অপারেশন সিঁদুর বিতর্কে অবশেষে লোকসভায় মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী। কেন সেনাবাহিনীর ওই অভিযান হয়েছিল, তার প্রভাব কতটা ইত্যাদি নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা বলেছেন নরেন্দ্র মোদি। তাঁর আগে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা-ও অপারেশন সিঁদুরের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছেন লোকসভায়। ইতিমধ্যে অপারেশন মহাদেবে হত তিন জঙ্গিই পহলগামের হত্যালীলায় যুক্ত ছিল বলে শা জানিয়েছেন।
শাসক শিবিরের যাবতীয় কৃতিত্ব ও সাফল্য দাবি সত্ত্বেও বিরোধীদের বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। নিঃসন্দেহে বিরোধী শিবিরের বহু ত্রুটি, বিচ্যুতি রয়েছে। মুখে ঐক্যের কথা বললেও ‘ইন্ডিয়া জোটে’র বহু শরিকের মধ্যে এখনও বিভিন্ন ইস্যুতে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু অপারেশন সিঁদুর নিয়ে সংসদে বিরোধীদের তোলা প্রশ্নগুলি দেশের সামরিক, বৈদেশিক ও রণনীতিগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেসবের উত্তর না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভাষণের অধিকাংশ সময় নেহরু-গান্ধি পরিবার ও কংগ্রেসের সমালোচনা করে কাটিয়ে দিলেন লোকসভায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ বিরতির কৃতিত্ব দাবি নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেসের রাহুল গান্ধি, প্রিয়াংকা গান্ধি ভদরা, তৃণমূলের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষরা। মোদি সরকার কেন এবিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করছে না, একসুরে জানতে চেয়েছেন তাঁরা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
তিনি শুধু বলেছেন, বিশ্বের কোনও দেশ ভারতকে অপারেশন সিঁদুর থামানোর কথা বলেনি। ভাষণে একবারের জন্যও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামোচ্চারণ করেননি তিনি। একাধিক সেনাকর্তা অপারেশন সিঁদুরে বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভেঙে পড়ার কথা স্বীকার করেছিলেন। রাহুল সেই প্রসঙ্গ তুললেও মোদির ভাষণ আটকে ছিল পাকিস্তানের জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংসের খতিয়ান দিতে।
রাহুলের মতে, শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি রক্ষায় অপারেশন সিঁদুর হয়েছে। তাঁর সমালোচনা থেকে বাদ যাননি প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রীও। জঙ্গিরা কীভাবে বৈসরণ উপত্যকায় এল, কীভাবে পালিয়ে গেল, কেন পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার বন্দোবস্ত ছিল না ইত্যাদি প্রশ্ন তোলেন প্রিয়াংকা। এত ব্যর্থতার পরও অমিত শা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে থাকায় কটাক্ষও করেন রাহুল।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামনে মোদির ৫৬ ইঞ্চির ছাতি ৩৬ ইঞ্চিতে পরিণত হয় বলে ব্যঙ্গ করেছেন রাহুলও। মোদি-শা’রা এই আক্রমণের জবাব না দিয়ে নিজেদের দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তি তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি কংগ্রেস ও নেহরু-গান্ধি পরিবার প্রতি পদে দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করেছে বলে নিন্দা করেছেন।
যদিও নেহরু-গান্ধি পরিবারের কার্যাবলি বা অতীতের ভুলভ্রান্তির সঙ্গে অপারেশন সিঁদুরের সম্পর্ক নেই। গত ১১ বছর ধরে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার। ফলে পহলগামে নিরাপত্তা ও অপারেশন সিঁদুরে কোনও ভুল থাকলে তার দায় মোদি সরকারেরই। সংসদে তা নিয়ে জবাবদিহি করাও কেন্দ্রের দায়িত্ব। বস্তুত বিজেপি গত ১১ বছর ধরেই জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধি, রাজীব গান্ধি, সোনিয়া গান্ধি, মনমোহন সিংকে বারবার কাঠগড়ায় তুলেছে।
যে কোনও শাসকই নিজেদের যাবতীয় ভুল পদক্ষেপের জন্য পূর্বসূরিদের নিশানা করে। এনডিএ সরকারও সেই পথে চলেছে। অপারেশন সিঁদুরের সাফল্য শুধু দেশে নয়, বিদেশেও প্রচার করতে মোদি সরকার কসুর করেনি। কিন্তু অপারেশন সিঁদুর নিয়ে দেশবাসীর মনে তৈরি প্রশ্নগুলির জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি এই সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদিও তাঁর বক্তৃতায় বৈসরণে সরকার নিরাপত্তা দিতে পারেনি বলে গাফিলতির দায় স্বীকার করেছেন।
সংসদে শাসক ও বিরোধী শিবিরেরই সুচিন্তিত অবস্থান স্পষ্ট করা সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি ও প্রথা। কিন্তু মোদি-শা’রা শুধু প্রচারের ঢাক পিটিয়ে অপারেশন সিঁদুরের যাবতীয় কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করে গেলেন। মানুষকে স্পষ্ট উত্তর দিয়ে ধোঁয়াশামুক্ত করার দায়িত্ব পালন করলেন না। নেহরু-গান্ধি পরিবার ও কংগ্রেসকে নিশানা করলেই সেই দায়িত্ব ফুরিয়ে যায় না।
