আগুপিছু না ভেবে ভেঙে দেওয়া, গুঁড়িয়ে দেওয়া, বাতিল করে দেওয়ার প্রবৃত্তি এখন সর্বত্র। অনিয়মের প্রতিকার করা গেল না। কিন্তু অনিয়মের যুক্তিতে ২০১৬-র প্যানেলে নিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের চাকরি খেয়ে নিতে অসুবিধা হল না। ওয়াকফ সম্পত্তির সংশোধনী আইন তেমনই। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের একাংশের দুর্নীতির হাত ওয়াকফ সম্পত্তিতে অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত। এই সত্যে কোনও দ্বিমত নেই। নামে ওয়াকফ হলেও, সেই সম্পত্তি অনেক জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালীর দখলে।
এ রাজ্যে তৃণমূলের কারও কারও নাম সেই তালিকায় আছে বলে হইচই হচ্ছে। বাম জমানায় যেমন শাসকদলগুলির অনেকে সেই একই পাপে বিদ্ধ ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। ভিন্ন রাজ্যে কোথাও কংগ্রেস, কোথাও অন্য দল, এমনকি মুসলিম দলগুলির কোনও নেতার নাম জড়িয়ে যেতে পারে ওয়াকফ কেলেঙ্কারিতে। সারা ভারতে সম্পত্তিটা বড় কম নয়। ফলে ক্ষমতাবানদের নজর সেদিকে পড়বে- সেটাই স্বাভাবিক!
তবে সেই অজুহাতে নজরদারির নামে ওয়াকফ আইনে মুসলিম নিয়ন্ত্রণ খর্ব করলে প্রশ্ন তো উঠবেই। সব ধর্মের নিজস্ব কিছু নিয়মকানুন থাকে। খ্রিস্টান নিয়মে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। সরকারি সাহায্য থাকলেও খ্রিস্টান পরিচালিত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বশাসিত। নিজস্ব নিয়মে চলে। সেখানে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে কি কোনও অনিয়ম নেই? চারপাশে চোখ বোলালে অনেক অনিয়ম ধরা পড়ে। তাই বলে ধর্মীয় গোষ্ঠীটির নিজস্ব নিয়মে হস্তক্ষেপ করা কি যুক্তিসংগত?
রামকৃষ্ণ মিশন কিংবা ভারত সেবাশ্রম সংঘ স্বশাসিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। নিজস্ব নিয়মে সেই প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। তাতে নাক গলানো কি সরকারের উচিত? এতে ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়। যতক্ষণ সংবিধান অনুযায়ী দেশটা ধর্মনিরপেক্ষ, ততক্ষণ স্বাধীনভাবে সমস্ত ধর্মীয় গোষ্ঠীর পথ চলা আইনসিদ্ধ শুধু নয়, ন্যায়সংগতও বটে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে অন্য ধর্মের কাউকে সম্পৃক্ত করা তাই অনুচিত। একইসঙ্গে অন্যায়।
অতীতে দেবোত্তর সম্পত্তির নামে এ দেশের রাজা, জমিদাররা অনেক কিছু কুক্ষিগত রাখতেন। এরকম নজির অনেক। বিভিন্ন সরকারি নথিতে বহুবার তা প্রকাশ্যে এসেছে। দেবোত্তর সম্পত্তি এখনও আছে। সেই সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ট্রাস্ট জাতীয় প্রতিষ্ঠান আছে। সেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নিজস্ব রীতি, নিয়ম আছে। সেখানে সরকার সহযোগীর ভূমিকায় থাকে। কিন্তু ভিন্নধর্মের কারও সম্পৃক্ত থাকা নৈব নৈব চ। কোচবিহারের দেবোত্তর ট্রাস্ট তার প্রমাণ।
তাহলে শুধু ওয়াকফ সম্পত্তি দেখভালে বিভিন্ন বোর্ড, কাউন্সিল বা কমিটিতে মুসলিম ভিন্ন অন্য ধর্মের কাউকে সদস্য করার প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিল? প্রশ্নটা উঠতেই পারে। অনিয়ম ঠেকানোর নাম করে গোটা পরিচালন ব্যবস্থায় কি এটা হস্তক্ষেপের শামিল নয়। খ্রিস্টান মণ্ডলী বা ডায়োসিসগুলিতে কি এরপর একই বিধান চালু করা হবে। কিংবা দেবোত্তর সম্পত্তি বা রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম কিংবা তিরুপতি মন্দির ট্রাস্টেও কি তাই হবে?
আইন যদি করতেই হয়, তাহলে পক্ষপাত থাকা উচিত নয়। শুধু ওয়াকফের বেলা এক নিয়ম, অন্য ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম কিন্তু গোটা ব্যবস্থাটার উদ্দেশ্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। এক যাত্রায় পৃথক ফল হওয়া ধর্মনিরপেক্ষ দেশে বাঞ্ছনীয় নয়। সংশোধনী আইনে যা যা বিধান আছে, তাতে ওয়াকফ সম্পত্তিকে সরকার নিজের হাতে নিয়ে নিতে পারে। কে না জানে, বহু সরকারি সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
সরকারি সম্পত্তি ভোগদখলে জড়িয়ে যায় অনেক জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কারও কারও নাম। শুধু জড়ায় না, এরকম অনিয়মের উদাহরণ অনেক। ফলে শুধু ওয়াকফের ক্ষেত্রে আঁটিসাঁটি, অন্য ক্ষেত্রে দাঁতকপাটি মনোভাবের পেছনে কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সরকারের উচিত, সেই প্রশ্নগুলির উত্তর পরিষ্কার করে পরবর্তী পদক্ষেপের পথে এগোনো।
