বইয়ের অবমাননার প্রতিবাদে পথে নামা, শিক্ষার অধিকার ও বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।
সেবন্তী ঘোষ
কালের পরিবর্তনে যে কোনও সমাজবদল অবশ্যম্ভাবী। আমরা যাঁরা মানুষের জীবনসীমা অনুযায়ী অনেকটা সময় পৃথিবীতে কাটিয়ে ফেললাম, তাঁরা এখনও নব নব বিস্ময়ে আন্দোলিত হচ্ছি। বইয়ের শহর কলকাতায় পুজোর সময় বিশেষ রাজনৈতিক মতাবলম্বী নবযুবকেরা বুকস্টল থেকে বই নিয়ে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে, মাড়িয়ে দিচ্ছে। শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন এই তরুণদের যাঁরা নেতৃস্থানীয়, তাঁরা কিন্তু বইয়ের অমর্যাদা করেননি। তাঁদের দলের উচ্চশিক্ষিত অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বলেছেন, বছরে একটি পুজোই করেন তিনি, সেটি সরস্বতীপুজো। বইয়ের স্টলে ভাঙচুরের নিন্দাও করেছেন তিনি। কালাপাহাড়ের মতো ধ্বংসে মেতেছে ওই তরুণরা। এত শিক্ষিত মানুষ যে দলে আছেন, তাঁদের এদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই কেন, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
নাগেরবাজারে এক বয়স্ক মানুষ এক উন্মত্ত তরুণকে বলছেন, বইগুলো একটু দেখে নিতে। লেনিন, মার্কস দূরের কথা, এরা শরৎচন্দ্রের বইও ছুড়ে ফেলেছে। তথাকথিত অশিক্ষাকে গর্বের বিষয় মনে করা এক ধরনের মূর্খামি। আমরা শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের বলি, আর যা-ই করো পরীক্ষার খাতায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামের বানান ভুল লিখো না। বাঙালি পরীক্ষক তা সহ্য করবেন না। লিখিত বা ছাপার অক্ষরের প্রতি এই শ্রদ্ধার কথা অমিতাভ বচ্চনের বিষয়ে একবার পড়েছিলাম। প্রখ্যাত কবি হরিবংশ রাই বচ্চনের ছেলে, সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিবেশে বড় হওয়া অমিতাভের ছাপা অক্ষরের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল। মন দিয়ে চিত্রনাট্য পড়তেন এবং সেটি মেনে চলতেন।
বই নিয়ে হাঁটা আসলে সময়ের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে এবং নিজের সঙ্গে এক নিরন্তর পথ চলা। বই পড়ার অভ্যাসে নানা পরিবর্তন এসেছে। তবে বই প্রকাশের সংখ্যা বাড়লেই পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে, এমনটা বলা যায় না। মুঠোফোন, ই-বুক, অডিওবুক ও সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তার মধ্যেও মুদ্রিত বইয়ের আকর্ষণ অমলিন। বইমেলা, সাহিত্য উৎসব, পাঠচক্র ও গ্রন্থাগারকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে পাঠকের নতুন জগৎ। সাম্প্রতিক বাংলা প্রকাশনাতেও বিষয়বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, স্মৃতিকথা, ভ্রমণসাহিত্য ও অনুবাদ সাহিত্য, সব ক্ষেত্রেই পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। তরুণ ও প্রবীণ দুই প্রজন্মের লেখাই পাঠকের আগ্রহ তৈরি করছে। বই কেবল অবসর যাপনের উপকরণ নয়। তা আমাদের চিন্তার পরিধি বাড়ায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং অজানা পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ রাজনীতির অবক্ষয়, চুরি-জোচ্চুরি দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। তাদের কাছে নতুন কোনও স্বপ্ন-কল্পনা নেই, কিন্তু বইয়ের প্রতি দীর্ঘকালীন শ্রদ্ধা ও ভক্তি আছে। এই ভক্তিভাব ও বিশ্বাস যুক্তির অন্য দিকে থাকে। যেভাবে ঈশ্বরবিশ্বাসীকে আপনি যুক্তি দিয়ে ভেঙে দিতে পারেন না, তেমনই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, ভক্তি, শ্রদ্ধায় এই অবমাননা তারা মনে মনে সহ্য করেনি। বই নিয়ে হাঁটার আয়োজনে নিজে শামিল হতে পারলাম না। দেখলাম, কেউ বর্ণপরিচয় হাতে তুলে হাঁটছে, কেউ মহাভারত, রামায়ণ, কোরান, বাইবেল বা পঞ্চতন্ত্র নিয়ে। সুকুমার রায় থেকে অমর মিত্র, জয় গোস্বামী, যে যার প্রিয় বই নিয়ে হাঁটায় শামিল হয়েছে। এখানে কে কী রাজনীতি করে, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। অবশ্যই যাঁরা শাসকদলের ঘনিষ্ঠ, তাঁরা পথে নামতে পারেননি। আবার এমনও অনেকে আছেন, যাঁরা এই শাসকদলটিকে পছন্দ করেন, তাঁরাও এই একটি বিষয়ে বিরক্ত হয়েছেন।
বাঙালির বইয়ের জন্য পথে নামা দেখে অন্যেরা অবাক হলেও আমরা অবাক হইনি। বইমেলার সময় দেখি, নিম্নবিত্ত বাঙালি মা-বাবা একটি হলেও ছেলেমেয়েকে বই কিনে দিচ্ছেন। অভয়া হত্যাকাণ্ডের জন্য আমরা অনেকেই, যাঁরা কোনও দিন কোনও কারণে রাস্তায় নামিনি, তাঁরাও নেমেছিলাম। সেই ঘটনার প্রার্থিত বিচার আমরা পাইনি। তার বিচার পাওয়া এখন আর শুধু তার বাবা-মায়ের চাহিদার ওপর নির্ভর করে না, কারণ সে এখন যে কোনও সচেতন নাগরিকের কন্যা। ঠিক সেভাবেই বইয়ের জন্য বহু মানুষ পথে নামলেন, যাঁরা আগে কখনও পথে নামেননি। এই অন্যায়ের বিচার তাঁরা চান।
বইয়ের এমন অবমাননা করা তরুণরাও তো ছোটবেলায় স্কুলে গিয়েছে। তাদের বাড়িতেও শেখানো হয়েছে, বইয়ে পা দিলে মাথায় হাত ঠেকাতে হয়। তারা নিজেদের খাঁটি ভক্ত মনে করে। এই ভক্তির মধ্যে সরস্বতীপুজো আছে, দোয়াতে খাগের কলম ডোবানো আছে। তা দিয়ে বেলপাতার ওপর সরস্বতীর নাম কেউ কেউ লিখেছে। চাঁদা তুলে পাড়ায় ছোট্ট করে পুজো করার শৈশব আছে। চাঁদা তুলতে গেলে অভিভাবকরা সরস্বতী বানান জিজ্ঞেস করছেন, এমন অভিজ্ঞতাও তাদের আছে। কোন মদমত্ততায় তারা শরৎচন্দ্রের বইকে অচ্ছুত মনে করে মাটিতে ছুড়ে ফেলে, জানতে ইচ্ছে করে।
বেছে বেছে হিটলারের দলবল বই ধ্বংস করেছিল। ১৯৩৩ সালে নাৎসি-সমর্থক ছাত্ররা জার্মানির নানা শহরে বই পুড়িয়েছিল। নিজে চিত্রশিল্পী হয়েও হিটলার অন্যের শিল্পকর্ম ধ্বংসের উদ্যোগে সমর্থন দিয়েছিলেন। শোনা যায়, বিশেষ কিছু ছবি সেই ধ্বংসতালিকা থেকে তাঁর ইচ্ছাতেই বাদ পড়েছিল। ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিই। হিটলারের পরিণতি কী হয়েছিল, আমরা জানি।
মানুষের ইতিহাস অরণ্য, গুহাজীবন থেকে নগরসভ্যতায় প্রবেশের গল্প। হাজার হাজার বছর প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়ে নিজের প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখতে হয়েছে। খবরে পড়ি, আধুনিক মানুষের মাতৃসূত্রের এক সাধারণ পূর্বজ নারী এবং পিতৃসূত্রের এক সাধারণ পূর্বজ পুরুষের কথা বলা হয়। তাঁরা একই সময়ে বেঁচে ছিলেন না; তাঁদের সমসাময়িক আরও বহু নারী-পুরুষ ছিলেন। তাঁদের নির্দিষ্ট মাতৃ ও পিতৃসূত্রের বংশধারা আজকের মানুষের মধ্যে টিকে আছে। এই ভাবলে আমরা পরস্পরের আত্মীয়। এই ইতিহাস মাথায় থাকলে পশুজীবন থেকে মানবজীবন লাভ করার ইতিবাচক দিকটি মনে রাখতে পারি।
বিবর্তন ও পরিশ্রমে পাওয়া আশ্চর্য মানবজীবনে বই ও তার জ্ঞান আমাদের বিশিষ্ট করেছে। বই পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ বা পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়ার উপায়মাত্র নয়। তা আমাদের জীবন গঠন করেছে। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এই জ্ঞান প্রবাহিত হয়েছে। বলতে পারেন, একসময় তা শ্রুতির মাধ্যমেই ছিল। ছিল তো বটেই, কিন্তু ব্যাস ও গণেশদেবকে এই জ্ঞান ও কাহিনী লিপিবদ্ধ করার জন্যই আবির্ভূত হতে হল। নালন্দার ওপর আক্রমণের সময় বহু ভিক্ষু পালিয়ে যান। কেউ গোপন গুহায়, কেউ তিব্বতে পুঁথি নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে কথিত। তিব্বতি পণ্ডিতেরা যতটা সম্ভব পুঁথি সঙ্গে নিয়ে তিব্বতে ফিরে গিয়েছিলেন। বিধ্বংসী আক্রমণকারীর হাত থেকে দেবতাকে রক্ষার জন্য বিশ্বাসীরা মূর্তি নিয়ে যেমন দূরে কোথাও সরে গিয়েছেন, তেমনই পুঁথিও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন। বই তাঁরা ফেলে যাননি। এই বইয়ের সঙ্গে মানবসভ্যতার ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
বইয়ের জন্য হাঁটছেন বিভিন্ন বয়সের মানুষ, মেয়েরাও। যাঁদের কাছ থেকে মৌখিক জ্ঞান দূরে না থাকলেও লিখিত অক্ষরের পাঠের অধিকার ছিল না। ধর্মের দোহাই দিয়ে, বিধবা হওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে জ্ঞান লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘদিন দলিতদের কাছে এই লিখিত জ্ঞানভাণ্ডার উন্মোচন করেনি উচ্চবর্ণ। এখনও একটি দরিদ্র শিশুর জীবন বদলে নেওয়ার উপায় এই বই।
বই নিয়ে তাই মানুষ হাঁটবেই। এ তার শিক্ষার অধিকার। এ তার মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। হাজার বছরের অর্জিত বিদ্যা-অভিজ্ঞতা কিছুতেই সে লুণ্ঠিত হতে দেবে না। বিভাজনের রাজনীতি করেও এ সম্ভব নয়। নির্বাচিত বিষয় সে বেছে নেবে। তা হতে পারে রামের জীবন বা চৈতন্যভাগবত, তা হতে পারে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লোকায়ত জীবন অথবা অবনীন্দ্রনাথের আলোর ফুলকি। কিন্তু বই থাকবেই। বইয়ের জন্য হাঁটা দেখতে দেখতে একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন লেখক হিসেবে গর্বে বুক ভরে ওঠে।
(লেখক সাহিত্যিক)

