ভারতের সংবিধানের বয়স হয়ে গেল ৭৬ বছর। ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের গণপরিষদ বিআর আম্বেদকরের নেতৃত্বে গঠিত খসড়া কমিটির তৈরি করা সংবিধানকে গ্রহণ করেছিল। সেই সংবিধান এখন শুধু সাবালক নয়, নিজ গুণে বিশ্বে অনন্য স্থান অর্জন করে নিয়েছে। ভারতের সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল নাগরিকের মৌলিক অধিকার। তার অন্যতম অনুচ্ছেদ ২১-এ বর্ণিত জীবনের অধিকার।
সংবিধানে সরাসরি লেখা না থাকলেও নির্মল ও মুক্ত হাওয়ায় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে অন্তর্নিহিত রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলার রায়ে সেকথা জানিয়েছেও। পরিবেশ রক্ষা বিষয়টি আলাদা করে সংবিধানের ৪৮এ এবং অনুচ্ছেদ ৫১ এ (জি)-তে বলা আছে।
সংবিধান ও পরিবেশ রক্ষা আইনের এত সুরক্ষাকবচ থাকা সত্ত্বেও দিল্লি বর্তমানে বিশ্বের সবথেকে দূষিত রাজধানী শহর। প্রতিদিন এই শহরের একিউআই সূচক খারাপ, শোচনীয়, অত্যন্ত বিপজ্জনক থাকছে। দূষণের জেরে রাজধানীর বাসিন্দারা নানা ভয়াবহ রোগে সংক্রামিত হচ্ছেন।
অথচ দিল্লির মানুষের সুস্থ পরিবেশে বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সেই কর্তব্য পালনের পরিবর্তে দূষণের প্রতিবাদ করায় জনগণকে পুলিশি দমনপীড়নের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা চলছে। দিল্লি পুলিশ সুস্থ পরিবেশের দাবিতে আন্দোলনকারীদের যেভাবে মাওবাদী সমর্থক তকমা দিয়ে গ্রেপ্তার করেছে, তা অবিচার তো বটেই।
দিল্লির আবহাওয়া বহুদিন ধরেই খারাপ। দূষণের জেরে মানুষ কার্যত ঘরবন্দি। ঘন ধোঁয়াশার চাদর ঘিরে রাখে রাজধানীর আকাশ-বাতাস। এই দূষণের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রেহাই দেওয়া সরকারের কর্তব্য। সরকারের হাতে ক্ষমতাও আছে। শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি কিংবা পরিবেশ দিবসে গাছ লাগিয়ে সমাজমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিলেই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শেষ হয় না।
কেন দূষণ হচ্ছে, কীভাবে দূষণের হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব, তার পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন করা জরুরি। সবার ঘরে এয়ার পিউরিফায়ার বসানোর ক্ষমতা নেই। দিকে দিকে স্মোক গান ফায়ার করলে দূষণ সাময়িকভাবে প্রতিহত করা সম্ভব মাত্র। কিন্তু এসবের সীমাবদ্ধতা আছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে কৃত্রিম বৃষ্টি নামালেও বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে।
দিল্লিতে সেসব ঠিকমতো হচ্ছে না বলেই মানুষ বাধ্য হয়েছেন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাতে। অথচ শান্তিপূর্ণ নাগরিক প্রতিবাদকে মাওবাদী সমর্থক তকমা লাগিয়ে জাতীয় সুরক্ষার পক্ষে বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে আসলে নজর ঘোরানোর চেষ্টা হল। সুস্থ ও নির্মল হাওয়ায় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিটি মানুষের আছে। সেই অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হলে প্রতিবাদ ছাড়া আর উপায় থাকে না।
কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশ নিজেদের কর্তব্য ভুলে গিয়ে শুধু মাওবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু স্লোগানকে অহেতুক অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য রাস্তায় নামলে রাষ্ট্রশক্তি তখনই মানুষকে বরাবর গণশত্রু হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
তিনটি কৃষি আইনের প্রতিবাদে দেশের কৃযক সমাজের দিল্লির নাকের ডগায় নজিরবিহীন আন্দোলনের সময়েও তাঁদের শহুরে নকশাল, চিন-পাকিস্তানের দালাল, খালিস্তানি বলে অপমান করা হয়েছিল। দেশের অন্নদাতাদের ওপর লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের গোলা ফাটানো হয়েছিল। তাঁরা যাতে দিল্লিতে ঢুকতে না পারেন, সেজন্য সীমানায় বসানো হয়েছিল পেরেক, গজালের চাদর।
কৃষক সমাজের সঙ্গে যা হয়েছিল, দিল্লিতে সুস্থ হাওয়া-বাতাসের দাবিতে আন্দোলনরত নাগরিক সমাজের সঙ্গে সেই একই কাজ হচ্ছে। আনুগত্য স্বীকার না করে কেউ প্রতিবাদের পথে হাঁটলেই দমনপীড়ন, গ্রেপ্তারি জোটে। যেন মানুষের সমস্যাগুলির কোনও দাম নেই। তাই দেশে-বিদেশে সম্মানিত বিশিষ্ট জলবায়ু আন্দোলনকর্মী তথা শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুককে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে কারাগারে আটকে রাখা হয়। পরিবেশপ্রেমী নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকেও কঠোরভাবে দমন করার চেষ্টা চলে। এই অসহনীয় পরিস্থিতি সংবিধান দিবসের মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ণ করেছে।
