প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া বনাম মমতার জেদ

প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া বনাম মমতার জেদ

শিক্ষা
Spread the love


পল্লব বসু

নির্বাচন কমিশন পাঁচ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছে ঠিকই, কিন্তু রবিবার বিকেলে দিল্লির নির্বাচন সদনে সাংবাদিক বৈঠকে জাতীয় মিডিয়ার যাবতীয় আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কেবলই পশ্চিমবঙ্গ। স্পষ্টতই, এই নির্বাচন অতীতের যে কোনও লড়াইয়ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে চলেছে। নির্বাচন কমিশন এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-উভয় শিবিরই যে গতবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আটঘাট বেঁধে নেমেছে, তা তাদের প্রাথমিক পদক্ষেপেই পরিষ্কার। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ কয়েক দশক পর এবার মাত্র দুই দফায় নির্বাচন হতে চলেছে। শুধু নির্ঘণ্ট ছাঁটাই করাই নয়, আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নজিরবিহীনভাবে রাজ্য প্রশাসনে রদবদল ঘটিয়েছে কমিশন। মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্রসচিবের মতো শীর্ষ আমলাদের এক লহমায় সরিয়ে দিয়ে নির্বাচন সদন কড়া বার্তা দিয়েছে যে, এবার প্রশাসনিক স্তরে কোনও রকম শিথিলতা বরদাস্ত করা হবে না।

ভোটের নির্ঘণ্টের দিকে একটু গভীরভাবে চোখ রাখলেই কৌশলটি ধরা পড়ে। গোটা রাজ্যকে কার্যত দুটি ব্লকে ভাগ করে নির্বাচনের নকশা তৈরি হয়েছে। প্রথম দফায় ভোট সেই অঞ্চলগুলোতে, যেখানে বিজেপির সংগঠন তুলনামূলক মজবুত বা গেরুয়া শিবিরের জেতার সম্ভাবনা প্রবল। আর দ্বিতীয় দফায় ভোট শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে। এটি কি নেহাতই সমাপতন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হয়তো নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাই ভোল্টেজ ব্রিগেড সমাবেশের ঠিক পরের দিনই ভোটের এই নির্ঘণ্ট ঘোষণা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা চলছে। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট রসদ রয়েছে। কিন্তু রাজনীতির ময়দানে এসব এখন গৌণ বিষয়। আসল কথা হল, গোটা দেশের নজরকাড়া এই ব্লকবাস্টার নির্বাচনের রণডঙ্কা বেজে গেছে এবং দু’পক্ষই তাদের তলোয়ার শানিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছে।

শাসকদল তৃণমূল তাদের কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা রাখতে ‘সহজ জয়’-এর ভোকাল টনিক দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবের মাটিতে কান পাতলে সুরটা অন্যরকম। ভোটের মুখে তড়িঘড়ি সরকারি কর্মীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা বা যুবসাথী প্রকল্পের অনুদান এগিয়ে আনার মরিয়া চেষ্টাই বুঝিয়ে দিচ্ছে, নবান্নও ভোটারদের মনের গভীরে জমতে থাকা প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভের আঁচ পেয়েছে। এমন নয় যে গত কয়েক বছরে বিরোধী হিসেবে বিজেপি বিধায়ক বা সাংসদরা অভাবনীয় কোনও কাজ করে রাজ্যবাসীর মন জয় করে নিয়েছেন। বরং, মানুষের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মূল নিশানায় রয়েছে তৃণমূলের দেড় দশকের পাহাড়প্রমাণ ব্যর্থতা এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থা।

এই ক্ষোভের শিকড় অনেক গভীরে। গত এক দশকে লাগামহীন দুর্নীতি, নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং সরকারি কোষাগার শূন্য হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলি জনমানসে গভীর রেখাপাত করেছে। ‘বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট’-এর মতো চোখধাঁধানো মঞ্চ থেকে লাখো কোটি টাকার লগ্নি আসার গালভরা প্রতিশ্রুতির পরও বাস্তবে ভারীশিল্পের চরম আকাল রাজ্যের অর্থনীতিকে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছে। ‘ব্রেন ড্রেন’ আজ বাংলার এক রূঢ় বাস্তব। রাজ্যের দক্ষ ও শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম কাজের খোঁজে পুনে, হায়দরাবাদ বা বেঙ্গালুরু পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, সাধারণ অদক্ষ শ্রমিকরা পরিযায়ী হয়ে ছুটছেন ভিনরাজ্যে। যে ওডিশাকে একসময় বাংলার মানুষ কিছুটা তাচ্ছিল্যের নজরেই দেখতেন, আজ সেখানকার উন্নত পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের কাছেও বাংলা দৃশ্যত ম্লান। রাজ্যের এই অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ভোটারদের মনে এক গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে।

অর্থনৈতিক এই চরম হতাশার পাশাপাশি বাংলার বৃহত্তর হিন্দু সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, ভোটব্যাংক সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে বর্তমান সরকার সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতিতে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। দুর্গাপুজোর ভাসান থেকে শুরু করে রামনবমীর মিছিল—বিভিন্ন ধর্মীয় আচরণে প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের প্রতি অতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি সংখ্যাগরিষ্ঠের মনে বঞ্চনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তৃতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এসে এই চাপা ক্ষোভ আঁচ করতে পেরেছিলেন পোড়খাওয়া রাজনীতিক মমতা। ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে দিঘায় পুরীর আদলে জগন্নাথ মন্দির, শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির নির্মাণ, পুরোহিত ভাতা চালু বা গঙ্গাসাগরের ব্যাপক উন্নয়নের মতো ‘সফট হিন্দুত্ব’-র পথে হেঁটেছেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন হল, মেরুকরণের এই তীব্র আবহে এই ড্যামেজ কন্ট্রোল কি বড্ড দেরিতে শুরু হল?

অন্যদিকে, সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকও নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার সমীকরণ কষতে ব্যস্ত। রাজ্যে বিজেপির আগ্রাসী উত্থান এবং মেরুকরণের সুস্পষ্ট পদধ্বনি শুনে সংখ্যালঘুরা এবার অনেক বেশি সতর্ক। তাঁরা নিশ্চিত করতে চাইছেন, কোনওভাবেই যেন অবিজেপি ভোট ভাগ হয়ে গেরুয়া শিবিরের সুবিধা না করে দেয়। তাই বাম-কংগ্রেস নাকি তৃণমূল—কে বিজেপিকে রুখতে সবচেয়ে বেশি সক্ষম, তার ওপর ভিত্তি করেই এবার সংখ্যালঘু ভোটার কৌশলগত ভোটদানের পথে হাঁটবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই আবহে বিরোধী শিবিরের অবস্থাও তথৈবচ। মালদায় মৌসম নুরের প্রত্যাবর্তনে কংগ্রেস কিছুটা আশার আলো দেখলেও, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে তারা জর্জরিত। সিপিএমের সংকট আরও গভীর। লালঝান্ডা বহনকারী অনেকেই যে ভোটের দিন ব্যালট বক্সে পদ্ম প্রতীকে বোতাম টেপেন, তা আজ আর কোনও গোপন বিষয় নয়। বামেদের ভোটব্যাংকের একটি বড় অংশ যে গেরুয়া শিবিরের দিকেই ঢলেছে, তা গত কয়েকটি নির্বাচনেই প্রমাণিত।

এর পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতিগত ভোটব্যাংকের অত্যন্ত জটিল সমীকরণ। দক্ষিণবঙ্গে মতুয়াদের নাগরিকত্ব বা সিএএ ইস্যু নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং প্রত্যাশা এবার ব্যালট বক্সে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গে রাজবংশী আবেগ একটি বড় ফ্যাক্টর। আলাদা রাজ্যের দাবি, ভাষাগত স্বীকৃতি এবং বঞ্চনার ইতিহাস রাজবংশী সমাজকে বরাবরই বিক্ষুব্ধ করে রেখেছে, যার সরাসরি ফায়দা গত নির্বাচনগুলিতে পেয়েছে বিজেপি। তৃণমূলও এবার সেই হারানো জমি উদ্ধারে মরিয়া। এর সঙ্গেই রয়েছে আদিবাসী সমাজের সেন্টিমেন্ট। জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের চা বলয়ে আদিবাসীদের মন পেতে দুই দলই তৎপর। এর মাঝে দেশের রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের কিছু বেফাঁস মন্তব্য বিরোধীদের হাতে প্রচারের অস্ত্র তুলে দিয়েছে ঠিকই, তবে শেষ বিচারে এই ইস্যুগুলো ভোটারদের সার্বিক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিজেপি শিবিরের অন্দরের চিত্রটাও খুব একটা মসৃণ নয়। রাজ্য বিজেপির ডামাডোল, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার অভাব স্পষ্ট। পরিস্থিতি অনুধাবন করে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবার সরাসরি নির্বাচনের রাশ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। স্থানীয় নেতাদের ব্যাকসিটে পাঠিয়ে অমিত শা সহ শীর্ষ নেতৃত্ব পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে এনেছেন, যা প্রমাণ করে রাজ্য নেতাদের ওপর তাঁদের আস্থার অভাব রয়েছে।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই সরাসরি রাশ হাতে নেওয়ার পাশাপাশি গেরুয়া শিবিরের আগ্রাসী মেজাজের প্রমাণ মিলেছে সোমবারই। এদিন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম প্রার্থীতালিকা প্রকাশ করেছে বিজেপি। আর প্রথম তালিকাতেই সবচেয়ে বড় চমক-মুখ্যমন্ত্রীর হাই প্রোফাইল খাসতালুক ভবানীপুর থেকে খোদ শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করা। একসময়ের ছায়াসঙ্গী শুভেন্দুকে এবার নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুর থেকেও জোড়া টিকিট দিয়েছে বিজেপি। রাজনৈতিক মহলের মতে, খাস কলকাতার বুকে মমতা বনাম শুভেন্দুর এই সরাসরি এবং হাই ভোল্টেজ দ্বৈরথের সম্ভাবনা বাংলার এই ব্লকবাস্টার মহারণে আক্ষরিক অর্থেই বারুদ ঠুসে দিয়েছে।

কিন্তু এতসব নেতিবাচক দিক, প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবং বিজেপির আগ্রাসী রণকৌশলের পরেও একটা চরম সত্য মাথায় রাখতে হবে- ‘স্ট্রিট ফাইটার’ মমতাকে কোনওভাবেই খাটো করে দেখা বা হিসেবের বাইরে রাখা চরম বোকামি। খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। তাঁর তূণে সবসময় কোনও না কোনও ব্রহ্মাস্ত্র মজুত থাকে। কখন, কোথায়, কোন বোতাম টিপলে ভোটারদের সহানুভূতি আদায় করা যাবে, তা তাঁর চেয়ে ভালো এ রাজ্যের রাজনীতিতে কেউ জানেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর আসল ভোটব্যাংক শহুরে এলিট বা বুদ্ধিজীবীরা নন; তাঁর শক্তির মূল ভিত্তি হল গ্রামীণ বাংলার নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজ। যাঁদের কাছে সরকারি অনুদান বা প্রকল্পগুলো রোজকার বেঁচে থাকার রসদ। সেই কোর ভোটারদের আবেগ উসকে দিয়ে কীভাবে ভোটের মোড় ঘোরাতে হয়, তা মমতাই সবচেয়ে ভালো জানেন।

সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল বা প্রত্যাবর্তনের লড়াই নয়; এটি বাংলার মানুষের টিকে থাকার, আত্মসম্মানের এবং রাজনৈতিক সচেতনতার এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। একদিকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া আর অন্যদিকে জনমোহিনী প্রকল্পের জাদু—এই দুইয়ের সংঘাতে ব্যালট বক্সে যে এক অভূতপূর্ব ঝড় উঠতে চলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। গোটা দেশ এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে বাংলার এই চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে।

(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *