প্রশ্ন কমিশনের স্বাতন্ত্র্যে

প্রশ্ন কমিশনের স্বাতন্ত্র্যে

শিক্ষা
Spread the love


সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই যখন, তখন এত ঢাকঢাক-গুড়গুড় কেন! ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র অজুহাতে কোটি লোককে যদি ডাকাই হবে, তাহলে তাঁদের তালিকা গোপন থাকার কারণ কী! নির্বাচন কমিশনের এই গোপনীয়তার যে যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই, তা বেআব্রু হল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। যে নির্দেশ নিয়ে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়- বিজেপির নীরবতা। এমনিতে কমিশনের কোনও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী চিঠি দিলে পালটা চিঠি দিয়ে কমিশনকে অভ্রান্ত পরিণামে মরিয়া থাকেন বিজেপি নেতারা।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর বিজেপি নেতারা কিন্তু মুখে আঙুল দাদা। নির্দেশটির ২৪ ঘণ্টা পরে মুখে তাঁদের রা’টি নেই। মানে কী? লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র গোপনীয়তার পক্ষে যুক্তি সাজানোর অস্ত্র আর একটিও নেই। ভোটার তালিকার বিশেষ িনবিড় সংশোধনী (এসআইআর)-র অভিধানে প্রথম থেকে ম্যাপিং, লিংকিং ইত্যাদি শব্দ ছিল। হঠাৎ কমিশন আমদানি করে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি শব্দটিকে। যা এসআইআর-এর মূল গাইডলাইনে ছিল না।

কী সেই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি? বাংলায় যাকে বলা হচ্ছে তথ্যগত অসংগতি? তথ্যগুলো কেমন? কারও নামের বানান ভুল, ইংরেজি ও বাংলা নামের ফারাক কিংবা নামের প্রথম অংশের সঙ্গে দ্বিতীয় অংশ (ইংরেজিতে যাকে বলে ফার্স্ট নেম ও মিডল নেম) জুড়বে না আলাদা থাকবে ইত্যাদি নানাবিধ জগতের যত সামান্য ব্যাপার। দায়িত্ব দিলে যে কাজটি বুথ লেভেল অফিসাররা (বিএলও) বাড়ি বাড়ি ঘুরে কিংবা টেলিফোনে কথা বলে সহজে করে ফেলতে পারতেন।

এজন্য এত নোটিশ, এত শুনানি, এত এত কর্মী-আধিকারিককে কাজে লাগানো, এত সময় ব্যয় ইত্যাদির দরকার হত না। প্রয়োজন হত না কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচের। এতে হয়রানির অভিযোগটা আর শুধু রাজনৈতিক দলের থাকছে না, সাধারণ মানুষের ক্ষোভে তাতে সিলমোহর পড়ে যাচ্ছে। একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন শুধু রাজনৈতিক দলের নয়, সাধারণ মানুষের বিরাগভাজন হচ্ছে।

জনগণের অংশগ্রহণমূলক সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের কোনও সংস্থা মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হলে তার কার্যপদ্ধতি শুধু নয়, ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষ করে বিজেপি নেতাদের নানা মন্তব্যে নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় জাগা স্বাভাবিক। কমিশনকে আগলে রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শাসক বা অন্য কোনও দলের নয়। কিন্তু বিজেপি যেন সেই কাজটি করে চলেছিল।

প্রথম থেকেই কত নাম বাদ পড়বে, তার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে বিজেপি যেন নির্বাচন কমিশনের কাজটা বেঁধে দিতে চাইছিল। বাংলায় তৃণমূল আবার একেবারেই অনাহূত হোন বা রবাহূত হোন- কারও নাম বাদ দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে এসআইআর-এর উদ্দেশ্যকে ঘেঁটে দিতে মরিয়া ছিল। ফলে স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বদলে এসআইআর কারও ভোটের স্বার্থ সুরক্ষিত করার তাস বলে ধারণা তৈরি হচ্ছিল সাধারণ মানুষের মনেও।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড ও সেই কাজের পরিণাম নিয়ে বিজেপির হইচই ওই ধারণাকে আরও পোক্ত করেছে। অন্যদিকে, কাজটিকে নানাভাবে বাধা দেওয়ার আগাগোড়া মরিয়া চেষ্টা করে গিয়েছে তৃণমূল। একটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে বগলদাবা করার জন্য কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ পর্যন্ত পুরো দলীয় বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিল তৃণমূল নেতৃত্ব। ফলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াটি যেন রাজনৈতিক চেহারা নিয়ে ফেলল। যা কমিশনের স্বতন্ত্র, নিরপেক্ষ অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে।

বাংলায় মাধ্যামিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ডকে অগ্রাহ্য করার ফতোয়া কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়ে আরও সংশয় সৃষ্টি করেছে। কেননা, এতদিন সরকারি ক্ষেত্রে এই নথিটি বয়সের নথি হিসেবে চূড়ান্ত মান্যতা পেত। সুপ্রিম কোর্ট সেই মান্যতায় সিলমোহর দেওয়ায় কমিশনের উদ্দেশ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের রায়কে তৃণমূলের জয় বলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়দের প্রচার কমিশনের মর্যাদাকে লঘু করে দিচ্ছে সন্দেহ নেই।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *