গৌতম সরকার
তোর্ষা নদীর উথাল পাতাল কার বা চলে নাও…।
আজন্ম তোর্ষার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের সহবাস। সেই তোর্ষা ফের কী সর্বনাশই না করে দিল ডুয়ার্সের। দু’কূলের বাড়ি-আবাদ, জঙ্গলের গাছ ভাসিয়ে টেনে নিয়ে ফেলে দিল বাংলাদেশে। এ যেন শুধু সহবাস, বিয়ে তো দূর, প্রেমেও মতি নেই। শুধু তোর্ষা নয়, তিস্তা, কালজানি, ফুলহর নিয়ে কত গান, কত গাথা। সব নিষ্ফল ঠেকে জলধারাগুলি শ্রীমতী ভয়ংকরী হয়ে উঠলে।
তার ওপর প্রকৃতির মারের সঙ্গে রাজনীতির থুড়ি ক্ষমতার চক্রের (পাওয়ার সিন্ডিকেট) কার্যকলাপ বড় অসহ্য ঠেকে উত্তরবঙ্গের! ত্রাণ, উদ্ধার কিংবা বিধ্বস্ত এলাকার পুনর্গঠন, পুনর্বাসন স্বাভাবিক নিয়মে করার দায়িত্ব প্রশাসনের। কিন্তু মাথার ওপর মাতব্বরি করলে সেই কাজ করার সাধ্য কী প্রশাসনের থাকে! তাছাড়া প্রশাসনের ঘাড়ে ক’টা মাথা বা শিরদাঁড়া আছে েয, নিজের মতো কাজ করবে!
সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে নতুন ট্রেন্ড নেতাদের রিল বানানোর ব্যস্ততা। কেউ নদীর সেতুতে দাঁড়িয়ে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন। কেউ হাঁটুজলে সাঙ্গোপাঙ্গর সঙ্গে হাঁটার ভিডিও তোলাচ্ছেন। কেউ বিধ্বস্ত গ্রামে গিয়ে সরকার, শাসকদলের মুণ্ডুপাত করছেন। যে নদী উত্তরবঙ্গে প্রেমের জয়গান গায়, তার ধারে দাঁড়িয়ে কেউ আবার বিপক্ষকে মেরে হাত রক্তাক্ত করলেন। প্রতিপক্ষকে ক্ষতবিক্ষত করে শুধু হিংসার বার্তা ছড়ালেন।
অথচ ভাবুন, ভালোবাসার প্রতীক তিস্তা। তিস্তা নদীর চিকন বালা রে… সুর-কথার আকুতিতে কত আপন উত্তরবঙ্গের ভূমিপুত্রদের। তিস্তা-রঙ্গিতের রোমান্টিক প্রেম আখ্যান যে উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতি। ভাগ্যিস যত জলস্রোতই আসুক, বাংলাদেেশ চলে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। নাহলে তিস্তাপাড় আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না। কালজানি-ডিমার মিলনস্থলও ভালোবাসার ছবি আঁকে। কানে বাজে ‘কালজানি নদী রে, ডিমা নদী তার সাথে যায়…’।
সেই কালজানি মূর্তিমান বিভীষিকা হয়ে ওঠে। মহানন্দা-বালাসনের সঙ্গমস্থল নিরন্তর কবিতার জন্ম দেয়। অথচ দুটি নদীরই গর্ভ চিরে বালি-পাথর তুলে কী যথেচ্ছাচারই না চলছে। শাসকদলের প্রশ্রয়ে মহানন্দা, বালাসনের ধার দখল করে বসতি গড়ে উঠেছে। দুই নদীর পাড়ের পরিণতি দেখতে দেখতে মনে তো হবেই, ‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি…।’
মূর্তি বা হলংয়ে প্রকৃতি ও জলধারার দূরন্ত সহবাসকে মানুষ বিরক্ত করে বলেই তো ছোট ছোট স্রোতস্বিনীগুলির এমন পাগলপারা রূপ দেখি। নাহলে কী আর গাঠিয়ার মতো তত পরিচিতিহীন নদী এমন সর্বনাশ করে দিয়ে যেতে পারে! গাঠিয়ার দু’ধার শুধু ধ্বংসের ক্ষত নিয়ে পড়ে আছে এখন। মানুষ, জঙ্গল, বন্যপ্রাণের জীবন যেন স্তব্ধ। সংকটে মানুেষর জীবিকা। অথচ নদীগুলির সঙ্গে শুধু জীবন-জীবিকা নয়, আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে থাকে সংস্কৃতি।
গত সপ্তাহে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার প্রবল বর্ষণে নদী ও প্রকৃতির পাহাড়প্রমাণ সর্বনাশের বিবরণ গত কয়েকদিনে লক্ষ লক্ষ অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছে। একই কথা বারবার না বলাই ভালো। তাতে কচলে কচলে লেবু তেতো হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়। কিন্তু একটা কথা না বললেই নয়। উত্তরের প্রকৃতি, সংস্কৃতির শিক্ষা ভুলিয়ে এই বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে ভোটের সমীকরণে হিংসার জয়গান গাইতে শেখাচ্ছে।
বিজেপির দুজন জনপ্রতিনিধিকে (একজন সাংসদ, একজন বিধায়ক) খুনের চেষ্টায় সেই বার্তা স্পষ্ট। দুর্গত এলাকায় গিয়ে তাঁরা ভুল বা অন্যায় করেননি। কিন্তু ভোটের ক্ষীর কুড়োনোর অঙ্কে দলীয় সমর্থকদের উসকে মারমুখী করে তৃণমূল নেতারা জনরোষ বলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করলেন। মাত্র দুজন বিজেপি নেতাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে সমঝে দেওয়া হল, সাবধান, আর এগোলে বিপদ আরও ভয়ংকর! তিস্তা-তোর্ষার চেয়েও ভয়ংকরী হয়ে উঠতে পারে প্রতিহিংসার রূপ।
মুদ্রার অপর পিঠে আবার প্রতিশোধের বার্তা। হিংসায় টেক্কা দিতে কেউ কম যায় না। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের পালটা মারের নির্দেশের চেয়ে হিংসায় প্ররোচনা আর কিছু হয় কী! দুর্ভাগ্যজনক বললেও কম বলা হয়! বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মুর চোখের নীচের হাড় ভেঙেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন বটে, কিন্তু খগেনের চোটকে আমল দিলেন না। সৌজন্যের বদলে সাক্ষাৎ হয়ে উঠল তাচ্ছিল্যের প্রতীক।
এখন পাহাড় কিংবা সমতলে ত্রাণের হিড়িক চলছে। প্রশাসন, তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম, কলকাতা থেকে এসএফআইয়ের টিম, জুনিয়ার ডাক্তারদের অভয়া মঞ্চ, আরও নানা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন- যে যেখানে পাড়ছে ত্রাণ ও চিকিৎসা সাহায্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ঘরবাড়ি, আবাদ, জীবিকার উপকরণ ভেসে যাওয়া মানুষগুলির কাছে এই ত্রাণ নিঃসন্দেহে মূল্যবান। কিন্তু জীবনকে মূলস্রোতে ফেরাতে যে পুনর্গঠন, পুনর্বাসন দরকার, তা আদৌ হবে কি?
হিমালয় লাগোয়া উত্তরবঙ্গের এই বিপর্যয়ের মধ্যে মালদায় মহানন্দা, ফুলহর, গঙ্গার যৌথ ধ্বংসলীলা কার্যত আড়ালে থেকে গেল। গঙ্গা, ফুলহর, মহানন্দার পাড়ে ভূতনি, বৈষ্ণবনগর, রতুয়া প্রায় সারাবছর শঙ্কিত জীবনযাপন করে। ভাঙন, বন্যা লেগেই থাকে। সেই সর্বনাশের দিকে প্রচারের আলো কমই পড়ে। অনেক বেশি প্রচারিত হয় মালদার আনাচকানাচে নানা রাজনৈতিক খুন, দুষ্কৃতী তাণ্ডব। মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গে এলেন। মালদার খোঁজও নিলেন না।
সুকান্ত মজুমদার অনেকটা পথ ডিঙিয়ে বালুরঘাট থেকে জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি এলেন। ঘরের কাছে মালদার দুর্ভোগ দেখতে একদিন গেলেন না। শুভেন্দু অধিকারী বা রাজ্যপাল কারও মনে হয় না ভূতনিতে মানুষের লাগাতার চরম ভোগান্তি দেখতে যাওয়া দরকার। শাসক-বিরোধী, সকলেই দুর্যোগকেন্দ্রিক পর্যটনে গা ভাসালেন। প্রকৃতি-নদীর সহাবস্থানের এতদিনের পাঠকে ভুলিয়ে দিলেন। হিংসার বিপর্যয় ডেকে আনলেন উত্তরবঙ্গে। তিস্তা-তোর্ষা, ফুলহরের ক্ষত নিরাময় হবে, প্রতিশোধপরায়ণতার দগদগে ঘা থেকেই যাবে।
