- অভিষেক বোস
আপনি অযথা খিস্তির নাম শোনেননি?
আগাথা ক্রিস্টি?
ধুৎ মশাই। সে তো লেখিকা। ইনি হলেন শিল্পী। অযথা খিস্তি। ক্রিস্টি নয়। তবে চাইলে কৃষ্টি বলতে পারেন। এটাই এখন সঙোসকিতি। উনিই আমাদের টিম লিডার।
গালাগালি? টিম লিডার?
খামোখা গালাগালি নিয়ে পড়লেন কেন?
এখানে কাউকে ছুরি চালানো হয় না। কিবোর্ড দিয়ে কুচিকুচি করে দেওয়া হয়।
মানে?
মানে ধরে নিন, এই আপনি আর আমি কথা বলছি। এখন আমি ভদ্দরলোকের মতো কথা বলছি। কিন্তু যখন সোশ্যাল মিডিয়াতে ঢুকব, তখন আমিই একজন ডিজিটাল ক্রিমিন্যাল। প্রথমেই বেছে নেব উঠতি লেখিকা, আর্টিস্ট কিংবা একটু নরমসরম কোনও মানুষকে। একদম অচেনা কোনও লোককে। তারপর দল বেঁধে এসে উল্লাট গালাগালি… নোংরা নোংরা ভাষায়।
অচেনা লোককে!
লোক, বালক, বিটি হোক কিংবা সেলেব্রিটি। আমাদের কাছে সব এক। ভাষার বাঁধন খুলে দেব।
আপনারা কি উন্মাদ?
উন্মাদ কেন হতে যাব। আমরা হেরো। এই দেখুন, ৫৫ বছর বয়স হল। আজ অবধি কোথাও জিততে পেরেছি? বাবা, ভাই, বৌ, বাস কনডাক্টর, পানের দোকান, অফিসের বস? কারও কাছে মুখঝামটা না খেয়ে ফিরেছি? আর এখানে দেখুন, খিস্তির খামার খুলে বসে আছি।
খারাপ লাগে না?
খারাপ লাগবে কেন? আপনি মাইরি আচ্ছা ন্যাকা। একমাত্র গালাগালি লোকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেয়। হাসিকান্না সব লোকদেখানো।
আমাদের অযথা খিস্তিদাকে দেখুন। বাসে উঠলে, সামনের লোককে বলে, ‘দাদা আপনি আগে নামুন।’
কিন্তু অনলাইনে, গালির গডফাদার।
একটা অচেনা লোককে দল বেঁধে গালি দিলেন। হতেই পারে মানুষটা হয়তো নিতে পারল না।
ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড দাদা। কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ, সংসারোহয়মতীববিচিত্রঃ। এই তো সেদিন, অফিসের টিফিন টাইমে ফেসবুকে ঢুকে একজন বয়স্ক অভিনেতাকে নোংরা নোংরা গালাগালি করলাম। বুড়ো হাবড়াটা বেশি রাজনীতি কপচাচ্ছিল। বাড়ি ফেরার পথে, মনে একটা পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছিল। সেদিন মাইরি খুশির চোটে শিঙাড়া কিনে বাড়ি ঢুকলাম।
ছিঃ!
এই দেখুন, আপনার এখন আমাকে গালি দিতে ইচ্ছে করছে। দিয়ে দিন। দেখবেন ভালো লাগছে। আর যদি এখন না দিতে পারেন, বাড়ি ফিরে সময় সুযোগমতো ফেসবুকে ঢুকে ঝেড়ে দিন। দেখবেন মনটা হালকা লাগছে। একবার ভাবুন, এখানে কোনও ফি দিতে হয় না, একেবারে ফ্রি। শুধু একটা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট থাকলেই ঢুকে পড়া যায়। কোনও বয়সসীমা নেই, স্কুলের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত দাদু, সবাই মুখ খারাপ করে গালি দিচ্ছে। সামনাসামনি গিয়ে দেখবেন- কিচ্ছুটি জানে না। সুবোধ লোক।
আর আপনাদের সেই অযথা খিস্তি। উনি তো নিজেই সেলেব্রিটি। উনি কেন গালি দেন?
দাদার কথা আর বলবেন না। দাদা বলেন কি জানেন তো, আপনি যুক্তি দিতে পারেন না? আপনার কাছে কোনও তথ্য নেই?
আপনার জানার কোনও ইচ্ছেও নেই, কোনও চিন্তা নেই! টুকুস করে স্রেফ চারটা কাঁচা খিস্তি দিয়ে সাজিয়ে, একটা কমেন্ট করে দিন। ব্যাস!
এই তো গত বছর একজন লেখিকার একটা বইয়ের প্রচ্ছদ প্রকাশ অনুষ্ঠানের পোস্টের স্ক্রিনশট নিয়ে, এমন নোংরা নোংরা কথা লিখলেন, যে রাতারাতি ওই লেখিকা বদনাম হয়ে গেল। তিনদিনের মাথায় মহিলা সুইসাইড করতে গেছিল। একে বলে ট্রোলিং। পুরোটাই অনলাইন।
কেন করলেন আপনাদের দাদা, এরম?
কেন আবার কী? দাদার এটাই কাজ। সবাই কত প্রশংসা করল জানেন। আমাদের পুরো কমিউনিটি দাদাকে সেলাম জানিয়েছে।
আর সেই মহিলা?
কপালজোরে বেঁচে গিয়েছেন। তবে দাদাকে দেখে আমাদের আরেক ভাই বন্ধু, এক ফিল্ম এডিটরকে খিস্তি করেছিল। ত্যাঁদড় লোক। উলটে বলল, ভালো কিছু শিখে আয়। কদ্দিন আর এক মা-বাপের গালাগালি চালাবি। ছোকরা সেদিন ভাত অবধি মুখে তোলেনি। এত মুষড়ে পড়েছিল।
আপনাদের বন্ধু মুষড়ে পড়ল। গালি দিয়ে?
গালি দিয়ে কোনও রেসপন্স না পেয়ে।
অদ্ভুত তো!
অদ্ভুত কেন বলুন তো! আপনি একটা কাজ করলেন, অথচ কাজের স্বীকৃতিটা পেলেন না। কেমন লাগবে?
কাজ?
কাজ না? একটা নামকরা মানুষকে অনলাইনে গালাগালি দিলেন। অথচ আপনার টিকিটি কেউ ধরতে পারল না। পুরো কাজটা নিঃশব্দে সেরে ফেলে, আবার মানুষের ভিড়ে মিশে গেলেন।
সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর মানুষ ভেবেছিল, ‘আহা, এ তো এক নতুন মুক্তমঞ্চ! এখানে মানুষ নিজের মতামত জানাবে, জ্ঞানের আলো ছড়াবে, বন্ধুত্ব গড়বে।’ আমরা পুরো অ্যাড্রিনালিন রিলিজের প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে দিলাম। এটা কাজ না? বিনে পয়সার অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস। বাঞ্জি জাম্পিঙের মতো। খাদের অতলে ঝাঁপ মেরে একজন মানুষকে নোংরা নোংরা গালি দিয়ে, নিরাপদে ফিরে চলে আসা।
আপনাদের পরিবারের লোকেরা জানে, আপনাদের চেহারার থেকেও আপনাদের মুখটা বেশি নোংরা?
সবার না। কয়েকজনের জানে। আমরা গালি দিচ্ছি কারণ আমরা সত্যি বলি। সত্যি মানেই নোংরা। মিথ্যে কথা শুনতে সুন্দর। মেহনতি মানুষের মুখের ভাষা ভদ্দরলোকদের রোচে না।
এটাই আপনাদের যুক্তি?
কেন আমাদের যুক্তি থাকতে নেই। অযথা দা কী বলে জানেন? ‘গালি হল প্রতিবাদের ভাষা।’
কীসের প্রতিবাদ? কোন মত, কোন দলের বিরুদ্ধে আপনাদের প্রতিবাদ?
আপনি কি আমাদের পার্টির লোক ভাবলেন নাকি! আমাদের কোনও দল নেই, কোনও মত নেই। আমরা ওসব ডান-বাম কিছু নই। আমরা নিরপেক্ষ। লোডশেডিং ছাড়া কাউকে ভয় করি না।
লোডশেডিং কোত্থেকে এল?
লোডশেডিং হলে মোবাইলে চার্জ করা যায় না। গত বছর ঝড়ের সময় কী যে অসুবিধেই পড়েছিলাম। তিনদিন ধরে কারেন্ট ছিল না। অশ্রাব্য সব গালাগালি পেটের মধ্যে কিলবিল করছিল। গ্যাসের মতো জমে উঠছিল। কিন্তু সামনাসামনি যে কাউকে গালি দেব, সেই মুরোদ নেই। শেষে ওই ফুস করে একটা ছাড়তে গেছিলাম, একটা কলেজের বাচ্চা মেয়ে, ঠাসিয়ে চড় মারল। সেই প্রথম টের পেলাম, গালি না খেয়ে, গালে খেলেও কান লাল হয়ে যায়।
আফসোস হয় না। অনুতাপ?
একবার হয়েছিল। ওই অনুতাপ। তবে খুব একটা তাপউত্তাপ কিছু ছিল না। জলদি সামলে উঠেছিলাম।
কীরম শুনি।
একদিন এক বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে কুৎসিত কুৎসিত গালি দিলাম। মেয়েদের স্বাধীনতা নিয়ে জ্ঞান ঝাড়ছিল। গালি দিয়ে বললাম – ‘প্রধাননগরে আয়, তোকে …।’ মহিলা শান্ত হয়ে উত্তর দিল, ‘এটুকু করলে কি আপনি নারী স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াবেন? তাহলে আসছি। বলুন প্রধাননগরের কোন জায়গায়, কটায় আসতে হবে।’
অপ্রত্যাশিত উত্তরটা আসার পর খেয়াল করলাম, ভদ্রমহিলা আমার মায়ের বয়সি। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল জানেন? চুপ করে ছিলাম। উনি আবার কমেন্ট করলেন, ‘কী হল বললেন না, কখন আসতে হবে?’
আমতা-আমতা করে লিখেছিলাম- ‘আমি তো এমনিই বলেছিলাম। সত্যি সত্যি কি আর ও’রম কিছু করব।’
কেন বলেন তাহলে?
কেন বলব না বলুন তো। আমরা না ভালো গায়ক, না ভালো শ্রোতা। না ভালো লেখক না পাঠক। না অভিনেতা না দর্শক। আমরা জাস্ট অ্যানোনিমাস। আমরা এইভাবেই ভ্যালিডেশন জোগাড় করি। এই যে আপনি এতক্ষণ ধরে আমাকে বুঝতে চাইছেন, তার একটাই কারণ। আমরা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে নোংরা গালাগালি করি। নইলে জানতেও চাইতেন না, আমি কে? এটাও তো একরকম ফিয়ার অফ মিসিং আউট সিনড্রোম। আপনারা যাকে ফোমো বলেন। মানুষের মতো দেখতে হলেও আমরা হোমো সেপিয়েন্স না, ফোমো সেপিয়েন্স। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের মুক্তমঞ্চ। ওই যে বললাম, আমরা জাস্ট অ্যানোনিমাস। অ্যানোনিমিটিই আমাদের হাতিয়ার।
