দেবাশীষ সরকার
প্রকৃতিতে সে এক আশ্চর্য জাদুকর। বিজ্ঞানীদের ভাষায় সে এক অদ্ভুত সত্তা— কেউ বিদ্যুৎকে অনায়াসে নিজের ভেতর দিয়ে বইতে দেয়, কেউ বা দেয় না। কিন্তু এই দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক রহস্যময় উপাদান আছে, যার নাম ‘সেমিকনডাক্টর’ বা অর্ধপরিবাহী। সে অনন্য, কারণ তার কাছে রয়েছে ‘সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার এক অলৌকিক ক্ষমতা। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অতিসাধারণ বালুকণা থেকে উঠে আসা এই সিলিকন যখন মানুষের মেধা আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রাণ পায়, তখন সে নির্ধারণ করে সভ্যতার ভবিষ্যৎ গতিপথ। আধুনিক পৃথিবীতে শক্তির সংজ্ঞাই এখন বদলে গিয়েছে। যুদ্ধ এখন আর কেবল সীমান্তে নয়, যুদ্ধ চলে কে কত দ্রুত আর নির্ভুলভাবে ডিজিটাল সিদ্ধান্ত নিতে পারছে— তার ওপর। ১৯৪৭-এর সেই আদি ট্রানজিস্টার থেকে আজকের কয়েক লক্ষ কোটি ট্রানজিস্টর সমৃদ্ধ ‘মাইক্রোচিপ’— আসলে আমাদের যাপনের চাকা এখন এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চিপের পকেটে বন্দি।
ডিজিটাল সভ্যতার প্রাণভোমরা ও বিশ্ব বাজারের অঙ্ক
আজকের বিশ্ব পুরোপুরি কম্পিউটার ও ডেটা নির্ভর। ফলে যে দেশের দখলে যত উন্নত চিপ প্রযুক্তি, বিশ্ব রাজনীতি আর ভূ-কৌশলগত অবস্থানে তার পাল্লা ততটাই ভারী। এটি এক অত্যন্ত সরল অথচ কঠোর সমীকরণ। বিশ্ব অর্থনীতির গণিত বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সেমিকনডাক্টরের বাজার ছিল প্রায় ৭০ হাজার কোটি ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬৩ লক্ষ কোটি টাকার সমান। বিস্ময়কর তথ্য হল, মাত্র এক বছর পার করে ২০২৬ সালেই এই বাজার ৮০ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ এই অঙ্ক আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১৩০ লক্ষ কোটি টাকায়।
ভারত এই বিশাল যজ্ঞের এক অন্যতম প্রধান ঋত্বিক হতে চায়। ভারতের নিজস্ব সেমিকনডাক্টর বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৯ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। তবে ভারতের দীর্ঘদিনের একটি গভীর ক্ষত ছিল— আমদানি নির্ভরতা। আমরা চিপ ব্যবহার করতাম প্রচুর, কিন্তু দেশের মাটিতে তা বানানোর সাহস বা পরিকাঠামো ছিল না। অথচ একটি চমকপ্রদ তথ্য আমাদের গর্বিত করে— গোটা বিশ্বে চিপের ‘নকশা’ বা ডিজাইনের নেপথ্যে যে মেধা কাজ করে, তার প্রায় ২০ শতাংশই ভারতীয় প্রকৌশলী। অর্থাৎ মেধা ভারতের, কাঁচামাল বা বালুও হাতের কাছে— শুধু অভাব ছিল উপযুক্ত পরিবেশের। এই বৈপরীত্য ঘোচাতেই ভারত এখন পা বাড়িয়েছে ‘সিলিকন রুট’-এ।
ইন্ডিয়া সেমিকনডাক্টর মিশন : এক নতুন যুগের পদধ্বনি
২০২১ সালটি ভারতের প্রযুক্তির ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সে বছর কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা থেকে ‘ইন্ডিয়া সেমিকনডাক্টর মিশন’ বা আইসিএম-এর ছাড়পত্র মেলে। প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজেট ঘোষণা করে সরকার বুঝিয়ে দেয় যে ভারত এখন এই দৌড়ে অত্যন্ত সিরিয়াস। আইসিএম একটি কেন্দ্রীয় সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করছে, যার লক্ষ্য হল সেমিকনডাক্টর তৈরির বিভিন্ন ধাপে নিযুক্ত দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক ভরতুকি দেওয়া। এরই সুফল হিসেবে ২০২৩ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে দেশের মাটিতে ১০টি মেগা প্রকল্পের অনুমোদন এসেছে, যেখানে মোট লগ্নির পরিমাণ ১.৬ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।
এই মহাযজ্ঞের প্রধান জ্বালানি হল দক্ষ জনশক্তি। শুধুমাত্র কলকারখানা বসালেই হবে না, প্রয়োজন লক্ষ লক্ষ কুশলী হাত। সেই লক্ষ্যে ‘অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিকাল এডুকেশন’ ইতিমধ্যেই আইসি বা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট তৈরির বিশেষ পাঠ্যক্রম চালু করেছে। আগামী দশকে ৮৫ হাজার দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। কালিকটের আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার প্রকৌশলী প্রশিক্ষিত হয়ে বেরিয়েছেন। ২০২৫ সালে নয়ডা ও বেঙ্গালুরুতে ৩ ন্যানোমিটারের মতো অত্যন্ত আধুনিক চিপের নকশা করার কেন্দ্র উদ্বোধন করে ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে, লড়াইটা শুধু উৎপাদনের নয়, মেধার শ্রেষ্ঠত্বেরও।
লগ্নির ভূমি ও মেগা প্রোজেক্টের কর্মযজ্ঞ
ভারতের এই চিপ-বিপ্লবের প্রধান সারথি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে টাটা গোষ্ঠী। গুজরাটের ঢোলেরাতে তাইওয়ানের বিখ্যাত ‘পাওয়ার চিপ সেমিকনডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কর্পোরেশন’-এর সঙ্গে যৌথভাবে প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠছে এক বিশাল সিলিকন সাম্রাজ্য। এখান থেকে প্রতি মাসে উৎপাদন হবে ৫০ হাজার ‘সিলিকন ওয়েফার’, যা চিপ তৈরির মূল ভিত্তি। অন্যদিকে, উত্তর-পূর্ব ভারতের আসামের জাগিরোডে টাটার ২৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি হবে এক অনন্য কেন্দ্র। সারা বিশ্ব থেকে আসা কয়েক কোটি চিপের গুণমান যাচাই এবং পরীক্ষার গুরুভার থাকবে ‘টাটা সেমিকনডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্ট’ বা টিএসএটি কোম্পানির ওপর।
গুজরাটের সানন্দ এখন ভারতের সেমিকনডাক্টর হাবে পরিণত হয়েছে। আমেরিকার ‘মাইক্রন টেকনলজি’ সেখানে ২৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যার কারখানা তৈরির কাজ ২০২৬-এর শুরুতেই পূর্ণগতিতে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ‘কেনেস সেমিকন’-এর ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লগ্নির প্রকল্পটিও দ্রুত রূপ নিচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের জেওয়ারে ‘এইচসিএল’ ও ‘ফক্সকন’-এর হাত ধরে গড়ে উঠছে আরও এক ওয়েফার উৎপাদনকেন্দ্র। এই প্রতিটি নাম ভারতের শিল্প-মানচিত্রে একেকটি সাফল্যের স্তম্ভ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভবিষ্যতের বাজার সমীকরণ
কেন এই বিপুল আয়োজন? কারণ আগামীর চাহিদা কোনও ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। স্কুলের সাধারণ প্রবন্ধ লেখা থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণার জটিলতম অঙ্ক— আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো জীবনের অঙ্গ। আর এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফুসফুস হল এই মাইক্রোচিপ। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৫জি টেলিকম এবং পরিবেশবান্ধব ইলেক্ট্রিক গাড়ি বা ই-ভেহিকল-এর জনপ্রিয়তা। একটি ইলেক্ট্রিক গাড়িতে যে পরিমাণ চিপ লাগে, তা সাধারণ গাড়ির কয়েকগুণ। ফলে ভারতের এই প্রকল্পগুলো যে এক বিশাল তৈরি বাজার হাতের মুঠোয় পাবে, তা নিশ্চিত।
বাজারের এই উজ্জ্বল সম্ভাবনা লগ্নিকারীদের মধ্যেও এক উন্মাদনা তৈরি করেছে। লগ্নিকারীদের কাছে শুধু উৎপাদনের লভ্যাংশ নয়, কোম্পানির ‘মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন’ বা বাজারমূল্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে দেখা গিয়েছে, চিপ তৈরির শীর্ষ ১০টি কোম্পানির বাজারমূল্য তাদের মোট উৎপাদনের তুলনায় ১৩ গুণ বেশি। অর্থাৎ, লগ্নিকারীদের লাভের অঙ্ক এখানে আকাশচুম্বী। তাই লগ্নির এই জোয়ার সহসা থামার কোনও সম্ভাবনা নেই।
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও সোনা-বাঁধানো সিঁড়ি
তবে এই ‘অতি সুমধুর’ চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু কঠিন সত্য। বিশ্ব বাজারের সিংহভাগ আজ আমেরিকার দখলে, আর উৎপাদনের শক্ত ঘাঁটি হল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। তারা কেউ বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও ভারতকে ছেড়ে দেবে না। ভারতের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হল একদিকে লাল ফিতের ফাঁস থেকে মুক্তি পাওয়া, আর অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির যুগেও সাধারণ মানুষের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
সেমিকনডাক্টর শিল্প মূলত যান্ত্রিক উৎকর্ষের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু সেই যন্ত্রের পেছনে থাকা ভারতীয় শ্রমিকের হাত যেন অবহেলিত না হয়। ভারতের লড়াইটা তাই শুধু প্রযুক্তির নয়, লড়াইটা আত্মমর্যাদার। যদি আমরা মেধা, পরিকাঠামো এবং সরকারি সদিচ্ছাকে এক সুতোয় বাঁধতে পারি, তবেই সামনে সোনা-বাঁধানো সিঁড়ি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সিলিকন চিপ আজ প্রমাণ করে দিয়েছে— আকারে ক্ষুদ্র হলেও তার ক্ষমতা অসীম। ইতিহাস যখন সিলিকন দিয়ে লেখা হচ্ছে, তখন ভারত আর শুধু সেই ইতিহাসের পাঠক থাকতে রাজি নয়; সে এখন নিজের ভাগ্য লেখার কলমটিও হাতে ধরতে প্রস্তুত। রাজনৈতিক স্তুতির চেয়েও বড় প্রয়োজন এখন নিবিড় প্রস্তুতি— যাতে ভারতের এই ‘ম্যাক্রো’ দৌড় বিশ্বজয়ে সফল হয়।
(লেখক সাংবাদিক)
