‘তিমির অবগুণ্ঠনে’ এক বিকল্প পথের সন্ধানী

‘তিমির অবগুণ্ঠনে’ এক বিকল্প পথের সন্ধানী

শিক্ষা
Spread the love


(আজ জন্মদিনে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে নেতাজির রাষ্ট্রভাবনা, আদর্শগত দৃঢ়তা ও বিতর্কিত বাস্তববাদী রাজনীতির এক বস্তুনিষ্ঠ পুনর্মূল্যায়ন।)

শুভময় সরকার

প্রতিটি ঋতু অজান্তেই চিহ্নিত হয়ে যায় কিছু স্মৃতি এবং অভ্যাসে, যেমন বৈশাখ মানেই নববর্ষ এবং রবীন্দ্রনাথ, তেমনই জানুয়ারি এলেই কোথাও এক স্বদেশভাবনা আমাদের স্মৃতি এবং আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে যায় সেই কোনকাল থেকে। এই আবহমান স্মৃতিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে নিয়ে চলেছি আমরা। জানুয়ারি পড়লেই ক্যালেন্ডারে শেষ সপ্তাহের দিকে চোখ চলে যায় অজান্তেই। ২৩ জানুয়ারি এবং ২৬ জানুয়ারি, বিশেষত জানুয়ারির ২৩ তারিখটি আমাদের বঙ্গজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। হ্যাঁ, কারণ ‘নেতাজি’র জন্মদিন। সুভাষচন্দ্র বসু থেকে অনেক কাছের হয়ে আছেন আমাদের কাছে ‘নেতাজি’ হিসেবেই। বহুকাল আগের সেইসব ছুটির দিনের দুপুরগুলো মনে পড়ে। খাওয়াদাওয়ার পর মা পড়ে শোনাচ্ছেন শৈলেশ দে-র সেই বিখ্যাত বই ‘আমি সুভাষ বলছি’র প্রথম খণ্ড থেকে কিছু অংশ। মায়ের আবেগমাখা কণ্ঠের উচ্চারণে সেই কৈশোরকালেই আমার মনের গভীরে মূর্ত হয়ে উঠছেন এক নায়ক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। নেতাজি-সঙ্গী ভগৎ সিংয়ের সেই আওয়াজ ‘বঙ্গাল কা শের আ গয়া’, মায়ের সেদিনের সেই পাঠ আজও যেন আমার কানে ভাসে। হ্যাঁ, তিনি এভাবেই সুভাষচন্দ্র বসু থেকে ‘নেতাজি’ হয়ে উঠলেন আমার এবং আমার মতো লক্ষ-কোটি মানুষের হৃদয়ে। ২৩ জানুয়ারির ভোর মানেই স্মৃতি এবং ইতিহাসের এক অদ্ভুত অনুভূতি আর আবেগ। হয়তো বা এই আবেগ একজন রক্তমাংসের বাস্তব চরিত্রকে অতিমানব কিংবা ‘সুপার-হিরো’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। এটা কতটা সেই মানুষটিকে সঠিকভাবে চেনার বা বিশ্লেষণ করার পক্ষে ঠিক, সেটা ভিন্ন আলোচনার পরিসর কিন্তু এটাই বাস্তব।

রাষ্ট্রভাবনার রূপকার

তিনি অর্থাৎ সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী, বহুমাত্রিক ও বিতর্ক উদ্দীপক চরিত্র যাঁর জীবনের রহস্যময় পরিসমাপ্তি তাঁকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে হয়তো বা। নেতাজি কি কেবলমাত্র এক বিপ্লবী নেতা..! তাঁকে শুধুই বিপ্লবী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলে তাঁর বহুমাত্রিকতাকে উপেক্ষা করা হবে। নেতাজি একজন গভীর চিন্তাবিদ, দার্শনিক, সংগঠক, কূটনীতিক এবং নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রভাবনার এক রূপকার। জাতীয়তাবাদ (যাকে ‘স্বদেশভাবনা’ বলাটাই শ্রেয়), সামরিক সংগ্রাম, আন্তর্জাতিক কূটনীতি সব পরিসরেই তাঁর স্বচ্ছ ভাবনার প্রকাশ লক্ষ করি আমরা৷ তাঁর নিজস্ব ভাবনা এতটাই স্বচ্ছ ছিল যে তিনি কোনও পরিস্থিতিতেই সেই ভাবনা থেকে সরে আসতে চাননি। জাহাজ থেকে নেমে সুভাষচন্দ্র প্রথম যাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন তিনি গান্ধিজি। সুভাষচন্দ্র জানতে চাইলেন অসহযোগ এবং আইন-অমান্য আন্দোলনের মাধ্যমে ইংরেজের কাছ থেকে আদৌ কি পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব? ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে নাগপুর কংগ্রেসে কেনই বা তিনি পূর্ণ স্বরাজের প্রতিশ্রুতি দিলেন…! সেদিন গান্ধিজি কিন্তু সুভাষের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বরং কলকাতায় গিয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন।

 

স্পষ্ট বিশ্বাস

এ প্রসঙ্গ উল্লেখ করলাম সুভাষচন্দ্রের ভাবনার স্বচ্ছতা প্রসঙ্গে। আসলে আদর্শগতভাবে সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা – কোনও আপস, ধাপে ধাপে অগ্রগতি এসবকে তিনি সরাসরি নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাসের জায়গাটা ছিল খুব স্পষ্ট – ঔপনিবেশিক শাসন ভাঙতে হলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে তার শক্তির জায়গাতেই আঘাত করতে হবে এবং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রগঠনে সুভাষচন্দ্রের সমাজতান্ত্রিক ঝোঁক কিন্তু স্পষ্ট – রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকবে সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক সাম্য এবং শোষণহীন এক ব্যবস্থার দিকে এগোনো। তবে তাঁর এই ভাবনা অন্ধ অনুকরণ নয় বরং ভারতীয় বাস্তবতায় অভিযোজিত। একটি বিষয় এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, গান্ধির অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের বিরোধ সম্পূর্ণভাবে আদর্শগত এবং কৌশলগত, ব্যক্তিগত স্তরে অসম্মানের কোনও জায়গাই ছিল না। সশস্ত্র সংগ্রামের পথে গিয়ে সুভাষচন্দ্র যখন উত্তর-পূর্ব দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে প্রবেশ করলেন, তার আগে দেশমাতৃকা এবং জাতির জনকের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়েছিলেন। সুতরাং গান্ধিজির সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের বিরোধ নিয়ে বহুল আলোচিত গল্পগাথার অনেকটাই ভিত্তিহীন। আসলে নেতাজি বিশ্বাস করতেন, ব্রিটিশ রাষ্ট্রযন্ত্রকে কেবলমাত্র নৈতিক আহ্বানে নত করা যাবে না, সশস্ত্র প্রতিরোধ জরুরি এবং এর জন্য যা যা করার সব করতে হবে। ঠিক এই আদর্শগত জায়গাতেই গান্ধিজির সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষেও সুভাষচন্দ্রের কিছু পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, বিশেষত হিটলার এবং তোজোর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং সাহায্যপ্রার্থনা আজও বিতর্কের বিষয় কিন্তু এটাও পাশাপাশি সত্যি, তিনি তাঁর কূটনৈতিক ভাবনায় যুক্তিসংগতভাবেই এগিয়েছিলেন।

আজাদ হিন্দ ফৌজ

সুভাষচন্দ্রের আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন তাঁর সবচেয়ে দৃঢ় এবং সাহসী পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপে তাঁর নেতৃত্বের তিনটি দিক স্পষ্ট – সাংগঠনিক ক্ষমতা, প্রেরণা এবং কূটনীতি। প্রবাসী ভারতীয়দের সাহায্য নেওয়া এবং জার্মানির হাতে বন্দি ভারতীয় সেনাদের নিয়ে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন সুভাষচন্দ্রের সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রমাণ। রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতার আহ্বান নিছকই স্লোগান ছিল না সেদিন, তার বাইরেও ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র এবং জার্মানি ও জাপানের সঙ্গে জোট যতই বিতর্কিত হোক, ঔপনিবেশিক শাসন ভেঙে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে আন্তর্জাতিক শক্তিসমীকরণের ব্যবহার ছিল বাস্তববাদী রাজনীতি।

আরও বেশি প্রাসঙ্গিক

সময় যতই এগোচ্ছে, আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় রাজনীতির আদর্শহীনতা এবং ব্যক্তিস্বার্থের পঙ্কিলতায় আমরা যতই আবর্তিত হচ্ছি, যতই অসহায়ত্ব আমাদের গ্রাস করছে, তত যেন তিনি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন। ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি গান্ধিজির সঙ্গে সুভাষের আদর্শগত লড়াইয়ে কথা। এ প্রসঙ্গেই সামান্য সংযোজন জরুরি, আদর্শগত চূড়ান্ত বিরোধ কিন্তু হয়েছিল জওহরলালের সঙ্গেও তবে কংগ্রেসের মধ্যে গান্ধিজির অনুগামীদের সুভাষচন্দ্রকে রাজনৈতিকভাবে শেষ করে দেওয়ার নীতিগত বিরোধিতা কিন্তু নেহরু করেছিলেন। Sarvepalli Gopal তাঁর গ্রন্থের (Jawaharlal Nehru, vol.1) এক জায়গায় লিখছেন – “He disapproved of the way by which Bose was being hounded out after profitable an election….”!

আজও এক ট্র্যাজিক নায়ক

এই নতুন সহস্রাব্দের ২৩ জানুয়ারিতে বসে আমরা আবেগহীনভাবে নির্মোহ দৃষ্টিতে সুভাষচন্দ্রকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে হয়তো-বা বিশ্লেষণ করতে পারব না কারণ আজও যে তিনি বাঙালি তথা ভারতবাসীর হৃদয়ে ভীষণভাবেই বর্তমান। সম্পূর্ণ আবেগমুক্ত হয়ে নেতাজিকে বিচার করার জন্য আমাদের আরও অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণে তাঁর জীবনকে, রাজনৈতিক ভাবনাকে আমাদের দেখার সময় আসেনি কারণ আজও আমাদের কাছে তিনি এক Tragic Hero, ‘সদা জাগ্রত এক জিজ্ঞাসা’…!

(লেখক প্রাবন্ধিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *