পরিবেশনীতির ভিন্ন উচ্চারণ

পরিবেশনীতির ভিন্ন উচ্চারণ

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


 

  • শেষাদ্রি বসু

পুঁজিবাদের আগ্রাসনের সালতামামি নবীন না, কিন্তু তার চরিত্র পালটেছে প্রবলভাবেই এবং রাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন বা সরাসরি সহযোগিতা ছাড়া এই অপ্রতিহত গতি আদৌ সম্ভব হত না। জলাজমি ভরাট করে, বনাঞ্চল নিকেশ করে, পাহাড় ধ্বংস সাধনে পুঁজিবাদের প্রসাধনী রূপ আছে এবং সেই রূপের নাম উন্নয়ন এবং এই উন্নয়নবাদী তকমায় রাষ্ট্রবাদিতার প্রভাব সুস্পষ্ট। ফলে যখনই প্রতিরোধ আসে জনজাতিগুলির কাছ থেকে, তা নির্মমভাবে দমন করা হয়। হিমালয়ের দার্ঢ্য প্রতিম নান্দনিক উপস্থিতির ক্রমান্বয়ে ক্ষয়িষ্ণু দশা বিবেচনাহীন বাঁধ, রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের ফলে এবং এক্ষেত্রে পরিবেশমন্ত্রক বলে একটি বিভাগ আছে বলে শোনা যায়।

হরিতক্ষেত্র, শিক্ষা, নৈতিকতার দ্যোতনায় যে নামটি এখন উচ্চারিত হয় তার পরিচয় বহু বছর আগে রাজকুমার হিরানী, আমির খানের দৌলতে সর্বজনবিদিত; সোনম ওয়াংচুক। উনষাট বছর বয়সি ভদ্রলোক শৈশব থেকেই ভিন্ন ভাবনার অধিকারী এবং সেই কারণেই প্রথাগত শিক্ষায় আকৃষ্ট হতে পারেননি। তাঁর ভাবনায় শিক্ষার মর্মকথা, বহির্বিশ্বের এবং অভ্যন্তরীন চিন্তনের মধ্যে যোগসূত্র গড়ে তোলা, এমনভাবে যাতে ছাত্রছাত্রীরা ধরণীকে আরও বাসযোগ্য, আরও সুন্দর করে তুলতে পারে। শিক্ষা কখনও শুকনো, অনাকর্ষণীয় হওয়া কাম্য নয়, কেননা তাতে আচারসর্বস্বতা বেশি প্রাধান্য লাভ করে। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের ধারাপাতটাই যদি ভুলিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষার অন্তঃসার দিকটা প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শনের পুনঃপাঠই যেন লক্ষ করা যাচ্ছে। সোনম রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন কি না জানা নেই কিন্তু তাঁর ভাবনাকে আত্মস্থ করেছেন খালি তাই নয়, প্রয়োগমুখী করেছেন।

যে হিমালয়কে এশিয়ার জলস্তম্ভ হিসাবে বর্ণনা করা হয়, তার মধ্যেও জলসংকট বিদ্যমান। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধুর বরফশীতল স্রোতধারা এত জনপদকে সিঞ্চিত করে তুলেছে, সভ্যতা গড়ে তুলতে সতত ক্রিয়াশীল, তাতেও সমস্যা। বছর আটেক আগে লেপচাজগৎ-এ  লক্ষ করেছিলাম, এক নেপালি তরুণী নিজেই তাঁর হোমস্টের অতিথিদের জন্যে রান্না থেকে বাসনমাজা সবই করছেন। কাছেই ঝরনার জলে বাসনপত্র যখন সাফ করছিলেন, জিজ্ঞাসার উত্তরে বললেন, ‘রোজ সকাল ১০টা নাগাদ সুখিয়াপোখরি থেকে কালো প্লাস্টিকের ড্রামে জল আসে।’ দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে জলের সমস্যা চিরকালের, সিঞ্চলের হ্রদের জল যথেষ্ট নয়।

সোনম লাদাখে থাকেন এবং শীতল, শুষ্ক অঞ্চলে জলের সমস্যা আরও তীব্র। হিমালয় অঞ্চলে জলের হাহাকারের অন্যতম কারণ হল পরিবেশের পরিবর্তন, ফলে গ্লেসিয়ার গলে যাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু ক্রমান্বয় এই সর্বনাশা লক্ষণের শ্রীবৃদ্ধি ঘটলে নদীর ধারাস্রোতও কমে যাবে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হিমালয়ের গ্লেসিয়ারের পিছু হাঁটার ধরন ক্রমবর্ধমান এবং শতাংশের হিসেবে এখন ২০ শতাংশ। ফলে উৎসই যদি ধীরে ধীরে নির্বাপিত হয়ে যায়, বহতা নদীর পুঁজিও কমে যাবে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের চরিত্র, কৃষিক্ষেত্রের বিস্তার, পর্যটনকেন্দ্রের বৃদ্ধি, শিল্পকেন্দ্রের স্থাপন যা বারোটা বাজিয়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীর কলুষতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মানুষকে ব্রাত্য করে রাখা। সোনমের ভাবনায় শিক্ষানীতিতে স্থানীয়দের গুরুত্ব দেওয়ার যে বৈশিষ্ট্য তা তাঁর জীবনদর্শনে পরিবেশনীতিতে প্রতিফলিত।

আগে যেসব সমস্যা উল্লেখিত তা সবই সোনমের জ্ঞাত এবং তাই তিনি সেভাবেই জলনীতি গড়ে তুলেছেন অভিনব মাধ্যমে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উদ্যোগ আইস স্তূপ। শীতকালে বিশেষ  করে পানীয় জলের সরবরাহ অত্যন্ত কমে যায়; তাই তার প্রতিষেধক বৌদ্ধ স্তূপের আকারে বরফ দিয়ে নির্মিত এই ক্ষণমেয়াদি স্থাপত্য। শীতকালের পড়ন্ত মুহূর্তে এই স্তূপ থেকে ধীরে ধীরে জল চুইয়ে যায় এবং জলের ঘাটতি পূরণ করতে সাহায্য করে। লম্বালম্বিভাবে  নির্মিত কাঠামোটি। স্থানীয়দের সহযোগিতায়, প্রজ্ঞায় এই উদাহরণে মেক ইন ইন্ডিয়ার হুংকার নেই। বিনম্র নিবেদনের সুর আছে। সাধারণত এই ধরনের পরীক্ষা গ্লেসিয়ারের কাছাকাছিই গড়ে তোলা হয়, যাতে স্থায়িত্বের বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত থাকা যায়। অর্থাৎ সোনমের পরিবেশ ভাবনায় এক সমন্বয়বাদী আদর্শের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের অস্মিতার চিহ্ন পাওয়া যায় না, স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের জল সঞ্চয় করে রাখার, গ্লেসিয়ারকে রক্ষা করার ঐতিহ্য আছে। এই ঐতিহ্য অনুপ্রাসে আবার অবৈজ্ঞানিক চিন্তনের জনপ্রিয়তার শঙ্কা থেকেই যায়। কিন্তু সোনম সেই শঙ্কা সম্পর্কে জ্ঞাত। এক সময় ছিল যখন নদীর ঐশ্বর্যে ঘাটতি ছিল না, ওজন স্তর, কারখানা শিল্প এবং সর্বোপরি পরিবেশ দূষণ শব্দবন্ধও আগন্তুক হিসেবেই গণ্য করা হত। কিন্তু ক্রমান্বয় বিবেচনাহীন ব্যবহার পরিবেশের অবনমনের ফলে স্রোতস্বিনী নদীগুলিও ক্ষীণকায় হয়েছে এবং প্রভাব পড়েছে জনপদগুলিতে। সমালোচনা হয় সোনমের প্রকল্পে। ক্রমান্বয়ে উষ্ণায়ন গ্লেসিয়ারগুলিকে যেমন সংকুচিত করছে তৎসঙ্গে নদীগুলিরও ক্ষীণকায় দশা হচ্ছে। ফলে নদীগুলিকে ঋতুকালীন আখ্যায়িত করা ছাড়া উপায় নেই। এছাড়াও আগের চেয়ে তুলনায় কম তুষারপাত নদীর মূল উৎসকে নিকেশ করছে। এক সময়ে মনে হয় বিশেষ করে হিমালয়ের নান্দনিক আয়োজনগুলি দুর্গম থাক, তাতে অন্তত পবিত্রতা বজায় থাকে। বেশি পর্যটকদের ঢল স্থানীয়দের রোজগারের বৃদ্ধি করে কিন্তু অসংবেদনশীলতার চিহ্নও রয়ে যায়।

যে সমস্ত দাবির ভিত্তিতে সোনমের দাবি ছিল তার মূলে ষষ্ঠ তফশিলের দাবি লাদাখের জন্যে। ষষ্ঠ তফশিলের মাধ্যমে  আরও স্বায়ত্বশাসনের অধিকার লাভ করবে স্থানীয়রা অর্থাৎ জমি, জল, অরণ্য, পরিবেশ সম্পর্কে যে তাদের চিরাচরিত অধিকার আছে তা নিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারকে যাতে হিমবাহ নীতি অবলম্বন করা হয়, যাতে শিল্প, পর্যটনের অছিলায় লাদাখের চরিত্র পালটে না ফেলা হয়। এক ধাঁচের ভাবনার অধিকারীদের সমস্যা, তাঁরা নিজে যা বোঝেন এবং আরও স্পষ্ট করে বলা যায় পুঁজিপতিরা যা ভাবান, তাই বোঝেন। রোমিলা থাপার পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালদের গুরুত্ব  সম্পর্কে  লিখেছিলেন অর্থাৎ  যাঁরা দলমতের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাষ্টের রক্তচক্ষুর তোয়াক্কা না করে সত্যিটা বলতে পিছু হটেন না। একদা নরেন্দ্র মোদির প্রিয় সোনম এখন দেশদ্রোহী তাঁর ভিন্ন স্বরের জন্যে। এত বড় পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালের উদাহরণ এই মুহূর্তে বিরল। শতফুল বিকশিত হওয়ার চরৈবেতি মন্ত্র আরও প্রস্ফুটিত  হোক।

(লেখক পরিমল মিত্র স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *