দেশের নাকি জাতীয় সম্পদ, কিন্তু কেন

দেশের নাকি জাতীয় সম্পদ, কিন্তু কেন

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


রূপায়ণ ভট্টাচার্য

গ্রামে ঢোকার রাস্তাটি অত্যন্ত রোমান্টিক। প্রধান সড়কের দু’দিকেই ফুটে রয়েছে সর্ষে ফুল। তার মাঝখান দিয়ে সমকোণে একটি মাটির রাস্তা চলে গিয়েছে গ্রামের ভেতরে। সেই রাস্তার দু’দিকে আবার এক ডজন তালগাছ। বেশ বড় বড় তালগাছ। তরুণ মজুমদারদের মতো কেউ গ্রামীণ পটভূমিতে সিনেমা বানালে এই জায়গাটার নাম সুপারিশ করা যেত।

রাস্তার ডানদিকে হিন্দুদের গ্রাম, আদিবাসীরাই থাকেন মূলত। নাম ওয়াড়ি। বাঁদিকের গ্রামটি মুসলিম অধ্যুষিত, নাম হোসেনপুর।

দুই মিলে নাম ওয়াড়ি-হোসেনপুর। বাংলা-বিহার সীমানার (Bengal-Bihar border) এই গ্রাম থেকে বারসইয়ের কাছের আজমনগর রোড স্টেশন আর হরিশ্চন্দ্রপুর স্টেশন দুটি প্রায় কাছাকাছি। আজমনগরই কাছে। তবে রাস্তা ভালো এবং বেশি ট্রেন মেলে বলে এখানকার লোকেরা অধিকাংশ হরিশ্চন্দ্রপুরে (Harishchandrapur) গিয়ে ট্রেনে ওঠেন। কাছের বড় গ্রাম তুলসীহাটা, কুশিদা।

ওয়াড়ি গ্রামে ঢোকার মুখে ডানদিকে দশ-বারো ফুট এগোলেই একটি বহু পুরোনো নীল বোর্ড দেখা গেল। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ অনুযায়ী নীল রঙের বোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘এই পুরাকীর্তি পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের জাতীয় সম্পদ। অনুগ্রহপূর্বক ইহাকে বিকৃত করিবেন না।’

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নীল বোর্ডের ওপর এটা বড় অক্ষরে লেখার আগে বলেছেন, এই পুরা কীর্তি ১৯৫৭ সালের আইন অনুসারে পুরাকীর্তি ঘোষণা করা হয়েছে। এটা ধ্বংস করা হলে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

প্রশ্ন হল, যারা এই বোর্ড লাগিয়ে দিয়ে চলে গেছে, তারপর আর সেভাবে খোঁজ দেয়নি। ফলে এই বোর্ডটি অপরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। অর্ধেক শব্দ আর পড়া যায় না। খড় এবং গোবরের আড়ালে চলে গিয়েছে ওই বোর্ড। কোনওদিন কেউ তুলে নিয়ে ফেলে দেবে।

সরকারই যদি পুরাকীর্তি বাঁচানোর ব্যাপারে উদ্যোগ হারিয়ে ফেলে, তাহলে সাধারণ মানুষ কী করবে? ওয়াড়ির গ্রামে বৌদ্ধস্তূপ আবিষ্কৃত হয়েছে বলে আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে থেকে হইচই শুরু হয়েছিল ওই এলাকায়। সেখানকার নিয়মিত খবর বের হত তখন! তারপর সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বহু মাস অন্তর অন্তর সরকারি অফিসাররা ওখানে ঘুরে আসেন। আবার পরিস্থিতি যে কার সেই।

এরই মধ্যে গ্রামবাসীরা সেখানে একটি শিব মন্দির তৈরি করে ফেলেছে। কাঁচা মন্দির। বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। দুর্জনেরা বলে থাকেন, ওখানে বৌদ্ধ পীঠ ছিল এই ব্যাপারটা মানতে গ্রামের লোকেরা নারাজ। তাদেরও কোনও আগ্রহ নেই গ্রামটাকে আরও আলোয় আনার জন্য। বরং ওয়াড়ি হোসেনপুর অনেক আগে বেশি চর্চিত ছিল এই বৌদ্ধ পীঠের জন্য। এখন সব থেমে গেছে।

এই পরিস্থিতি যে শুধু ওয়াড়ি হোসেনপুরের শূন্য প্রান্তরে দেখতে পাব তাই নয়। মালদার বহুচর্চিত জগজ্জীবনপুর, দক্ষিণ দিনাজপুরের বাণগড় এলাকায় একই পরিস্থিতি‌। খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছিল। কিছু মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। মালদার মিউজিয়ামে রাখা হয় সেগুলো‌। তারপর সেই কাহিনী শেষ।

এগুলো যে ইতিহাস, এমন ইতিহাস দেখার জন্য প্রচুর লোক এখনও ছুটে আসেন, এই ধারণাই রাজ্য সরকারের পর্যটন দপ্তরের মন্ত্রী বা অফিসারদের নেই‌। তাই বাড়তি উদ্যোগ নেয়নি। পর্যটনমন্ত্রী শেষ কবে উত্তরবঙ্গে গিয়েছেন কেউ জানেন না। মালদার সেরা বিজ্ঞাপন গৌড় বা আদিনায় পর্যন্ত লোক টানার কোথাও কেউ ভাবে না। পাহাড় বা ডুয়ার্সে যেভাবে হাজার হাজার পর্যটক যান, তার ৫ শতাংশ পর্যটকও গৌড় টানতে পারে না। ফলে আপনি ওয়াড়ি-হোসেনপুর, বাণগড়ে পর্যটকদের আসার কথা বলবেন সেটা কী করে হয়? এ তো সত্যিই ধন্য আশা কুহকিনী!

বাংলা-বিহার লাগোয়া এই ওয়াড়ি অঞ্চলই ক’দিন আগে আলোচনায় উঠে এসেছিল সম্পূর্ণ অন্য একটা কারণে। সেখানে এসআইআর-এর শুনানিতে দাদুর কবরের মাটি নিয়ে চলে গিয়েছিল পাশের গ্রাম ওয়াড়ি-দৌলতপুর এক তরুণ। বছর তিরিশের সালেক গিয়ে বলেছিলেন, এই মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হোক, আমরা তাঁর বংশধর কি না।

নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই মাটি। ওই মাটিতেই গুপ্তযুগের সুলুক সন্ধান ছিল বলে ধারণা করেছিলেন গবেষকরা। তাই গ্রামের ঢোকার মুখেই খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে। এখন যা ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে প্রায়। ম্যাজিস্ট্রেটের সেই বোর্ডটি অবশ্য রয়ে গিয়েছে‌। রয়ে গিয়েছে বলে মনে করা হতে পারে, সরকার এখনও এই জায়গাটিকেই সম্পদ মনে করে। হাল ছাড়েনি। এখানেই প্রশ্ন। সম্পদ যদি মনে করে, তাহলে কেন সেখানে বাড়তি নজর দেওয়া হয়নি? তা হলে কেন ওই বিস্তীর্ণ জায়গা পড়ে রয়েছে চূড়ান্ত অনাদরে?

জগজ্জীবনপুরে তাও কিছু দেখার জিনিস রয়েছে। ওয়াড়িতে তেমন কিছুই নেই। বাঁশঝাড়ের ধারে উঁচু উঁচু মাটির ঢিবি। সেখানে গোরু চরে বেড়াচ্ছে। সরকার বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তরফে স্পষ্ট করে কি বলা উচিত ছিল না যে এখানে কিছু নেই। হয়তো আগে ছিল। এখন নেই। তারপরও সেই মোক্ষম প্রশ্ন আসছে। যদি কিছু নাই থেকে থাকে, তাহলে কেন এখনও সরকারি প্রতিনিধিরা মাঝে মাঝে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে? ফালতু অর্থহীন টাকা নষ্টের কি প্রয়োজন রয়েছে? ম্যাজিস্ট্রেটের সেই বোর্ডের কি কোনও মানে রয়েছে আর?

গঙ্গারামপুরের কাছে বাণগড়ের ধ্বংসাবশেষ দেখতে মাঝে মাঝে জেলার স্কুল শিক্ষকরা পড়়ুয়াদের নিয়ে যান। অন্য জেলা থেকে পর্যটক বেশি দেখা যায় বোল্লাকালীর পুজোর সময়। এক গুলিতে দুটো পাখি মারা হয়ে যায় বলে তখন বাইরের কিছু ভক্ত ঘুরে যান ওখানে।

উত্তরবঙ্গের (North Bengal Heritage) পুরাকীর্তিগুলো এভাবেই অনাদরে পড়ে। মালদা, দিনাজপুরের দু’তিনটি পুরাকীর্তি বাদে আর বলা যায় গোসানিমারির রাজপাট, গরুবাথানের ডালিম ফোর্ট, চিলাপাতার নলরাজার গড়ের কথা। বাংলা-অসম সীমানায় একটা সময় হিমুরাজার গড় ছিল, তা আজ ধ্বংসস্তূপ। এসবও সেভাবে প্রচুর লোক টানতে পারে না।

এরই মধ্যে মাস কয়েক আগে নলরাজার বহুখ্যাত গড় নিয়ে নেতারা যা নাটক করলেন, তা অভাবনীয়। রাজ্য সরকার অনুগামী, পদপ্রার্থী, পুরস্কারপ্রাপক কিছু নেতাকে সঙ্গে নিয়ে, স্থানীয় রাজনীতিকদের তুষ্ট করতে নলরাজার গড়ের নাম পালটে ফেলেছে। সেটা হল নরনারায়ণগড়। বংশীবদন বর্মন, সুমন কাঞ্জিলাল, সৌরভ চক্রবর্তীদের এই অঙ্কে শামিল হয়ে গেলেন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় বা আনন্দগোপাল ঘোষরা। দুর্গের নাম বদলের পিছনে এটাই সবচেয়ে খারাপ দিক। নাম বদলের দৌলতে দুর্গের বয়স হাজার বছর কমিয়ে দেওয়া হল। উত্তরবঙ্গ থেকে মুছে গেল গুপ্তযুগ এবং নল-দময়ন্তীর ছোঁয়া। ওই ঘটনা ঘটার সময়ই মনে হয়েছিল, অনেক পুরোনো ছাত্র তাঁদের পুরোনো ছাত্রদের তাড়া করতে পারেন। কেন এতদিন ধরে ভুল শেখালেন আমাদের?

ওয়াড়ি-হোসেনপুরের সেই গ্রামের ছাত্রছাত্রীরাও নিশ্চিতভাবে আতান্তরে পড়বে। কেউ বলতে পারে না, তাদের গ্রামে ঠিক কী ছিল হাজার বছর আগে। কেনই বা সেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বোর্ডটিতে লেখা, এই পুরাকীর্তি পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের জাতীয় সম্পদ! গোরু, গোবর, খড়ের মধ্যে ওই বোর্ডটি দাঁড়িয়ে রয়েছে উত্তরবঙ্গের পুরাকীর্তির অসহায়ত্বের প্রতীক হয়ে। কোনও পর্যটক তা দেখতে আসে না যে!

তবুও বলা যায় না, কোনওদিন হয়তো শুনব, নলরাজার গড়ের মতো রাতারাতি এই জাতীয় সম্পদের নাম পালটে গিয়েছে!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *