ডেমোক্র্যাসি বনাম ড্রামা

ডেমোক্র্যাসি বনাম ড্রামা

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


বিদ্রুপ, কটাক্ষ যদি শালীনতার সীমা ছাড়ায়, তখন গণতন্ত্রের বিপন্নতার আভাস ফুটে ওঠে। সংসদীয় গণতন্ত্রে তর্কবিতর্ক, বিভিন্ন দলের মধ্যে চাপানউতোর, পারস্পরিক বিরোধিতা মর্যাদার সঙ্গে ঠাঁই পাওয়ার কথা। কিন্তু সেই সমালোচনার সুযোগকে যদি অপমান করার জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের মূল সুরের ছন্দপতন ঘটে। ২০২৫ সালে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনের সূচনা লগ্ন সেরকমই ছন্দপতনের বার্তা বয়ে আনল।

দুর্ভাগ্যক্রমে সেই বার্তা দিলেন সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রধান পুরোহিত ভাবা হয় যাঁকে- সেই প্রধানমন্ত্রী। তিনি যে ভাষায় বিরোধীদের সমালোচনা করলেন, তা একইসঙ্গে বিরোধীদের অমর্যাদা ও তাচ্ছিল্যের শামিল। সংসদে বিরোধীদের সমালোচনার সুর যেন বেঁধে দিতে চাইলেন নরেন্দ্র মোদি। যা সুস্থ গণতন্ত্রে সংসদের গরিমাকে কাঠগড়ায় তুলে দিয়েছে। তাঁর ভাষায় সংসদে বিরোধীরা আসেন ‘নাটক’ করতে। শব্দটি চয়নে স্পষ্ট কতটা অপমান করার জন্য শাসকদলকে উসকে দিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী।

তিনি সরাসরি বিরোধীদের বলেছেন, নাটক করতে হলে অন্য জায়গায় গিয়ে করুন। সংসদ নাটক করার জায়গা নয়। এই বার্তায় বিরোধীরা যাই বলতে চাইবে গণতন্ত্রের মন্দিরে, তাকে নাটক বলে তুলে নস্যাৎ করার সুযোগ পেয়ে গেল সর্বভারতীয় শাসকদল। সদ্য বিহারে গোহারা হেরেছে বিরোধী জোট। বহুদলীয় গণতন্ত্রে কোনও দল হারতেই পারে। সেজন্য কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়া যেমন কাম্য নয়, তেমনই সেই নির্বাচন নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন তোলার সুযোগকে আগে থেকে বন্ধ করার চেষ্টা গণতন্ত্রসম্মত নয়।

সংসদে এমনকি স্লোগান তুলতেও বিরোধীদের প্রতি নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সওয়াল করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ‘যেখানে হেরে গিয়েছেন, সেখানে গিয়ে স্লোগান দিন কিংবা যেখানে হারার বাকি আছে, সেখানে যেতে পারেন’ মন্তব্যটি যুগপৎ ঔদ্ধত্য ও বিরোধীদের অপমানের নামান্তর। ভারতীয় গণতন্ত্রে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ মূলত বিরোধী শিবিরের। সেই সাংবিধানিক শর্তটিকে কাঠগড়ায় তুলে দিলেন খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী।

এমন নয় যে, নরেন্দ্র মোদি একা সংসদীয় গণতন্ত্রের কফিনে পেরেক ঠুকছেন। অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তো বটেই, বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা বিভিন্ন সময়ে একই পথের পথিক হয়ে থাকেন। ব্যতিক্রম নয় বাংলা। এরাজ্যে শাসকদল তৃণমূলের নেতারা, এমনকি খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভাষায় বিধানসভার অন্দরে বিরোধীদের তাচ্ছিল্য করেন, তা গণতন্ত্র সম্মত নয়। দলীয়ভাবে তাঁরা শুভেন্দু অধিকারীকে গদ্দার বলে সমালোচনা করতেই পারেন, কিন্তু বিরোধী দলনেতা হিসেবে ওই বিশেষণে সমালোচনা করা গণতন্ত্রের মূল ভিতের পরিপন্থী।

দেশের ১১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার চলতি বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) নিয়ে প্রশ্ন বা বিতর্ক কম নয়। তা সত্ত্বেও মানতে হবে যে, এটা একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় সার্বিকভাবে প্রশাসনের যুক্ত থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ‘আমি আছি, ভয় পাবেন না’ বলে জেলা শাসকদের উদ্দেশে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশ্বাস গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক ব্যবস্থাটির প্রতি বিরূপ মনোভাবের পরিচায়ক।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে এই মনোভাব প্রকাশ করলে, তা-ও গণতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত করে। যদিও সব সৌজন্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে শীতকালীন অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সার্বিকভাবে গোটা বিরোধী শিবিরের প্রতি নেতিবাচক মন্তব্যগুলিতে। ‘হেরেছেন বলে সংসদে অশান্তি করবেন, এটা হতে পারে না’ মন্তব্যটি বাস্তবে অধিবেশনের শুরুতেই বিরোধীদের সমালোচনাকে বেঁধে দেওয়া ও কণ্ঠরোধের শামিল।

সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রধান পুরোহিত প্রধানমন্ত্রী নিজে এভাবে বিরোধীদের কার্যকলাপে লাগাম পরানোর চেষ্টা করলে তার পরিণতি ভয়াবহ। বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারণাটি এতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। গণতন্ত্রের মোড়কে একনায়কত্ব, একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঝোঁক এর মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠা পায়। শুধু বিরোধী শিবির নয়, গণতন্ত্রকামী সাধারণ নাগরিকের চেতনায় এর চেয়ে বড় আঘাত আর কিছু হতে পারে না।

The publish ডেমোক্র্যাসি বনাম ড্রামা appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *