সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
দৈব যদি মানতে হয়, তাহলে বলতে হয় রামকুমার এবং রানি রাসমণির যোগাযোগ। রাসমণি নৌবহর নিয়ে যাবেন কাশী। প্রত্যাদেশ হল, ‘রানি। কাশী নয় কালী’। সেই কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা ও অন্নভোগ-সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করে ঝামাপুকুর টোলের সুপণ্ডিত ব্রাহ্মণ রামকুমার হলেন পূজারি।
এই যোগাযোগ না হলে কী হত! ঝামাপুকুর টোল তিন-চার বছরেও তেমন প্রতিষ্ঠা পায়নি। যে আশায় রামকুমার কলকাতায় এসেছিলেন সে আশা পূর্ণ হল না। পরিশ্রমই সার হল, আয়ের মুখ দেখলেন না, তারপর হঠাৎ এই পরিবর্তন। জানবাজারে রামকুমারের প্রতিষ্ঠা। রামকুমারের সমাধান না এলে মাকে প্যাকিং বাক্স থেকে বের করা যেত কি? বহুমূল্য মন্দির, ষাট বিঘা জমির উপর উদ্যান, পোস্তা, রুপোর সিংহাসন, দ্বাদশ শিব মন্দির, চাঁদনি, পঞ্চবটী, সবই হয়ে যেত ব্যর্থ প্রয়াস। ব্রাহ্মণদের বিচিত্র বিধান। মা কালীকে অন্নভোগ দেওয়ার অধিকার মাহিষ্যের নেই। উচ্চবর্ণের মানুষ তোমার মন্দিরে প্রসাদ গ্রহণ করবে না। মা কালীরও জাত আছে। মাহিষ্যরা কিন্তু ক্ষত্রিয়।
এই যোগাযোগ না হলে কালী কোনও কালেই আমাদের মা হতেন না। শ্মশান কালী, ডাকাত কালীই হয়ে থাকতেন। চারপাশে মনুষ্যরূপী ভূত-প্রেতের নৃত্য। শ্যামা কালী, দক্ষিণা কালী হয়ে আমাদের ঘরে ঘরে করুণা বিতরণ করতেন না। রহস্যময়ীর রহস্য উন্মোচন করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, রাজা রামকৃষ্ণ, দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণ ছাড়া সকলেই ছিলেন মহাসাধক। মা কালীকে মাতৃজ্ঞানে উপাসনা করেছেন। সিদ্ধিলাভ করেছেন, বিভোর হয়েছেন, পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণকে অবতার বলার কারণ? তাঁর নিজের সংজ্ঞা! এমনটি কারও ক্ষমতা ছিল কি? অবতার হল বাহাদুরি কাঠ। নিজে ভাসে, তার ওপর চড়ে দশজন ভাসতে ভাসতে সাগর পেরোতে পারে। শক্তির সঙ্গে ভক্তিকে এমনভাবে কেউ মেলাতে পারেননি। ব্রহ্মের সঙ্গে শক্তির মিলন। নিরাকার-সাকার দ্বন্দ্বের চির অবসান। সেই কারণেই কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ ব্রাহ্মগণ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে বারবার শুনতে চাইতেন মা কালীর ব্যাখ্যা। টয়েনবি, ঐতিহাসিক। তিনি বললেন, ইতিপূর্বে কেউ কখনও কোথাও শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ব্যাপকতা ও গভীরতা অতিক্রম করতে পারেননি।
শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনা থেকে প্রকাশিত হল, নবযুগ ধর্ম।
কেমন ছিল কলকাতার ঘরোয়া কালীপুজো, সে-কালের কলকাতায়? কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়িতে যাওয়া যাক। ঠিকানা সুবাবাজার বা শোভাবাজার। কালীপুজো হয়, পুজোর রাতে। ঘোর তান্ত্রিক। ভীষণ তান্ত্রিক। এঁদের আহ্নিক মানেই আকণ্ঠ সুরাপান।
শ্যামাপুজোর রাতে গুরু, পুরোহিত, কর্তা, অন্দরের গৃহিণী, সমস্ত মহিলা এমনকি দাসদাসিদেরও সুরাপান করতে হত। কড়া নিয়ম। সকাল থেকেই মদ্যপান। কালীপুজো যে।
ঢুলিরা সকাল থেকেই ঢাক পিটে পাড়া অস্থির করে তুলছে। দুপুরবেলা অন্দরমহলে গিয়ে গৃহিণীকে বলছে, ‘মা, হাতে হাতে একটু তেল দিন আমরা নাইতে যাব, আর জলপান।’ গৃহিণী মদে চুর। রেগে গিয়ে বলছেন, ‘কি! তোরা আমার বাড়িতে তেল, জলপান চাচ্ছিস? মেঠাই খা, মোমবাতি মাখ।’
পুজোর দালানে সাত হাত লম্বা প্রতিমা। পর্বতপ্রমাণ মিষ্টান্নের স্তূপ। একের পর এক বলি হয়েই চলেছে। কান ফাটানো ঢাকের আওয়াজ। পশুদের আর্তচিৎকার। অসুরের মতো কয়েকটা লোক খাঁড়া হাতে নাচছে। পশুর রক্তে বাড়ির প্রাঙ্গণ ডুবে যেত। থইথই করত চারপাশ। নর্দমায় রক্তের স্রোত বইত। একবার কালীপুজোর রাতে কর্তার খেয়াল হল, আমি এত পশুকে বলিদান দিয়ে স্বর্গে পাঠাচ্ছি, আমার কত পুণ্য হচ্ছে, আচ্ছা স্বয়ং গুরুদেবকে যদি বলি দিয়ে স্বর্গে পাঠাই, তা হলে তো আরও পুণ্য হবে। গুরুদেব মদে চুর হয়ে আছেন। তাঁকে বলামাত্রই নেচে উঠলেন, ‘চলো, চলো, আর দেরি নয়। রাত থাকতে থাকতেই স্বর্গে চলে যাই। মা, আসছি গো!’
গুরুদেবকে হাড়িকাঠের কাছে আনা হল। কর্তা বললেন, ‘গুরুদেব গলা লাগান। জয় মা, বলে হয়ে যাক।’ যাঁরা বলিদান করছিলেন, তাঁরা সবাই কর্মকার। কর্তার আদেশে সকলকেই মদ্যপান করতে হয়েছে, তবে মাত্রা কম। এত বলি দিতে হবে যে মাতাল হলেই সর্বনাশ। তাঁরা ভাব দেখাচ্ছেন, কতই না খেয়েছি? তা না হলে কর্তা আবার জোর করে গিলিয়ে দেবেন। বলিদানের দলপতির মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। তিনি বললেন, ‘কর্তামশাই! এখানে যত খাঁড়া আছে, সব খাঁড়া চিরকাল পশুবলি দিয়ে আসছে, এতে কি গুরুদেবকে বলি দেওয়া যায়? গুরুদেবের জন্যে চাই নতুন খাঁড়া। আপনি ভাববেন না। একটু অপেক্ষা করুন। বাড়িতে নতুন খাঁড়া তৈরি আছে। নিয়ে আসছি। এই যাব আর আসব।’
দলপতি দলের সকলকে সতর্ক থাকতে বলে চলে গেলেন থানায়। পুলিশ এসে গুরুদেবের স্বর্গযাত্রা বন্ধ করল। তন্ত্রে বলিদানের নির্দেশ আছে। কালিকাপুরাণ বলছে, ‘চণ্ডিকাং বলিদানেন তোষয়েৎ সাধকঃ সদা।’ সাধক মোদক দ্বারা গণপতিকে, ঘৃতদ্বারা হরিকে, নিয়মিত গীত বাদ্যদ্বারা শঙ্করকে এবং বলিদান দ্বারা চণ্ডিকাকে সর্বদা সন্তুষ্ট করবে। শাস্ত্রে আট রকমের ‘বলি’র কথা বলা হয়েছে। পক্ষী, কচ্ছপ, কুম্ভীর, বরাহ, ছাগল, মহিষ, গোধা, শশক, বায়স, চমর, কৃষ্ণসার, শশ, সিংহ, মৎস্য, স্বগাত্র-রুধির, ঘোড়া, হস্তী। এর পরে আছে মহাবলি। মহাবলি হল শবভ। বিশেষ এক ধরনের বৃহৎ মৃগ, উটও হতে পারে। আর অতি বলি হল, মানুষ।
ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট অধর সেন শ্রীরামকৃষ্ণকে একদিন প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মহাশয়, আমার একটি জিজ্ঞাস্য আছে, বলিদান করা কি ভালো? এতে তো জীবহিংসা করা হয়।’
ঠাকুর উত্তর দিলেন, ‘‘বিশেষ বিশেষ অবস্থায় শাস্ত্রে আছে, বলি দেওয়া যেতে পারে। ‘বিধিবাদীয়’ বলিতে দোষ নাই। যেমন অষ্টমীতে একটি পাঁঠা।’’ এরপরে নিজের অবস্থার কথা বলছেন, ‘আমার এখন এমন অবস্থা, দাঁড়িয়ে বলি দেখতে পারি না। ১২০ প্রসাদী মাংস এ-অবস্থায় খেতে পারি না। তাই আঙুলে করে একটু ছুঁয়ে মাথায় ফোঁটা কাটি, পাছে মা রাগ করেন।’
সংশয়ের উত্তর পুরাণও দিয়েছে, ‘ব্রহ্মা, স্বয়ং যজ্ঞের নিমিত্ত সকল প্রকার বলির সৃষ্টি করিয়াছেন, এই নিমিত্ত আমি তোমাকে বধ করি, এই জন্যে যজ্ঞে পশুবধ হিংসার মধ্যে গণ্য নয়।’ শ্রীরামকৃষ্ণ একেই বলছেন, ‘বিধিবাদীয়’। একটি ভয়ের কথা বলছেন, প্রসাদী মাংস খেতে পারেন না, তাই আঙুলে করে ছুঁয়ে মাথায় ফোঁটা কাটেন, পাছে মা রাগ করেন। পাথরের মা রাগ করতে পারেন?
অতীত ঘুরে আসি। মহাসমারোহে প্রতিষ্ঠিত হল মায়ের মন্দির। রামকুমার হলেন প্রথম পূজারি। কয়েক মাসের মধ্যেই মথুরবাবু ধরে ফেললেন তরুণ গদাধরকে। সদাই ভাবে বিভোর। কারও ধরাছোঁয়ার মধ্যে আসতে চায় না। শুধু দেখে, বাগান, ফুল, গঙ্গা, মন্দির। মথুরবাবু বললেন, তুমি হবে মায়ের বেশকার। তুমি শিল্পী, কবি ভাবুক। এইটুকুই চেনা গেছে, ধরা গেছে। রামকুমারের শরীর অপটু হওয়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ হলেন মায়ের মন্দিরের পূজারি। আর রামকুমার নিলেন রাধাগোবিন্দের অপেক্ষাকৃত সহজ পুজোর ভার। গদাধর দাদার কাছে কালীপুজো শিখেছিলেন। ‘রামকুমার তাহাকে চণ্ডীপাঠ, শ্রীশ্রী কালিকামাতা এবং অন্যান্য দেবদেবীর পূজা প্রভৃতি শিখাইতে লাগিলেন। ঠাকুর ঐরূপে দশকর্মান্বিত ব্রাহ্মণগণের যাহা শিক্ষা করা কর্তব্য তাহা অচিরে শিখিয়া লইলেন।’
শাক্তী দীক্ষা না নিলে দেবীপুজোর অধিকারী হওয়া যায় না। প্রবীণ শক্তিসাধক কেনারাম ভট্টাচার্য শ্রীরামকৃষ্ণকে শক্তিমন্ত্রে যথাবিহিত দীক্ষা দিলেন। সাধক ভট্টাচার্য মহাশয় কলকাতার বৈঠকখানা বাজারে থাকতেন। মথুরবাবু ও রামকুমারের পরিচিত। কালীবাড়িতে তাঁর যাওয়া-আসা ছিল। সম্মানিত ব্যক্তি। কানে বীজমন্ত্র পড়া মাত্রই গদাধর সমাহিত। গুরু সেই দিনই এই বুঝে গেলেন, তাঁর শিষ্য সাধারণ মানুষ নয়।
গদাধর মায়ের পূজারি হলেন। বিধিসম্মত পুজোর আড়াল থেকে প্রকাশিত হতে থাকল অলৌকিক পুজো। চাল-কলা-বাঁধা পুরোহিতরা সে-পুজোর মর্ম বুঝবেন না।
সে পুজো বিধি মানে না। ভাবের পথে চলে। পাষাণ প্রতিমা জীবন্ত হয়। বেদি থেকে নেমে এসে সাধকের সঙ্গে খেলা করেন। কথা বলেন। আবদার করেন।
