ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর জেরে জ্বলছে বাংলাদেশ। জুলাই ‘অভ্যুত্থান’-এর অন্যতম মুখ হাদি দিনকয়েক আগে ঢাকার মতিঝিলে রিকশা করে প্রচারে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। হাদি ছিলেন কট্টর জাতীয়তাবাদী ও ভারতবিদ্বেষী। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গোলমালের আগাম আশঙ্কা করে দেশবাসীকে সংযত থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও দেশজুড়ে মৌলবাদীদের তাণ্ডব ঠেকানো যায়নি।
ধ্বংসলীলা চলেছে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সনজিদা খাতুন প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক পীঠস্থান ছায়ানট, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদীচী, ইন্দিরা গান্ধি কালচারাল সেন্টার এবং বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের দুটি বাড়িতে। ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত অসংখ্য ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং ভাঙচুর করা হয় বাংলাদেশের প্রথম সারির দুটি দৈনিক প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার-এর অফিসে। আগুনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দুটি সংবাদপত্রের ভবনেরই।
আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সময় দুই অফিসেই বহু সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী ভিতরে ছিলেন। আতঙ্কিত হয়ে তাঁরা ছাদে উঠে পড়েন। সেনা ও দমকলকর্মীরা তাঁদের উদ্ধার করেন। ওপর থেকে কেউ কেউ পাইপ বেয়ে নীচে নামা মাত্র উন্মত্ত জনতার হাতে গণধোলাইয়ের শিকার হন। প্রতিষ্ঠার পর বহু বছরের মধ্যে এই প্রথম দুটি পত্রিকাই একদিন প্রকাশিত হয়নি।
আবার ময়মনসিংহে ইসলাম অবমাননার অভিযোগে কেটে, কুপিয়ে, খুন করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এক হিন্দু তরুণকে। চট্টগ্রামে এক বিএনপি নেতার বাড়িতে আগুন ধরালে তাঁর সাত বছরের মেয়ে পুড়ে মারা গিয়েছে। বিক্ষোভে উত্তাল ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহি, খুলনা ও চট্টগ্রাম। ভারতবিরোধী বিক্ষোভের জেরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় ভিসা সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় ভারতীয় উপ-দূতাবাস।
হাদিকে সমাহিত করা হয়েছে কবি নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে। অন্ত্যেষ্টিতে হাজির ছিলেন স্বয়ং ইউনূস। একদিকে যখন অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জিগির ঊর্ধ্বমুখী, অন্যদিকে তখন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি চলছে। ‘জুলাই সনদ’-এর গণভোট হবে একইসঙ্গে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ করেছে দেশের সর্ববৃহৎ দল শেখ হাসিনার আওয়ামী লিগকে।
আওয়ামী লিগের পরেই সবচেয়ে বড় দল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)। দীর্ঘদিন ধরে সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা। তাঁর বড় ছেলে তথা দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরছেন। সংসদ নির্বাচনের আর দেড় মাসও নেই। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি, এনসিপি সহ সমস্ত দল নিজের মতো করে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে গোটা দেশের যা টালমাটাল পরিস্থিতি, তাতে জাতীয় নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি না- সেই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। কারণ, প্রশাসনিক রিপোর্ট অনুযায়ী সারা দেশে বিপুল সংখ্যক বুথ এখন হিংসাপ্রবণ। বাংলাদেশে নতুন করে অশান্তি, হিন্দু নির্যাতনের পর গত কয়েকদিনে সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ ফের শুরু হয়েছে। বঙ্গ বিজেপি মেরুকরণের রাজনীতিতে শান দেওয়া শুরু করেছে।
স্বাভাবিকভাবে ভারত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ একেবারেই স্বস্তিতে নেই। কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন কেন্দ্রীয় সরকার। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবিতে নতুন করে ঢাকার চিঠি এসেছে দিল্লিতে। কিন্তু ভারত সরকার কোনও অবস্থাতেই হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে নারাজ। মোদি সরকারের এই মনোভাবে বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। সাবধানে পা ফেলতে হবে ভারতকে। স্বৈরাচারী বা দুর্নীতিগ্রস্ত যাই বলা হোক না কেন, হাসিনা জমানায় একটা সুস্থিতি ছিল বাংলাদেশে। ২০২৪-এর ৫ অগাস্ট থেকে সেটা যেন উধাও।
