আশিস ঘোষ
ফাইজলামি! আমার এক জ্যাঠার ওটাই ছিল সর্বোচ্চ গালাগাল। কোনওকিছু খারাপ লাগলে একটু চড়া গলায় বলতেন, ফাইজলামি! এখন বেঁচে থাকলে নির্ঘাত বেশ কয়েকবার তাঁকে একথা বলতে হতই। কে বলল, কী বলল, নিক্তি মেপে বলার বান্দা তিনি ছিলেন না। ওটা ছিল তাঁর রাগ আর বিরক্তির চূড়ান্ত ককটেল।
যেকথা বলতে গিয়ে জ্যাঠামশাইয়ের ‘ফাইজলামি’ মনে পড়ল, তার পিছনে রয়েছেন দিল্লির শাসকদলের বাঘা বাঘা সব নেতারা। প্রতিবার যখন ভোট আসে, তখনই দলে দলে বঙ্গভূমে পদার্পণ হয় পদ্ম নেতাদের। তাঁরা এসে দলের জোর বাড়াবেন, ‘কারিয়াকর্তা’দের চাঙ্গা করবেন, গরম গরম বক্তৃতায় বাজার গরম করবেন- এটাই স্বাভাবিক।
ব্যাপারটা সেখানে থেমে থাকলে হত। কিন্তু শুরু হয়েছে নতুন উপদ্রব। দিল্লির হিন্দিভাষী ছোট-বড় নেতারা এখন প্রাণপণে বাঙালি হওয়ার কসরতে ব্যস্ত। তা করতে গিয়ে তাঁরা যেসব কাণ্ড ঘটাচ্ছেন, তাতে হাস্যরসের চেয়ে বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছে বেশি। প্রধানমন্ত্রীর দলে বাঙালি আছেন একগাদা। তাঁদের দিল্লিওয়ালাদের নিত্য বাংলা, বাঙালিকে নিয়ে বচনের ঠেলা সামলাতে হয়।
কিন্তু কে বলেছে, বহু কষ্টে বাংলার বিকৃত উচ্চারণে এরাজ্যে ভোট বাড়বে! তাতে যে ফল উলটো হবে- এটা কি তাঁরা বোঝেন না? ভোটের আগে হঠাৎ এসে দাড়ি বাড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ হওয়ার পরামর্শ কার কে জানে! তবু সেপর্যন্ত হলে নাহয় চলত, মুখ খুলে ‘চোলায় চোলায় বাজবে জয়ের ভেড়ি’ বলে বাজার মাটি করে ফেললেন যে।
বলতে গেলে এমন কাণ্ডের বিরাম নেই। সংসদে তাঁর ‘বঙ্কিমদা’ বলা চমকে দিয়েছে বাঙালিকে। কেউ কি মোদিজিকে বোঝায়নি, বাঙািলর কোথায় কাকে দাদা বলা যায়? রামকৃষ্ণ যে ঠাকুর- স্বামী নন, তাই বা কে বোঝাবে তাঁকে। এমন অনেক মণিমুক্তো ছড়িয়ে আর যাই হোক, বাঙালি মন জয় করা যায় না। বরং আরও বেশি করে তাঁর, তাঁদের অবাঙালি পরিচয়টা সামনে আসছে বারবার।
যেমন, বিজেপির এক বর্ষীয়ান সাংসদ মাতঙ্গিনী হাজরার নাম নিয়ে কুস্তি করে শেষে জানালেন তিনি একজন মুসলিম ছিলেন। বোঝো কাণ্ড! জ্যাঠামশাই বেঁচে থাকলে নির্ঘাত বলতেন, ফাইজলামি! দেশের মন্ত্রীসভার দুই নম্বর মানুষটি রবীন্দ্রনাথের পদবি ঠাকুর নয়, বেমালুম সানিয়াল বলে গেলেন ভরা সভায়।
বিজেপির আগের সভাপতি বিশ্বভারতীতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথের জন্ম শান্তিনিকেতনে। আর এখনকার সভাপতির কথা সত্যি হলে, রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নয়, নোবেল পেয়েছিলেন শান্তিতে। এসব কাণ্ড একবার, দু’বার হলে না হয় বোঝা যেত। কিন্তু বারবার হতে থাকলে তাকে কি নিছক মুখ ফসকানো কথা বলা যায়? নাকি পুরোদস্তুর অজ্ঞতা!
যখন সিধো কানহোর সঙ্গে ডহরবাবুর কথা বলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তখনও বিস্তর হাসি হয় বৈকি। তিনি বারবার একই কথা বললে তা আর মুখ ফসকে বলা থাকে কি? মোদির বঙ্গ অভিযানের আগে কে বা কারা তাঁর জন্য বক্তৃতার বয়ান তৈরি করেন, জানতে ইচ্ছে করে। তিনি কি বাঙালি? কতখানি বাঙালি? তিনি কি বাঙালির আবেগ বোঝেন? আর খামোকা মোদিকে বাঙালি হতেই বা কে বলল কে জানে!
কে জানাল, বাঙালি হলেই ভোট উপচে পড়বে! দাড়ি বাড়ালেই যে রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় না, ‘বিশ্বগুরু’-কে কে বোঝাবে। বরং বাঙালি সাজতে গিয়ে উলটে দিল্লির পদ্ম নেতারা যে হাসির খোরাক হচ্ছেন, সে বোধও নেই? আসলে চাইলেই যে বাঙালি হওয়া যায় না- কথাটা কবে যে বুঝবেন তাঁরা, কে জানে!
দলের প্রতিষ্ঠাতা একজন বাঙালি বলে আত্মশ্লাঘায় চিঁড়ে ভেজে না। শ্যামাপ্রসাদকেই বা এখনকার বাঙালি কতটুকু চেনে। তাঁর দলে বঙ্গবাসী বাঙালি কেউ এখন দিল্লির নেতৃত্বে নেই। ফলে এখন যাঁদের বঙ্গে বিজেপির ঘাড়ে চাপানো হয়েছে, তাঁরা না বোঝেন বাংলা, না চেনেন বাংলাকে। এনিয়ে রাজ্য বিজেপির মধ্যে অসন্তোষ পুরোমাত্রায়। সেকথা মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসছে বাইরে।
হিন্দি ভাষাকে, নিরামিষ খাওয়াকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা কি ঠাহর করতে পারেন না তাঁরা? বিভিন্ন গেরুয়া রাজ্যে দিনের পর দিন বাংলা বলার জন্য মার খেয়ে পালিয়ে আসা পরিযায়ীদের পরিবার কী ভাবছে, তা কি তাঁরা টের পান না? শুধু দু’লাইন ভুলভাল বাংলা বলে কি ক্ষত ঢাকা যাবে? পুরো বন্দে মাতরম গাইতে হবে বলে যাঁরা ফরমান দিচ্ছেন, তাঁরা একবারও হোঁচট না খেয়ে উচ্চারণ করুন তো- দ্বিসপ্তকোটীভুজৈর্ধৃতখরকরবালে।
আড়াইশো বছর দেশ শাসন চালানোর সময় যত্ন করে বাংলা শেখার, বাঙালিকে বোঝার চেষ্টা করে গিয়েছেন সাদা চামড়ার সাহেবরা। এখন কালো চামড়ার গুজরাটি সাহেবরা অত সহজে ফাঁকতালে বাঙালি হয়ে যাবেন! ফাইজলামি!
