‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ নেহাত প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়। স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের, ইতিহাসের সঙ্গে স্বপ্নের, শিকড়ের সঙ্গে ভবিষ্যতের এক অন্তহীন কথোপকথনের দিন। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি ভূখণ্ডের শক্তি শুধু তার অর্থনীতিতে নয়; তার উচ্চফলনশীল কল্পনাশক্তির মধ্যেও নিহিত থাকে। লিখছেন দীপ্র ভট্টাচার্য।
মানুষের যেমন জন্মদিন থাকে, ভূখণ্ডেরও থাকে। কিন্তু সব জন্মদিন একরকম নয়। কিছু কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় উদ্যাপনের জন্য লেখা থাকে না; তারা মানুষের চেতনায়, স্মৃতিতে, আত্মপরিচয়ের গোপন অলিন্দে বাসা বাঁধে। ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ তেমনই একটি দিন। ২০ জুন তারিখটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক সীমানার জন্মতিথি নয়; এটি এক জটিল মানসিক সংক্রান্তির দিন, আত্মপরিচয়ের দিন, সাংস্কৃতিক আত্মপ্রত্যয়ের দিন।
আরও পড়ুন:
দিনটিতে বাঙালি আয়নার সামনে দাঁড়ায়। সেখানে সে নিজের মুখ দেখে, আবার নিজ-ইতিহাসও দেখে। দেখে হারিয়ে যাওয়া ভূগোল, ট্রেনের জানালা, নদীর ওপারে ফেলে আসা গ্রাম। আবার দেখে কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের গন্ধ, কফি হাউসের ধোঁয়াটে আড্ডা, নন্দনের অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহ, কিংবা বর্ষার সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে ওঠা একাকী কণ্ঠস্বর। ‘পশ্চিমবঙ্গ’ আসলে একটি রাজ্যের নাম নয়। এটি মানসিক ভূগোল।
আরও পড়ুন:
বাঙালির ইতিহাসে ১৯৪৭ মানে মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকম্প। বাংলা বহুবার শাসক বদলেছে, রাজনীতি বদলেছে, অর্থনীতি বদলেছে। কিন্তু দেশভাগের মতো ঘটনা তার আত্মপরিচয়কে এত নির্মমভাবে আর কখনও স্পর্শ করেনি। কারণ দেশভাগ কেবল জমি ভাগ করেনি, মানুষের স্মৃতি ভাগ করেছে, সম্পর্ক ভাগ করেছে, এমনকী পরিচয়কেও ভাগ করেছে। এই ভাগের আগে একজন মানুষ নিজেকে নিঃসংকোচে ‘বাঙালি’ বলতে পারত। সেই পরিচয়ের মধ্যে নদী ছিল, ভাষা ছিল, লোকগান ছিল, উৎসব ছিল। কিন্তু দেশভাগের পরে ‘বাঙালি’ পরিচয়ের শরীরে যেন এক নতুন বিশেষণ এসে জুড়ে গেল: পশ্চিমবঙ্গীয়। ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে উঠল সেই আশ্রয়ভূমি, যেখানে কিছু মানুষ তাদের হারানো পৃথিবীর স্মৃতি নিয়ে এসে নতুন পৃথিবী নির্মাণ করল। এর মধ্যে রয়েছে বেদনা, ক্ষতি, অভিমান। একই সঙ্গে রয়েছে বেঁচে থাকার দুর্মর ইচ্ছাশক্তিও। ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ সেই অভিযাত্রারও স্মারক।
আসলে বাঙালির অহংকার, সম্পদের নয়, মননের। বাঙালি জাতিকে বোঝার জন্য একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সে অর্থশক্তির চেয়ে মননশক্তিতে বেশি বিশ্বাস করতে শিখেছে।
প্রত্যেক মানুষের ভিতর একটি প্রশ্ন সারা জীবন ঘুমিয়ে থাকে– ‘আমি কে?’ জাতির ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একইরকম সত্য। ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ এলে বাঙালি যেন সে-প্রশ্নের সামনে নতুন করে দঁাড়ায়। কারণ তার পরিচয় সরল নয়। সে একাধারে ইতিহাসের সন্তান, আবার আধুনিকতারও উত্তরাধিকারী। তার এক হাতে রবীন্দ্রনাথ, অন্য হাতে স্মার্টফোন। তার স্মৃতিতে গ্রামবাংলার কুয়াশা, কিন্তু তার বাস্তবতায় মেট্রোরেলের গতি। এই দ্বৈতের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গীয় সত্তার সৌন্দর্য। সে কখনও সম্পূর্ণ অতীতে বাস করে না, আবার সম্পূর্ণ বর্তমানেও নিজেকে বিলিয়ে দেয় না। সে ক্রমাগত শিকড় ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতু নির্মাণ করে চলে। তাই পশ্চিমবঙ্গ দিবস নেহাত সরল উদ্যাপন নয়। আত্মপরিচয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সংলাপ।
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক ভূখণ্ড আছে, যারা অর্থনৈতিক শক্তিতে মহীরুহ হয়েছে। এমনও অনেক সমাজ আছে, যারা সামরিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যে কিন্তু সেই পথ লেখা ছিল না। কিন্তু তার পরিবর্তে এই ভূখণ্ড অন্য এক সম্পদকে অঁাকড়ে ধরেছে: সংস্কৃতি। সময়ের নানা পর্বে বিবিধ রাজনৈতিক টানাপোড়েন এসেছে। শিল্পের সংকট এসেছে। কর্মসংস্থানের উদ্বেগ এসেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এর মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গ তার শিল্পবোধ, সাহিত্যপ্রেম, চলচ্চিত্রচর্চা, বুদ্ধিবৃত্তীয় কৌতূহলকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। ঝড়ের মধ্যেও প্রদীপ বাঁচিয়ে রাখার মতো। এ কারণেই পশ্চিমবঙ্গ অনেকের কাছে একটি সাংস্কৃতিক অভয়ারণ্য।
এখানে বইমেলা এখনও উৎসব। এখানে কবিতার বইয়ের উদ্বোধন হয়। এখানে নাটকের জন্য এখনও মানুষ লাইন দিয়ে টিকিট কাটে। এখানে সিনেমা এখনও কেবল বিনোদন নয়; চিন্তার বিষয়। এসব ঘটনা অর্থনীতির ভাষায় হয়তো গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সমাজের আত্মার পরিচয় বটে।
‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ আমাদের সামনে আর-একটা দায়িত্বকেও তুলে ধরে। সেটা হল: ঐতিহ্যকে উত্তরাধিকার রূপে গ্রহণ করা, কিন্তু তাকে জাদুঘরে বন্দি না করা।
আসলে বাঙালির অহংকার, সম্পদের নয়, মননের। বাঙালি জাতিকে বোঝার জন্য একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সে অর্থশক্তির চেয়ে মননশক্তিতে বেশি বিশ্বাস করতে শিখেছে। হয়তো বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় মেলে না। কিন্তু পরিচয় কেবল বাস্তবতার উপর দঁাড়িয়ে থাকে না; দাঁড়িয়ে থাকে কল্পনা, বিশ্বাস ও আত্মপ্রতিকৃতির উপরেও। বাঙালি তার নিজের যে প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছে, সেখানে ধনকুবেরের চেয়েও কবি বেশি সম্মান পান। অসাধারণ বই কখনও কখনও একটি বহুতল অট্টালিকার চেয়েও বেশি গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে।
এই মানসিকতার শিকড় নবজাগরণে, শিক্ষায়, সাহিত্যচর্চায়। তাই ‘সত্যজিৎ রায়’ নামটি উচ্চারিত হলে বাঙালির চোখে যে আলো জ্বলে ওঠে, তা শুধু একজন চলচ্চিত্রকারের জন্য নয়; তা আপন সাংস্কৃতিক সামর্থের প্রতিফলন। ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র, জীবনানন্দর কবিতা, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা, অমর্ত্য সেনের চিন্তাশীলতা– বাঙালির কাছে ব্যক্তিগত কৃতিত্বের চেয়ে বড় কিছু। ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ সেসব স্তম্ভকে স্পর্শ করার দিন।
পশ্চিমবঙ্গীয় ঘরানাকে যদি ছবিতে প্রকাশ করতে বলা হয়, তবে হয়তো প্রশাসনিক ভবনের ছবি নয়, বরং কফি হাউসের একটি টেবিলের ছবিই বেশি উপযুক্ত হবে। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার স্থাপত্য নয়; তার আলাপ। এখানে তর্ক একটি সাংস্কৃতিক আচরণ। এখানে প্রশ্ন করা অসম্মানের নয়। এখানে আড্ডা যেন সামাজিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব দ্রুততর হচ্ছে, মানুষ ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছে, কথোপকথনের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ এখনও কিছুটা হলেও কথার, ভাবনার এবং মতবিনিময়ের জায়গা ধরে রেখেছে। এই ঐতিহ্যই তাকে আলাদা করে। এই ঐতিহ্যই তাকে জীবিত রাখে।
‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ আমাদের সামনে আর-একটা দায়িত্বকেও তুলে ধরে। সেটা হল: ঐতিহ্যকে উত্তরাধিকার রূপে গ্রহণ করা, কিন্তু তাকে জাদুঘরে বন্দি না করা। নতুন প্রজন্মের কাছে পশ্চিমবঙ্গের অর্থ নতুনভাবে নির্মিত হচ্ছে। তারা বিশ্বনাগরিক, কিন্তু মাতৃভাষার সঙ্গেও যুক্ত। তারা প্রযুক্তিনির্ভর, কিন্তু সংস্কৃতির মূল্যও বোঝে। তাদের কাছে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ কেবল নস্টালজিয়ার নাম নয়, একটি সম্ভাবনার নামও। এই নতুন নির্মাণই আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গকে অর্থবহ করবে।
‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ শুধুমাত্র প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়। স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের, ইতিহাসের সঙ্গে স্বপ্নের, শিকড়ের সঙ্গে ভবিষ্যতের এক অন্তহীন কথোপকথনের দিন। এই দিনটি আবারও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি ভূখণ্ডের শক্তি শুধু তার অর্থনীতিতে নয়; তার উচ্চফলনশীল কল্পনাশক্তির মধ্যেও নিহিত থাকে। পশ্চিমবঙ্গ বহুবার বিপর্যস্ত হয়েছে, বহুবার পিছিয়ে পড়েছে, বহুবার নিজের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তবু সে বারবার ফিরে এসেছে তার সবচেয়ে বড় শক্তি– সংস্কৃতির কাছে, মননের কাছে, সৃষ্টিশীলতার কাছে। সম্ভবত এ কারণেই ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাজ্যের নাম হয়েও কখনও কেবল রাজ্য হয়ে ওঠেনি। হয়ে উঠেছে বাঙালি মানস।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর

