নীলাচল রায়
বর্তমান বিশ্বপরিসরে ভারতের অর্থনৈতিক (Indian Economic system 2026) অবস্থান দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং সেই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক স্তরেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রাককলন ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির তালিকায় উঠে এসেছে। অনুমান করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকেই জাপানকে পিছনে ফেলে প্রায় ৪.১৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল জিডিপি নিয়ে ভারত এই অবস্থান সুদৃঢ় করবে। এই সাফল্য নিঃসন্দেহে দেশের জন্য গর্বের বিষয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের গুরুত্ব বৃদ্ধির একটি স্পষ্ট প্রমাণ। তবে এই উজ্জ্বল পরিসংখ্যানের পাশাপাশি এমন কিছু বাস্তব প্রশ্নও উঠে আসছে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত চরিত্র নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
স্পষ্ট বৈপরীত্য
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হওয়া মানেই যে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাত্রার মান সমানভাবে উন্নত হবে, বাস্তবে তা নয়। ভারতের ক্ষেত্রেও এই বৈপরীত্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট। নমিনাল জিডিপির বিচারে দেশ যতই শক্তিশালী হোক, সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। দেশের মোট সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও সেই সম্পদ সমাজের সব স্তরে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকার ফলে জাতীয় আয়ের এই বড় সংখ্যাগুলি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক চাপ, অনটন ও অনিশ্চয়তাকে আড়াল করে দিচ্ছে।
বাজারের বাস্তবতা
ভারতের ১৪৬ কোটি জনসংখ্যাকে অনেক সময় বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজার (India Market Evaluation) হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এই ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের নতুন বা অ-নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। চাল, ডাল, নুন ও তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতেই তাঁদের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যায়। ফলে আধুনিক ভোগ্যপণ্য বা উন্নত পরিষেবা গ্রহণ করার মতো অতিরিক্ত অর্থ তাঁদের হাতে থাকে না। প্রকৃত অর্থে বাজার তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষের হাতে প্রয়োজনের বাইরে খরচ করার মতো টাকা থাকে।
উন্নয়নের শর্ত
এই বাস্তবতার কারণেই বহু বিদেশি সংস্থা ভারতে এলেও বড় মাত্রার লগ্নির বিষয়ে সতর্ক থাকে। টেসলার মতো বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলি ভারতে কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে কেন বারবার দ্বিধায় পড়ছে, তার মূল কারণ প্রকৃত ক্রেতার অভাব। তারা জানে, জনসংখ্যা বেশি হলেই বাজার লাভজনক হয়ে ওঠে না। উচ্চমূল্যের পণ্যের জন্য পর্যাপ্ত খরিদ্দার না থাকলে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। তাই চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির তকমা তখনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে, যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানের সাফল্য নয়, সাধারণ মানুষের হাতে খরচ করার মতো বাড়তি টাকা পৌঁছানোর মধ্যেই তার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে।
(লেখক শিক্ষক। মাটিগাড়ার বাসিন্দা।)
