নতুন খেলার খোলা মাঠ… – Uttarbanga Sambad

নতুন খেলার খোলা মাঠ… – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


শিশির রায়নাথ

জীবন নাকি শুরুই হয় ষাট বছর বয়স থেকে। কথাটা কেউ মানেন, কেউ মানেন না। যাঁরা মানেন না– তাঁদের না-মানাই থাক। সব মানলে হয়তো নষ্ট জীবন।  কিন্তু যাঁরা মানেন, শিব্রামীয় ভাষায়  যাঁরা ‘মানেন-সই’,  তেমন কয়েকজন  ‘সই’ বা বন্ধুকে নিয়েই আজকের গপ্পো। এইসব ‘সই’-য়ের সবার মুখেই একটা জুতসই  কথা আছে যে,  বয়স একটা সংখ্যা মাত্র  এবং ‘রিটায়ারমেন্ট’ বলে কিছু হয় না;  জীবনের তিনটেই ভাগ : প্রি-সার্ভিস, ইন-সার্ভিস আর পোস্ট-সার্ভিস। এঁদেরই কেউ কেউ আবার আর্নল্ড সোয়ারজেনেগারের মতো বলেন– আমরা পুরোনো কিন্তু বাতিল নই।

এই পোস্ট-সার্ভিসদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে এক  ‘ম্যাডাম’-এর গল্প যাঁর সঙ্গে হঠাৎই আলাপ এক পাহাড়ি জনপদে। তিনি ছিলেন কলকাতার এক নামী পত্রিকার সাংবাদিক। স্বামী অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক অফিসার, মেয়েও কর্মরতা। কলকাতার ভিড়-ভাড়াক্কা আর নামী-দামি মানুষদের সঙ্গে ওঠা-বসার মধ্যেই তাঁর বুকের ভিতরে কবে যেন একটু একটু করে গড়ে উঠছিল এক  শান্ত-নির্জন পাহাড়ে, সরল-সাদামাঠা মানুষজন-ঘেরা একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ির ছবি, যেখানে থাকা যায় একা একা, আপন মনে। এরকম বাসনার কথা জেনেছি বিদেশিদের লেখাপত্রে, সিনেমায়; তা বলে  সংসারে আগাপাশতলা জড়িয়ে-মড়িয়ে থাকা একজন মাছ-ভাত-খেকো বিশুদ্ধ বাঙালি মহিলা! তাও ষাট বছর বয়স পার করার পর!! কিন্তু সত্যিই তাই ঘটেছে। চাকরি থেকে অবসরের পর, শুধুমাত্র  নিজের মতো করে বাঁচতে  তিনি চলে এসেছেন এই পাহাড়ে। স্বজন-শুভার্থীদের হাজার সাবধানবাণী, ভয়-ভীতি, মাছের-লোভ কিছুই টলাতে পারেনি তাঁকে। এক বন্ধু্র সাহায্যে পেয়েছেন একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ি। সেখানেই থাকেন এখন নিজের মতো। হাতে আছে পেনশন আর ফ্রিল্যান্স লেখালেখির পয়সা।  ভরা বর্ষায়  ঘরের মধ্যে সাপ ভেসে আসে জলের সঙ্গে, রাস্তা ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বাইরের পৃথিবী। তবু তিনি থাকেন সেখানেই, নিজের মতো করেই।  এই মানুষটির জন্যই কেউ হয়তো একদিন লিখে ফেলেছে দুটো লাইন- নিজের হাতেই ভেঙে দিলাম নিজের সোনার খাঁচা/ এবার শুধু নিজের জন্য নিজের মতো বাঁচা।

বিষ্ণু দে একটি কবিতায় লিখেছেন– ‘চম্পা, তোমার অবিনশ্বর প্রাণ/এ কোন হিরণ মায়ায় রেখেছো ঢেকে/খুলে দাও মুখ, রৌদ্রে জ্বলুক গান।’ আমার কয়েকজন   ঘনিষ্ঠ-স্বজনের গল্পও  ঠিক এরকমই।  চাকরির শুরুতে তাদের একজনের  নেশা ছিল ছড়া লেখা আর কুটুম-কাটাম এবং ভাস্কর্য। সঙ্গে বেহালাও শিখত। সংসার আর বদলি-চাকরির চাপে  ‘কফি হাউসের আড্ডার’ মতো কোথায় হারিয়ে গেল সেসব ‘সোনালি দিন’। দিনগুলো হারাল কিন্তু মনের ভিতরের সৃজনশীল সত্তাটুকু হারাল না- চাপা পড়ে থাকল চম্পার অবিনশ্বর প্রাণের মতো। আর সেই মুখ খুলে রৌদ্রে জ্বলা গান জেগে উঠল রিটায়ারমেন্টের পর। এখন  একদিকে যেমন ধারাবাহিকভাবে তার কবিতা, গল্প, উত্তর সম্পাদকীয় প্রকাশ হয়ে চলেছে নানা সুনামী পত্রপত্রিকায় তেমনি সে এখন বুঁদ হয়ে  আছে ভাস্কর্যের ভিতর। ভাস্কর্য নিয়ে একটা বইও লিখে ফেলেছে ইতিমধ্যে। ছড়া নিয়েও।  সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি-জীবন ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন এক জীবন তার এখন।

আর এক ঘনিষ্ঠ-স্বজন ছিল এক উচ্চপদস্থ বনাধিকারিক। স্কুল-কলেজের সময় থেকেই গল্প-কবিতা লেখার শখ ছিল। কিন্তু চাকরি নিয়ে, লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, গহন অরণ্যের ভিতর দ্রুতই হারিয়ে গেল সেসব শখ। এদিকে মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করে নিজের চোখে দেখা জঙ্গলের কত ঘটনা, কত চরিত্র- সেখানে ছেলের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের চাহিদায় না-বুঝে অপরাধে জড়িয়ে পড়া সরল বুনো মানুষ যেমন আছে, তেমনি আছে প্রশাসনের সর্বোচ্চ চরিত্রের সঙ্গে ওঠা-বসা, রাজনীতির সর্পিল চলন। কিন্তু লেখার সময় নেই।  অবশেষে, ষাট পার করেই, অন্য নানা চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেই, সে শুরু করে লেখা। বন, বন্যজীবন, পরিবেশ নিয়ে সাধারণ লেখালাখির পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদপত্রে উত্তর সম্পাদকীয়। আবার বন-জীবনের বাস্তব ঘটনা ও চরিত্র নিয়ে লিখে ফেলেছে এমন দু’দুটো উপন্যাস যেগুলোর বিষয়বস্তু বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ নতুন। জীবনের এই নতুনত্বই তো নতুন জীবন।

এক বন্ধু ব্যাংক অফিসারের  ছিল  বই পড়ার নেশা।   আগে ছিল অমনিভোরাস রিডার, এখন সিলেক্টিভ। এখন তার মূল পড়াশোনা  আদিম মানুষের পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস নিয়ে–  যে ইতিহাসকে জেনেটিক্স বর্তমানে নতুন মাত্রা দিয়েছে, দিচ্ছে। সেই টানে সে ছুটে যায় ভীমবেটকায়। স্পেনের আলতামিরার মতো এখানেও আছে প্রচুর গুহাচিত্র যা বারো হাজার বছরের পুরোনো। সেখানে পাথরের গায়ে এক প্রাচীন হাতের ছাপের ওপর হাত রাখতেই এক অবর্ণনীয় শিহরন। সুদূর রহস্যময় অতীত আর বর্তমান যেন এক বিন্দুতে থমকে দাঁড়ায়। মনে পড়ে সুধীন্দ্রনাথ- একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণিজুড়ে, থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি।

একই শিহরন ফিরে ফিরে  আসে সিন্ধুসভ্যতার জীবন্ত ইতিহাস  ধলাভীরা, লোথাল আর রাখিগড়ির ধ্বংসাবশেষের ভিতর দিয়ে হাঁটার সময়। রাখিগড়িতে এখনও মাটির ওপরে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য  পোড়ামাটির তৈরি চুড়ির  টুকরো, কানের দুল, মালার পুঁতি, ভাঙা হাঁড়ি। তার ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুটির মনে হয়- কে জানে,  হাজার হাজার বছর আগে তারই কোন এক পূর্বপুরুষ  হয়তো এখানেই পেতেছিল সংসার; হয়তো ওই ভাঙা হাঁড়িতে তাকে ভাত রেঁধে খাইয়েছিল তার প্রিয় কোনও এক মানুষী।

সেই বন্ধুর আক্ষেপ- এখনও তো দেখা হল না অন্ধ্রপ্রদেশের জ্বালাপুরম, যেখানে ৭৫ হাজার বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার টোবা আগ্নেয়গিরির ছাই উড়ে এসে ঢেকে দিয়েছিল একদল আদিম মানুষের বসতি। বহু পরে সেই ছাই-এর ওপরে এসে  আবার আস্তানা গেড়েছিল আরও একদল আদিম মানুষ। তারা দু’দলই বানিয়েছিল নানারকম ‘মাইক্রোব্লেড’। কিন্তু তারা কারা ছিল, হোমো ইরেকটাস নাকি হোমো সেপিয়ান্স? নাকি  দেনিসোভা? এরকম শয়ে শয়ে প্রশ্ন তাকে রাতের পর রাত জাগিয়ে রাখে কম্পিউটারের সামনে– ইন্টারনেটে নতুন আবিষ্কারের খবর কী আসে কে জানে! ডেবিট-ক্রেডিট-লোন প্রসেসিং-জেনারেল লেজারের বাইরে এ তো এক নতুন জীবনই তার– যা এতদিন ছিল অধরা।

এবার যে বন্ধুর কথা তার নেশা ভ্রমণের। চাকরির একদম শুরুতে মা-কে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিল কেদারনাথ-বদ্রীনাথ। বদ্রীনাথে গিয়ে জানা গেল সেখান থেকে সামান্য কিছু দূরে ভারতের শেষ গ্রাম মানা আর  বসুধারা জলপ্রপাত– যেখান দিয়ে পাণ্ডবেরা হেঁটে গিয়েছিল স্বর্গের দিকে।  ফেরার পথে  বাস থামল গোবিন্দঘাট-এ। সহযাত্রীদের কথোপকথন থেকে জানা গেল এখান থেকেই পায়ে হেঁটে  যাত্রা শুরু হয়  ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স’-এর। ওর পাশেই বরফ-মোড়া পাহাড়ের চূড়ায় শিখ সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান ‘হেমকুণ্ড সাহিব’- যেখানে মাত্র তিন-চার মাসের জন্য ফোটে বিরল নীলপপি আর ব্রহ্মকমল। এই ফুল দুটোর কথা সে পড়েছিল  ‘সুন্দরডুঙ্গা’ অভিযানের ভ্রমণকাহিনীতে। কিন্তু হাতে অতিরিক্ত সময় আর অর্থ  না থাকায় মনের দুঃখ মনে চেপেই ফিরতে হয়েছিল সেবার।

এরপর থেকে শুধুই অপেক্ষা। আর স্বপ্ন দেখা। দিন কাটে দিনের মতো। সেখানে যাবার যখন  সুযোগ হয় তো সঙ্গী জোটে না। সঙ্গী জোটে তো ছুটি নেই। সঙ্গী আর ছুটি একসঙ্গে যদি বা মিলল-  বাড়িতে অসুবিধা। তারপর বিয়ে-থা, সংসার, সন্তানের পড়াশোনা, চাকরিতে ঘনঘন বদলি এসব করতে করতেই কবে যেন পার হয়ে গেল ‘ষাট’। এবার মুক্তি। প্রথমেই ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স আর হেমকুণ্ড; অঢেল ব্রহ্মকমল আর নীলপপির মুগ্ধতা। তারপর বদ্রীনাথ, মানাগ্রাম হয়ে বসুধারা ফলস। পাণ্ডবদের গল্পে মোড়া সে পথে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুটি হয়তো আপন মনেই গেয়ে উঠেছিল –আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী…

সেই শুরু। তারপর  একের পর এক ছুটতে থাকা। এদিকে আন্দামান তো ওদিকে জিম করবেট ন্যাশনাল পার্ক। বারো বছর পরপর ফোটা ফুল নীলকুরিঞ্জি দেখতে সে ছুটে যায় নীলগিরি পাহাড়ে। আবার অলিভ রিডলে টার্টলের ডিম পাড়া দেখবে বলে (এরা যে বালুচরে জন্মায়, বড় হয়ে  ঠিক সেখানেই দলবেঁধে ফিরে আসে ডিম পাড়তে) চলে যায়  ওডিশার হাবালিখাটি বলে এক নির্জনতম সমুদ্রচরে– যেখানে  রাতেরবেলায় তাঁবুর পাশে শজারুর জাতভাই পর্কুপাইন আসে উচ্ছিষ্ট খেতে আর বুনো কুকুর ‘ঢোল’  ঘুরে বেড়ায় কচ্ছপের ডিমের লোভে।  আবার ভারতের একমাত্র ‘উল্লুক’ (হুলক গিবন) দেখার জন্য সে ট্রেক করে নামডাফার গহন অরণ্যে।  কিংবা গোল্ডেন লেঙ্গুর দেখতে অসমের চক্রশিলায়।

শুধু তো বাইরে-দূরে নয়, ঘরের কাছে সে কখনও ট্রেক করে বক্সাপাহাড়ের সবক’টা গ্রাম, কখনও  সান্দাকফু থেকে গুরদোঙ হয়ে সিরিখোলা। এখনও স্বপ্ন দেখে ফোকটেদাড়া টপ থেকে চোখ ভরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার কিংবা উত্তর সিকিমের ডোংকিয়া লা ধরে উঠে তিস্তা নদীর উৎস তিস্তা-খাংসে গ্লেসিয়ারে যাবার।

ষাটোর্ধ্ব এরকম আরও কিছু বন্ধু আছে আমার যাদের কেউ এখন বিরল ট্রাগোপ্যান পাখির ছবি তুলতে ছুটে যান অরুণাচলের মিশমি পাহাড়ে কিংবা ব্লাড-ফিজেন্ট তুলতে সিকিমের প্যাঙ্গোলাখায়। এক  প্রাক্তন সাংবাদিক, আকাশ দেখা যার নেশা,  মিসাইলের মতো বড় টেলিস্কোপ ঘাড়ে করে পৌঁছোন গুজরাটের ওখা-য় আর কেরলের শেরুবাতুরে-  বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের ছবি তুলবেন বলে। এক সহকর্মী একটা বাগানবাড়িই বানিয়ে ফেলেছে– মনের মতো গাছ লাগাবে বলে। এক সুনামী কেক কোম্পানির মালিক সব ছেড়ে  এখন চর্চা করেন অর্কিড আর এক্সোটিক গাছগাছালির। এর পরেও কেউ যদি বলেন- এখন তো আমাদের অবসরের কাল, আমার এইসব বন্ধু চোখ টিপে বলবেন– সময় কোথায় হে অবসরের, এই তো সবে  শুরু কল্লুম জীবন…



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *