প্ল্যাটফর্ম

প্ল্যাটফর্ম

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


এক অনন্ত জীবনস্রোতের সন্ধান

শুভময় সরকার

ট্রেন ছুটিতেছে, দুইপাশে কত কিছু পিছনে চলিয়া যাইতেছে, মিনি কেবল ভোঁস ভোঁস করিয়া ঘুমাইতেছে, কিছুই দেখিতে পাইতেছে না – এ’রকম একটি লাইন পড়েছিলাম ছোট বয়সের কোনও এক গল্পে। কার লেখা, কী গল্প কিছুই আজ আর মনে নেই, এমনকি লাইনগুলোও নিখুঁতভাবে স্মরণে নেই কিন্তু মনে আছে মিনির ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোনোর কথা। অবচেতন মনে হয়তো সেটা কোথাও ঘাপটি মেরে ছিল, নইলে আজও কেন ট্রেনে আমার ঘুম আসে না, রাতের ট্রেনেও প্রায় নিদ্রাহীন কাটে…! মনে হয় কত গ্রাম, বন্দর, জনপদ, বাজার, হাট, নদীকে পেছনে ফেলে আসছি। এক নদী পেরোতে না পেরোতেই পরের নদীর জন্য অপেক্ষা, এক জনপদ পেরোতে না পেরোতেই অন্য জনপদের অপেক্ষা। কত গল্প রয়ে যায় সেইসব নদী, বন্দর, জনপদ ঘিরে, কত না-জানা কাহিনী, কত লোককথা, মিথ…! তারপর যেতে যেতে এক স্টেশনের সঙ্গে দেখা, আরেকটু নিখুঁতভাবে বললে – প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে দেখা…! আর প্ল্যাটফর্ম বললেই যে ছবিটা ভেসে ওঠে, সে ছবির সঙ্গে কিছু শব্দ, চিৎকার ভেসে না এলে ছবিটাই অসম্পূর্ণ। সেই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অপেক্ষা আর চলমানতার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। একটু বৃহত্তর পরিসরে রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম যেন এক সমান্তরাল জীবনস্রোত, যাপনপ্রবাহ।

আমার স্কুল জীবন কেটেছে রেল অনুষঙ্গে। স্কুল চত্বর থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে রেলস্টেশন। যদিও শহরের মূল স্টেশন ছিল না সেটা, তবে শহর ছাড়ার সময় দূরপাল্লা এবং লোকাল, সব ট্রেনই ছুঁয়ে যেত এই স্টেশন। তখন প্ল্যাটফর্ম-টিকিটের কড়াকড়ি নেই, ছিল না নিরাপত্তার এমন শক্ত বাঁধন। আমরা বন্ধুরা টিফিনবেলায় ঝালমুড়ি কিংবা ছোলামাখা চিবোতে চিবোতে চলে যেতাম স্টেশন-প্ল্যাটফর্মে। বসন্ত দিনের হাওয়ায় হাওয়ায় তখন জীবনের নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হচ্ছে। আনাড়ি হাতের কাঁপা কাঁপা আঙুলে ‘তামাকপূর্ণ শ্বেতশলাকা’র অস্বচ্ছন্দ চলাফেরা। বন্ধুরা মেতে উঠছি বয়ঃসন্ধির স্বভাবসুলভ আলোচনায়। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়, যাত্রীদের ওঠা-নামা, অপেক্ষা আর ব্যস্ততা দেখতে দেখতে আমি আবিষ্কার করতে থাকি এক নতুন জগৎ, যে জগৎ পরবর্তী জীবনে আমায় ভাবতে শিখিয়েছে, আমি অনুভব করতে শিখেছি জীবনের সেই অন্তর্নিহিত স্রোতকে, ছন্দকে। অনুভব করলাম ‘জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নেহি’…!

এরপর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ সময়। সেই ‘তামাকপূর্ণ শ্বেতশলাকা’র ধোঁয়া বৃত্ত থেকে বৃত্তান্তরে ভেঙে ভেঙে গিয়েছে। বদলে যাচ্ছিল চারপাশ। সব কিছুর মতো তার রং, রূপ বদল হলেও আজও রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম আমার কাছে এক প্রবহমানতার চিহ্ন। আমায় বিস্মিত করে কিন্তু ক্লান্ত করে না। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এদেশের মাটিতে যাত্রীবাহী রেলের যাত্রা অজান্তেই অন্য এক জীবনস্রোতের সন্ধান দিয়েছিল, যে জীবন অনিশ্চয়তা থেকে নিশ্চয়তার মাঝে, নিরাশ্রয়তা থেকে আশ্রয়সন্ধানের মাঝে মধ্যবর্তী এক পরিসর, যেখানে রয়ে যায় লড়াই, সংগ্রাম,অস্থায়ী এক জীবনের ভরসা, আশ্রয় এবং নতুন জীবনের অপেক্ষা।

প্রিয় কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক-এর সঙ্গে এক আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছিল। আমার একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন ‘…আমি যে বেঁচে আছি, আমার বাঁচাটা বিশিষ্ট। এই যে আমার বিশিষ্ট বাঁচা, এটা কিন্তু কোনও গর্বের ব্যাপার নয়, বাঁচা মানেই বিশিষ্ট…’! সেই আলাপচারিতার প্রাসঙ্গিক অংশটুকুই উল্লেখ করলাম কারণ প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকাটাই বিশিষ্ট আর সেই বেঁচে থাকাকে, বেঁচে থাকার লড়াইকে আমি প্রত্যক্ষ করেছি, আজও করি প্রতিনিয়ত। রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম  ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের এই বঙ্গজীবনে কিংবা আরেকটু বিস্তারে বললে এই উপমহাদেশে। স্বাধীনতা এবং তৎপরবর্তী দেশভাগ, উদ্বাস্তুস্রোত এই উপমহাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। দেশভাগ নেহাতই এক ভূখণ্ডের ভাগাভাগি তো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ছিন্নমূল মানুষের কান্না, হাহাকার, আত্মপরিচয়ের লড়াই, এক শেষ থেকে নতুন এক শুরুর  সংগ্রাম। আর এসবের নীরব সাক্ষী এই রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মগুলো। সেদিনের উদ্বাস্তুবোঝাই ট্রেনগুলো সীমান্তরেখা পেরিয়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছেছিল বা পৌঁছাতে পেরেছিল (শরণার্থীদের অনেক ট্রেনই শেষ অবধি রক্তান্ত লাশ নিয়ে পৌঁছেছিল), উগরে  দিয়েছিল অগুনতি গৃহহীন মানুষকে। সাময়িকভাবে, কখনও বা দীর্ঘস্থায়ীভাবে সেই ছিন্নমূল মানুষদের আশ্রয় হয়ে উঠল রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মগুলো। সেসময়ের প্রামাণ্য নথিগুলোতে সেদিনের শিয়ালদা স্টেশন চত্বর এবং প্ল্যাটফর্মের বর্ণনা পাওয়া যায়, পাওয়া যায় কিছু ছবিও। হোগলা পাতার ছাউনিতে স্টেশন চত্বরে আশ্রয় পেয়েছিল ছিন্নমূল মানুষ। অনিশ্চিত এক জীবনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিল নতুন এক স্থিতিশীল জীবনের। আজন্ম চেনা জায়গা থেকে ছিন্নমূল হয়ে নতুন যাত্রাপথের মাঝে সেইসব প্ল্যাটফর্মই হয়ে উঠেছিল যেন এক ওয়েটিংরুম। কলকাতা এবং উপকন্ঠের রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মগুলো ঘিরে শুরু হয়েছিল নতুন লড়াইয়ের সূচনা।

আজও তো ঋত্বিক ঘটকের সিনেমাগুলো আমাদের অস্থির করে। আরও পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা উদ্বাস্তু আন্দোলনের আকরভূমিও সেই প্ল্যাটফর্মগুলোই। কলকাতার উপকণ্ঠের রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মগুলো মফস্বলিবৃত্তান্তের এক পরিসর এখনও। শহরতলির মানুষদের প্রাত্যহিকতা, যাপনের এক বড় অংশজুড়েই স্টেশনকেন্দ্রিকতা, প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিকতা। পাঁচের দশকের বাংলা সাহিত্যেও উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে অসংখ্য লেখা আমরা পাই। সেখানেও অনিবার্যভাবে এসেছে রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম। কিছু সাহিত্যসমালোচক সেইসময়ের এক ধারা হিসেবেই অভিহিত করেছেন এই ‘প্ল্যাটফর্ম-স্টোরি’কে। শুধু কলকাতা কিংবা শহরতলির প্ল্যাটফর্মই নয়, সমগ্র পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের প্ল্যাটফর্ম-স্টোরি, দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের ইতিহাস প্রায় একই। আরও পরবর্তী সময়ে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতেও আমরা ফের একবার সেই উদ্বাস্তুস্রোত এবং প্ল্যাটফর্ম-স্টোরির দ্বিতীয় অধ্যায় দেখতে পাই। এ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতি রয়ে গিয়েছে। থাক না হয় সে’সব, আজ বরং প্ল্যাটফর্মের ভিন্ন কিছু পরিসর হয়ে ওঠার গল্প বলি…!

 স্টেশন-প্ল্যাটফর্ম যে কতভাবে আমাদের জীবনে অপেক্ষার এক বারান্দা হয়ে রয়ে যায়, সে অভিজ্ঞতা আমাদের অল্প-বিস্তর সবারই রয়েছে। সেই যে ‘বড়ি জিন্দেগি’র ফিল্মি ডায়ালগের উল্লেখ করলাম এ লেখার শুরুতেই, তো সেই বড় জীবন কিংবা মহাজীবনের স্রোত হয়তো আপাত জীবনের আড়ালে দৃষ্টির বাইরেই রয়ে যায়। কবি শঙ্খ ঘোষ বলেছেন ‘দেখার দৃষ্টি’র কথা। রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মের আপাত ব্যস্ততা আর ভিড়ের গভীরে লক্ষ করা যায় আরও এক গভীর জীবনস্রোত, এক যাপনচিত্র। সেখানে রয়ে যায় কত পরিসর, জটিল জীবনের কত টুকরো ছবি। ‘চাক্ষিক রূপকার’ হিসেবে আমরা ছুঁয়ে ফেলতে পারি সেই ছবিগুলো আর সেইসব টুকরো ছবি জোড়া লাগিয়ে ক্যানভাসে যে কোলাজ ফুটে ওঠে সেখানেই রয়ে যায় জীবনের গল্প, মানুষের অনুভূতি, অপেক্ষা, মান, অভিমান, আনন্দ, বেদনা। একজন জীবন রসিক কখনও ক্লান্ত হয় না এ জীবনে। জীবন লম্বা নাই-বা হল, জীবন হোক বড়, সে জীবন আড়ালে বয়ে চলা মহাজীবনের সন্ধানে থাকুক। এই অন্বেষণ যতদিন থাকবে, জীবনকে বোঝা মনে হবে না।

এ লেখা শেষ হোক বরং সেই প্ল্যাটফর্ম-স্টোরি দিয়েই। গুলজার পরিচালিত আটের দশকের বিখ্যাত সিনেমা ‘ইজাজত’-এর শেষের দৃশ্যগুলো মনে পড়ছে। ওয়েটিং-রুমে যে কাহিনীর শুরু, প্ল্যাটফর্মে সেই কাহিনীর শেষ, মাঝে প্রায় পুরোটাই ফ্ল্যাশ-ব্যাক। বেশ কয়েক দশক পার হয়েও সিনেমাটি আজও প্রাসঙ্গিক। স্টিম ইঞ্জিনের কু-ঝিকঝিক শব্দের আবহে ধীরে ধীরে আবছা হয়ে আসা প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে ট্রেন…! একটা গল্প শেষ হচ্ছে কিংবা নতুন করে শুরু হচ্ছে। জীবনস্রোতকে ধরার জন্য অনেক সৃজনশীল মানুষের মতো গুলজার কিংবা তপন সিংহ (তাঁর পরিচালিত‘জতুগৃহ’, যাকে ‘ইজাজত’ সিনেমাটির প্রেরণা বলা হয়) বেছে নিয়েছিলেন সেই রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম। প্রিয় লেখক হাসান আজিজুল হকের বলা কথাগুলোতে ফিরে আসি ফের – বেঁচে থাকাটা বিশিষ্ট…! তাই আমাদের এই সংক্ষিপ্ত জীবন, সংক্ষিপ্ত বেঁচে থাকার মাঝেই খুঁজে নিতে হয় মহাজীবনের স্রোত। রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম সেই জীবনস্রোতকে খুঁজে নেবার এক বড় পরিসর, বরং তাকে চিনতে শিখি…! এই চেনাটাই জরুরি।

এপার ওপার…

উমাদাস ভট্টাচার্য

দু’-একটা প্ল্যাটফর্ম নামফলক নিয়ে কোনও কোনও মানুষের গভীরে থেকে যায়। থেকে যায় দু’-একটা গাছ‌ও। ছায়া নিয়ে। থেকে যায় সাইকেল স্ট্যান্ড। থেকে যায় লাইনের ধারে দুর্বল ঘরের বাইরে দুর্বলতর দড়িতে ঝোলানো ভেজা শাড়ি কিংবা শিশুর কোনওকালের রং ঘষে যাওয়া হাফহাতা রঙিন জামা। অনেক বছর পেরিয়ে সেসব প্ল্যাটফর্মে আর কখনও নামা হয় না। লাইন পেরিয়ে দেখা করে আসা হয় না সাইকেল স্ট্যান্ডের চিরকালীন কাঁচাপাকা চুলের ভবানীদার সঙ্গেও। বৃষ্টি শুরু হলেই ভবানীদা এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাইকেলগুলোর ওপর প্লাস্টিক চাদর বিছাতে বিছাতে বিড়বিড় করত। এইসব বৃষ্টির দিনে কেউ ট্রেন থেকে নেমে চাদরে ঢাকা মাঝখানে রেখে যাওয়া সাইকেল নিতে এলে আবার নতুন করে ঢাকা দেওয়ার কাজ শুরু করতে হত ভবানীদাকে। ভবানীদা যত চিড়বিড় করত স্ট্যান্ডের পাশের কালো ঘুপচি পানের দোকানে বসে বিজনদা জোরে জোরে বিড়ি টেনে উত্তেজিত করত ভবানীদাকে। আবার সারাদিন ভবানীদাকে জ্বালিয়ে মারা বিজনদা মাঝরাতের আগে শেষ ট্রেন থেকে নেমে আসা শেষ লোকটা সাইকেল নিয়ে চলে গেলে ভবানীদার সঙ্গে শেষ বিড়িটা টানতে টানতে ঘরমুখো হত। প্ল্যাটফর্মের বাইরেও প্ল্যাটফর্ম থাকে। সেই প্ল্যাটফর্ম বেয়ে সত্যি প্ল্যাটফর্মে পা রাখে আনকোরা কেউ। ভয়ে ভয়ে। প্রথম প্রথম। কানে কানে কেউ কেউ বলে,

–প্রথম প্রথম ওরকম হয়…

–কিছু হবে না তো?

সেই কেউ কেউ বলে ওঠে

–হয়নি তো…

আনকোরা বিশ্বাস করে আবার করে না। শুধু ফিশফিশ করে বলে,

–আমাকে সন্ধের আগে ফিরতে হবে।

আবার সেই কেউ কেউ শেষ স্টেশনে নামার আগে তাড়া দেয়

–হবে হবে সব হবে… অভ্যাস হয়ে যাবে…

আনকোরার অভ্যাস হয়ে যায়। শেষ স্টেশনের বাইরে এক বাড়িতে জড়ো হওয়া। সেখান থেকে নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়া। বাড়ির লোকের‌ও অভ্যাস হয়ে যায়। আনকোরার অভ্যাস হয়ে যায় দশটা পাঁচটায়। বাড়ির লোকের‌ও অভ্যাস হয়ে যায় মাঝে মাঝে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ার। টিভির। ফ্রিজের। জানলা-দরজায় রঙিন পর্দার। আনকোরা ক্রমশ অভ্যস্ত পা রাখে প্ল্যাটফর্মে। হড়কানোর ভয় পায় না। ভয়ের মেঘ সরে যায় চোখ থেকে। হাসিতে জড়তা থাকে না। মিশে যায় জনারণ্যে নির্দেশ অনুযায়ী। আনকোরা আর আনকোরা থাকে না। সেও নতুন কাউকে বলে কানে কানে

–হবে হবে…সব অভ্যাস হয়ে যাবে…

শেষ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক হয় না। পুরোনো আনকোরা নতুন আনকোরা একসঙ্গে আটকে যায় একদিন। মিইয়ে যাওয়া চেহারায় হঠাৎ জেগে ওঠা ব্রণ নিয়ে ফিরে আসে ওরা রাত ভোর করে ডাউন কাটোয়া লোকাল ধরে। অনেক রাতে। পরদিন নাকি তার পরদিন নাকি আরও কিছু পরদিন পেরিয়ে ওরা একে একে আবার নতুন করে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায়। প্ল্যাটফর্ম কাউকে ধারণ করে আবার কাউকে ধারণ করে না। প্রাণপণে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছাতে চাইলেও প্ল্যাটফর্ম আড়ালে থেকে যায় কখনো-কখনো। বাদ লা এটা জানার আগেই ফিনিশ। বাদ লা মানে বাদল ধর। খাকি ফুলপ্যান্টের উপর হাফহাতা সাদা জামা। বট গাছের পাশ দিয়ে যে রেললাইনটা সোজা উত্তরে চলে গিয়েছে তার থেকে একটা লাইন বেঁকে গিয়ে ঢুকেছে থার্মালের কোল হ্যান্ডলিং প্ল্যান্টে।  বাহান্ন কিংবা পঞ্চান্নর কয়লাবোঝাই ওয়াগন এক এক করে টিপলার-এর সামনে এলে আসুরিক সাঁড়াশি ওয়াগন উলটে খালি করে আবার সোজা করে দিলেও তার আনাচে-কানাচে তখন‌ও থেকে যেত কয়লার টুকরোটাকরা। ঘটাং ঘটাং শব্দে ওয়াগনগুলো ফিরে যাওয়ার পথে গা-ঝাড়া দিয়ে থার্মালের বাইরে এসে যে সামান্য সময় অদৃশ্য নির্দেশে দাঁড়াত সেটুকু সময়ের মধ্যেই লাইনের পাশে ঝাঁটা ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় ওয়াগনের চৌকো ঘুলঘুলিতে প্রবেশ করিয়ে দিত নিজেদের। নীচে অপেক্ষায় থাকা মানুষের মাথায় মাথায় নামিয়ে দিত ঝুড়িতে ঝাঁটিয়ে জড়ো করা ওয়াগনের কোনাকাঞ্চিতে লুকিয়ে থাকা কয়লার টুকরো এমনকি গুঁড়ো। এই গুঁড়ো কয়লার ভাগ শহরের কেন্দ্রে বসে থাকা সাদা জামার পকেটেও পৌঁছে যেত। একটুও কালো দাগ পড়ত না। বদলে বরাভয়। বদলে অদৃশ্য ডু নট ডিস্টার্ব বোর্ড। কয়লা দখলের একচ্ছত্র মালিক ছিল বাদল ধর। মালিক হ‌ওয়ার আগে ও বাদ লা ছিল। ওর আগে ছিল মণীশ। মণীশের ঝুপড়ি ছিল লাইনের পাশে। ক্ষমতা পেলে ওদের ঝুপড়ি বাড়ি হয়। তিনতলা না হলেও অন্তত দোতলা। কেউ টপকে দিতে এলেও যাতে তাকে উপরে উঠতে হয়। কষ্ট করতে হয় টার্গেটে পৌঁছাতে। মণীশের একতলা দোতলায় ভোগের সব উপকরণ সবসময় মজুত থাকত। হাতের কাছে সব থাকতে হবে। কোনও কিছুর জন্য যেন ওপর নীচ করতে না হয়। এমনকি রান্নার ঘর‌ও প্রতি তলায়। একতলা থেকে খেতে খেতে সিঁড়িতে শেষ হয়ে গেলে ওপরে উঠে এক‌ই ব্র্যান্ডের বোতল দোতলায় ফ্রিজ থেকে বের করে চুমুক দিত। নাকি মণীশরা জানত, মৌরসি পাট্টা চিরকালীন নয় ওদের জীবনে। তাই পরেরজন সামনে এসে দাঁড়ানোর আগে শেষ মুহূর্তটুকু শুষে নিতে হবে। দোতলায় সান্টাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল মণীশের বৌ। নিজে সামনে ছিল। পেছনে সান্টা। এসব লাইনে বৌকেও বিশ্বাস করে না কেউ। বৌয়ের পেছনে সান্টাকে দেখেই মণীশের ডানহাত চেম্বার শক্ত করে ধরেছিল। সান্টার হাতে ছিল মেয়ের বিয়ের কার্ড।

মণীশ কি একটু নরম হয়েছিল? মণীশের বৌ সরে গিয়েছিল সান্টার সামনে থেকে। আর তখনই মণীশের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গিয়েছিল। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে সারা অঞ্চল জেনেছিল অন্য খবর। সান্টা নয় বাদ লা এখন থেকে কয়লা গুঁড়োর মালিক। কীভাবে কেউ জানেনা। শুধু জেনেছিল সান্টা নেমে এসে ওর ডানহাত বাদ লার মোটরসাইকেলে উঠেছিল। তারপর আর সান্টাকে দেখা যায়নি। আজ‌ও না কাল‌ও না। আর এসব কথা কেউ পাঁচ কান না করলেও দশকান হয়েই থাকে। সেদিন থেকেই বাদ লা বাদল ধর। বাদল ধর মাধ্যমিক পাশ ছিল আর তাই শহরের সাদা জামার শক্ত প্ল্যাটফর্মে জায়গা পেয়েছিল। মণীশ মণীশ হ‌ওয়ার আগে লাইনের পাশে ওয়াগনের নীচে ওর ঝুরির কোটা ছিল। সেখানে ফিরে দাঁড়িয়েছিল মণীশের বৌ। বাদল ধরের বাড়ি উঠছিল লাইনের পাশে। একতলা দোতলা থেকে তিনতলা। দোতলার ব্যালকনি উঠোনের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল একটু একটু করে। তিনতলায় থাম উঠে দাঁড়াচ্ছিল একে একে। শান্ত মাথার বাদলের প্ল্যাটফর্ম বিস্তৃত হচ্ছিল রেললাইনের পাশ থেকে শহরের সাদা জামার প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত। সকাল সকাল আপ কাটোয়া লোকালে উঠে বাদল একদিন আবিষ্কার করেছিল অচেনা চারজন ওকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেকের পকেটে হাত। শান্ত ঠান্ডা মাথার বাদল উলটোদিকের দরজা দিয়ে ঝাঁপ দিতে দিতেই নাকের ডগায় ডাউন লোকালের গন্ধ পায়। ওর উলটোদিকের প্ল্যাটফর্মে আর ওঠা হয়ে ওঠে না। আপ ডাউনের মাঝখান দিয়ে অনন্তকাল ছুটেও রেহাই পায়নি বাদল ধর। দু’দুটো প্ল্যাটফর্মের একটাও ধারণ করেনি বাদলকে। সেদিন বিকেলে ওর ডেডবডি যখন ওর অর্ধসমাপ্ত বাড়ির সামনে এসে শুয়েছিল তখন শহরে সাদা জামার কন্ঠে শান্তির জন্য সুস্থ মানুষদের এক প্ল্যাটফর্মে জড়ো হওয়ার ডাক শোনা যাচ্ছিল। ডাক তো কতই আসে। জড়োও তো হয় কত লোক। দিনে হাঁটে। রাতে জাগে। এক‌ই প্ল্যাটফর্মে। দুই কিশোরী আর মা চলতি টোটোকে থামিয়ে বলেছিল

–চলো … যেখানে মিছিল পাব সেখানেই নেমে যাব…

ক্রোধ জেদ সংক্রামিত হয়ে জড়ো হয়েছিল একই প্ল্যাটফর্মে। হাথরস কিংবা কামদুনি। উন্নাও কিংবা মানিকচক। পার্ক স্ট্রিট ব্যারাকপুর কিংবা আরজি কর। সেইসময় বিশ্বাসে ভর করে অন্ধকার আকাশে উড়তে উড়তে এক জায়গায় জড়ো হচ্ছিল কফিনগুলো। ওরা হয়তো এখনও ওপর থেকে খুঁজে চলেছে ওদের জন্য তৈরি হ‌ওয়া প্ল্যাটফর্ম। কিংবা সেই মাস্টারমশাই যিনি বিশ্বাস করেছিলেন তার সামনে ব্যারিকেড করে দাঁড়িয়ে থাকা উর্দির আড়ালে সবাই তার ছাত্র। দিনের আলোয় ভর দুপুরে এখন বদল হয় বিশ্বাসের প্ল্যাটফর্ম। বদল হয় পতাকার। বদল হয় প্রতীকের‌ও।

আমার এই দেহখানি তুলে ধরো

রঙ্গন রায়

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সবকিছুকেই এখন বলা হয় ‘কনটেন্ট’। সে শর্টফিল্ম হোক, গান হোক, স্ট্যান্ডআপ কমেডি হোক, এডুকেশনাল ভিডিওই হোক আর ভ্রমণের ভ্লগ অথবা সাহিত্য– সবই কনজিউমার এবং ক্রিয়েটরের কাছে ‘কনটেন্ট’। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে।’ আর এই ডিজিটাল যুগের রাজত্বে, শিল্পীরাও এখন রাজা। আপনার যদি থাকে স্মার্টফোন আর সৃষ্টিশীল মনন, তবে আপনিও ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’। সোশ্যাল মিডিয়া এসে বিনোদন জোগানো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলির যে মৌরসি পাট্টা ছিল– তাকে এক অর্থে ধূলিসাৎই করে দিয়েছে। সবার হাতেই আছে এখন উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম। আর এই কনটেন্ট ক্রিয়েশনে, প্ল্যাটফর্মের সঠিক ব্যবহারে— তরাই-ডুয়ার্স কিংবা পাহাড় অঞ্চল মোটেই পিছিয়ে নেই। জলপাইগুড়ির রাজবাড়িদিঘি থেকে কোচবিহারের সাগরদিঘি কিংবা মালদার আম বাগান থেকে আলিপুরদুয়ারের চা বাগান—সর্বত্র, সর্বত্রই সোশ্যাল মিডিয়া জাদুকাঠির স্পর্শ। আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা শুধু দর্শক হয়ে বসে নেই আর। প্রতিভা বিকাশের এলাহি রাজসূয় যজ্ঞের মঞ্চটা বুঝতে আপনাকে একবার ইউটিউবের অলিতেগলিতে উঁকি মারতে হবে। মারতে হবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামেও।

দেখা যাক, কীভাবে আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা স্মার্টফোনকে অস্ত্র করে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে তথাকথিত গ্ল্যামার দুনিয়াকে। শুরুটা করা যাক ‘আরজে প্রিয়াংকা’কে দিয়েই। এই যুগে দাঁড়িয়ে, একটিও অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ না করেও যে নিখাদ হাসির ফোয়ারা ছোটানো যায়, চেনাজানা শহরের রোজনামচাকেই হাসির মোড়কে মুড়ে পরিবেশন করা যায়, সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন শিলিগুড়ির মেয়ে প্রিয়াংকা। তাঁর সেই অভাবনীয় ‘ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন’ আর অদ্ভুত সব কমিক টাইমিং-এ মজে আছে আজ উত্তর থেকে দক্ষিণ। প্রিয়াংকার ইউএসপি কিন্তু কোনও মেকি আভিজাত্য নয়, বরং সেটা তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিরক্তি, বন্ধুদের নিয়ে মজা, পাড়ার মাসিমা-কাকিমাদের গসিপ, শিলিগুড়ির ট্রাফিক জ্যাম— সবকিছুকেই তিনি যেভাবে কমেডির ছাঁচে ফেলেন, তা এক কথায় মাস্টারক্লাস। ভাষায় স্বকীয় উত্তরবঙ্গের টান, অদ্ভুত রসবোধ, আর নিজেকে নিয়ে মজা করবার ক্ষমতা— এটাই আর পাঁচজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের চেয়ে আলাদা করে দেয় তাঁকে। আপনি একবার যদি তাঁর ভিডিওর লুপে ঢোকেন, তো সেখান থেকে রামগরুড়ের ছানা হয়ে বেরিয়ে আসা আপনার সাধ্যি নয়!

আর হাসির কথা যখন উঠলই, তখন ‘সিনেবাপ’-এর নাম না নিলে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কোচবিহারের ছেলে মৃন্ময় যখন প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে খাস উত্তরবঙ্গীয় টানে ‘রোস্টিং’ শুরু করেছিল, অনেকে হয়তো নাক সিটকেছিলেন। কিন্তু আজ? আজ সে বাংলার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অন্যতম পরিচিত মুখ। মৃন্ময়ের সেই ‘বুলবুলদা’ বা মধ্যবিত্ত জীবনের নানা খুঁটিনাটি নিয়ে, সিনেমা নিয়ে শ্লেষ মেশানো হাস্যকৌতুক— বাংলার ড্রয়িংরুমের অবিচ্ছেদ্য অংশ এখন।

​মৃন্ময়ের সিগনেচার স্টাইলটা কী জানেন? ওর সেই ‘ফিলগুড’ ফ্যাক্টরটা। ও যখন কথা বলে, মনে হয় পাশের বাড়ির কোনও চ্যাংড়া ছেলে পাড়ার রকে বসে খিল্লি করছে। আর খিল্লি করতে করতেই সে উত্তরবঙ্গে বসে বুঝিয়ে দিচ্ছে, কলকাতার টালিগঞ্জ না হলেও চলে। বিনোদনের সাম্রাজ্য গড়া যায়— শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়াকে ভরসা করেই।

আবার সুরের দিকে কান দিলেও মনটা জুড়িয়ে যায়। আমাদের এই উত্তরের নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি যে কতটা সমৃদ্ধ, তা নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছেন প্রীতম রায়। তাঁর ‘প্রীতম রায় ক্রিয়েশনস’ এখন লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদস্পন্দন। রাজবংশী গানগুলো যে শুধু গ্রামগঞ্জের আসরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা প্রীতম প্রমাণ করে দিয়েছেন।​ তাঁর চ্যানেলে যখনই কোনও নতুন গান আসে, তখন দেখা যায় ভিউজ-এর বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে মাটির সুরের মেলবন্ধন— একেই তো বলে বিবর্তন! ‘তুমি দিও না গো বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া’র মতো গানগুলো যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ট্রেন্ডিং হয়, তখন আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের জন্য আনন্দ হতে বাধ্য। সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্ম এভাবেই ব্রাত্যকে এনেছে আলোয়, আঞ্চলিকতাকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি। প্রীতম এবং শ্রেয়ার মিউজিক ভিডিওয় তাঁদের অসাধারণ জুটি কিংবা তাঁদের চ্যানেলের মৌলিক গীতিকার শুভঙ্কর বর্মন ও ঈপ্সিতা বর্মনের গান আজ আর শুধু কোচবিহার বা জলপাইগুড়ির নয়, তা এখন বিশ্ব-রাজবংশী তথা বাংলার সম্পদ।

এই হাসি আর গানের মাঝে যদি একটু সিরিয়াস কিন্তু চটপটে জ্ঞানের কথা শুনতে চান, তবে আপনাকে যেতে হবে জলপাইগুড়ির মুখুজ্জে মশাইয়ের ঠেকে। আজকের দিনে যখন জ্ঞান দেওয়া মানেই একঘেয়ে লেকচার বলে ধরে নেওয়া হয়, তখন মুখুজ্জে মশাই প্রথা ভেঙেছেন। বাংলার শব্দভাণ্ডারের নানান অদ্ভুত তথ্য, বেদপুরাণের নানান মজার গল্প নিয়ে তিনি যখন মুখ খোলেন, তখন সেখানে শুধুই শুষ্ক তত্ত্ব থাকে না, থাকে এক অদ্ভুত পরিমিতি আর অপূর্ব রসবোধ।

পেশায় যিনি দুঁদে গোয়েন্দা ও পুলিশকর্তা বিরাজ মুখোপাধ্যায়, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে তিনিই আবার মুখুজ্জে মশাই। যাঁর মুখে একবার যদি শোনেন বাঙালির পদবির ইতিহাস, তাহলে এ জীবনে হয়তো আর ভুলতে পারবেন না।

আর জ্ঞানের কথা যদি আসেই, তবে বলতে হয় ‘থিংক্যালিটি’র কথা। আমাদের দিনহাটা, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, অধুনা বাংলাদেশের রংপুর বা অসমের পশ্চিম অংশটা যে কোচ রাজবংশীদের স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল এককালে, বা তারও আগে যেটা ছিল কান্তেশ্বরের কামতাপুর, সেই আদি ভূমিপুত্রদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস, ইতিহাস, দেবদেবী, লোকগান এবং রাজাদের মহান কীর্তিকে সমগ্র ভারতবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে বিদুষী তরুলেখা রায় উদ্যোগ নিয়ে খুলেছেন একটি ফেসবুক পেজ, যার নাম ‘থিংক্যালিটি’। লক্ষাধিক মানুষের ভিউজ সেখানে হয়, কারণ তরুলেখা বেছে নিয়েছেন হিন্দি ভাষাকে। তাঁর কনটেন্ট সিরিয়াস ও এডুকেশনাল। নিজেদের জাতি অস্মিতাকে ভারতব্যাপী তুলে ধরাটাই লক্ষ্য তরুলেখার। এই ভিডিওগুলো দেখলে আপনি জানতে পারবেন অজানা বিভিন্ন তথ্য ও প্রকৃত ইতিহাস। অল্প হলেও ভাবতে চাইবেন, ভাবা প্র্যাকটিসও করবেন।

এর মধ্যে অডিওস্টোরির কথা উল্লেখ না করলে ভীষণ অন্যায় হয়ে যাবে। ময়নাগুড়ির কয়েকজন উদ্যমী তরুণ তুর্কি ছেলেমেয়েরা ‘দি স্যাটার্ডে টিউব’ নামে ইউটিউবে একটি চ্যানেল খুলে শোনান বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন গল্প। আজকের দিনে গোটা দুনিয়াজুড়েই অডিওবুক ও অডিওস্টোরির ডিমান্ড অভূতপূর্ব। মানুষ যে কখনোই কোনওভাবেই সাহিত্য বিমুখ হয় না, বই পড়ার সময় বা ধৈর্য হারিয়ে ফেললেও, মাধ্যমটা বদলে তিনি ঠিকই সাহিত্যের কাছেই ফেরেন, তা এইসব অডিওস্টোরি চ্যানেলের বিপুল ভিউজ দেখলেই প্রমাণ হয়। আর তাতে উত্তরবঙ্গও যে পিছিয়ে নেই, তা বলাই বাহুল্য। আগামীতে আরও চ্যানেল উঠে আসবে। যেভাবে উঠে এসেছে এই প্ল্যাটফর্মকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে সফল হওয়া কবি-লেখকেরা।

বিগত দশ বছরে যতজন নতুন কবি-সাহিত্যিক উঠে এসেছেন আমাদের উত্তরবঙ্গ থেকে, তার সিংহভাগই ফেসবুক নামক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। নতুন কবি-লেখকদের লেখা প্রকাশের আগে কোনও জায়গা ছিল না সেভাবে। তাঁরা একটা প্ল্যাটফর্ম পেয়েছেন। লেখা কেমন হচ্ছে, মানোত্তীর্ণ হচ্ছে কি না, সেগুলো পরের তর্ক। কিন্তু সবাই আসলে চেষ্টা করছেন ভালো কাজ করবার। মানুষকে আনন্দ দেওয়ার। প্ল্যাটফর্মকে সঠিক ব্যবহারের। মানুষের পরিশ্রমী জীবনকে বিনোদন দেওয়াটাও যে এক শিল্পীর বিরাট বিপুল দায়!

এই যে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে উত্তরবঙ্গের আনাচেকানাচে বসে ভ্লগ বানাচ্ছে— কেউ বা দেখাচ্ছে পাহাড়ের অজানা অপূর্ব ঝরনা, কেউ আবার মালদার ফজলি আমের মহিমা, কেউ হয়তো বানাচ্ছেন শর্টফিল্ম, তো কেউ দেখাচ্ছেন ছবি আঁকা— এগুলো কি কেবলই শখ? উঁহু! এ হল নতুন যুগের শিল্প। এটি এখন রোজগারের নয়া মাধ্যম। রবি ঠাকুর গেয়েছিলেন, ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর।’ সেভাবেই আজ কোচবিহার থেকে গান ধরলে তা শোনা যায় ক্যালিফোর্নিয়ায়। জলপাইগুড়ির সাহিত্য-গল্প যখন জামাইকার কোনও বাঙালির কানে পৌঁছায়, তখন ভূগোলের মানচিত্র ফিকে হয়ে আসে। শিল্পটা বাঁধা পড়ে একটাই অদৃশ্য সুতোয়।

অনেকে হয়তো ভাববেন, কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ইঁদুর-দৌড়ে কে টিকে থাকবে আর কেইবা তলিয়ে যাবে মহাকালের গর্ভে? তার উত্তর দেবে সময়। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিজেই আজ ইন্ডাস্ট্রি। শিল্প এখন কারও মুরুব্বিয়ানার কথা শোনে না, আমাদের হাতের তালুতে, আমাদের নিজস্ব শর্ত ও ডায়ালেক্টে সে স্পন্দিত হচ্ছে। উত্তরবঙ্গ আজ শুধু কেন্দ্রের দিকেই নয়, সে তাকাচ্ছে গোটা বিশ্বের দিকেও। আর এই সংযোগের জয়গানই হল একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লব।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *