না থামানোর বদলে তিরস্কার করে শৌর্যকে শিক্ষক জানিয়ে দেন যে, যত ইচ্ছে কাঁদলেও তাঁর কিছু আসে যায় না। শেষমেশ মেট্রো লাইনে ঝাঁপ দিয়ে যাবতীয় অপমানের জবাব দিয়েছে শৌর্য। এই ঘটনায় ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। স্কুলের চারজন শিক্ষককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। কিন্তু সন্তানহারা বাবা-মায়ের কোলে ছেলের ফিরে আসার আর সম্ভাবনা নেই।
জয়পুরের ৯ বছরের ছাত্রীটি অভিজাত স্কুলের বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার পর তাকে গত ১৮ মাস লাগাতার নানাভাবে উত্ত্যক্ত, হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে সহপাঠীদের বিরুদ্ধে। স্কুলের শিক্ষকদের সমস্যাটি বারবার জানালেও তাঁরা গুরুত্ব দেননি বলেও অভিযোগ। সিবিএসই-র তদন্ত রিপোর্টে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
আবার মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার একটি বেসরকারি স্কুলে দুই আঙুলের ফাঁকে পেন চেপে ধরে শাস্তি দেওয়া হয়েছে অভিযোগে একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীকে অপমানে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হতে হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রেও অভিযোগের আঙুল শিক্ষকের বিরুদ্ধে। কেন বারবার এমন হচ্ছে, তা খুঁজে বের করার দায় সমাজেরও।
সরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষার শোচনীয় হালের কারণে বাবা-মায়েরা বেশি টাকাপয়সা খরচ করে ছেলেমেয়েদের নামীদামি বেসরকারি স্কুলে পাঠান। সেই সমস্ত স্কুলে যে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও তার বিকাশের দিকে ঠিকমতো নজর দেওয়া হয় না, সেটা এই আত্মহত্যার ঘটনাগুলি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
সমস্ত শিশুই পড়াশোনা, খেলাধুলো, ছবি আঁকা, নাচগান ইত্যাদি সব কাজে নিখুঁত হবে- এমন প্রত্যাশা করা উচিত নয়। প্রত্যেক শিশুর নিজস্ব কিছু গুণ থাকে। কার কী প্রতিভা রয়েছে তা খুঁজে বের করা শিক্ষকদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। যদিও এর কোন ব্যবস্থা ভারতে নেই। থাকলেও সবার পক্ষে সেই সুযোগ গ্রহণ নয়। এদেশের স্কুল শিক্ষায় হাজারো ত্রুটি। অতীতেও ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এখন এতটাই ভয়াবহ যে স্কুল আর নিরাপদ থাকছে না ছেলেমেয়েদের জন্য।
সবটাই সবক্ষেত্রে স্কুলের দোষ নয়। অনেক ছেলেমেয়ের পারিবারিক সমস্যাও থাকে। সমস্যা সমাধানের জন্য অভিভাবকদের সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষের নিয়মিত বৈঠক করা দরকার। শিশুকে শারীরিক-মানসিকভাবে সুস্থ রাখার দায়িত্ব যতটা বাবা-মা সহ পরিবারের, ততটাই স্কুলের। প্রতিটি শিশুর দিকে তাই স্কুলগুলির যথেষ্ট নজর দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে নিয়মিত মনোবিদের কাছে কাউন্সেলিংয়েরও ব্যবস্থা করা দরকার।
শিশুদের মনের জানলাগুলি ঠিকমতো খোলা না হলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে বাধ্য।
