আমাদের মুখ্যমন্ত্রী জেন জি-র মনের কথা শোনার আশ্বাস দিয়েছেন। সমাজে, সংসারে, প্রেমে মনের কথার আড়াল আদৌ সরে কি?
সহজ কথা যায় না বলা সহজে। আর, মনের কথা? মনের কথার থেকে আপাতভাবে সহজ কথা আর কী হতে পারে? এবং সে-কারণেই হয়তো মনের কথাও সহজে বলা যায় না। যে-কথা বলতে চাই অথচ বলতে পারি না, সেই মনের কথা থেকে যায় মনে, কিছুতেই সরে না আড়াল, এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন আমাদের বারবার নিয়ে যায়।
আরও পড়ুন:
আবার মনের কথা শুনে সেই কথা বুঝতে পারা, তাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা, তা-ও কি পারি আমরা? সংসারে, সমাজে, সাহিত্যে, শিল্পে প্রতি নিয়ত ঘটছে মনের কথার বিচিত্র প্রকাশ। কিন্তু এই অফুরন্ত স্বার্থবাদী তাগিদ ও তাড়নার যুগে অন্যের মনের কথার প্রতি মনস্ক হওয়ার সময় আছে কি কারও? না কি চায় কেউ? মধু কবির আবক্ষ মূর্তির তলায় তাঁর আবেদন, ‘তিষ্ঠ ক্ষণকাল’, আমাদের কি মুহূর্তের জন্যেও থামায় তাঁর কালজয়ী মনের কথা শোনার জন্য?
আমাদের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর হাজার ব্যস্ততা থামিয়ে ‘জেন জি’র মনের কথা শুনবেন, আশ্বাস দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এই সংবেদী পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। কিন্তু জেন জি-রা তাদের মনের কথা খুলে বলার ভয়হীন পরিবেশ, দ্বিধাহীন পরিসর, মুক্ত পরিবৃতি পাবে তো? সম্প্রতি, আমাদের সংসারে, সমাজে, রাজনীতিতে, পরিপার্শ্বে মনের কথা বলার মুক্তাঞ্চল বড় কম বলেই মনে হয়।
আরও একটা জরুরি বিষয়, মনের কথার জীবন বড় বিপদসংকুল। কেননা, মনের কথা বলতে তো সকলেই উদ্গ্রীব। উদ্গ্রীব, গোপন কথাটি গোপনে না-রেখে ভালবাসার নৈবেদ্য হিসাবে প্রেমাস্পদর হাতে তুলে দেওয়ার। কিন্তু হায়, বোঝার লোক কোথায়। যুগে যুগে বিশ্বসাহিত্য বহন করছে মনের কথার সমস্যা ও সংকট। প্রাচীন যুগের মহাকাব্য থেকে আধুনিক যুগের মুরাকামির উপন্যাস- সর্বত্র মনের কথা ধুলায় হয়েছে ধূলি। কর্ণ ও কুন্তীর কথা ধরা যাক। মা ও ছেলের সম্পর্ক। মাঝখানে দাঁড়িয়ে কুন্তীর আর্ত অসহায়তা আর কর্ণর অভিমান ও অহং। অথচ দু’জনেই দু’জনকে বলেছেন মনের কথা। তবু কেউ কাউকে বোঝেননি। আর হারুকি মুরাকামির সাম্প্রতিক উপন্যাস, ‘দ্য সিটি অ্যান্ড ইটস আনসারটেন ওয়ালস’-এর নায়িকা একেবারে শেষে তার প্রেমিককে বলছে তার মনের গহিন কথা: আমি তোমার, যাকে তুমি ভালবাসো, সেই আমি আসল আমি নই। এরপর নায়ক কী করবে? স্বয়ং মুরাকামিও কি জানেন?
প্রেমের সম্পর্কে মনের কথার বিপদ বোধহয় সবথেকে বেশি। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ মনের কথার ভাষাকে বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত করে বলেছেন, ‘আড়ালের ভাষা’। অর্থাৎ, প্রকাশের অপ্রকাশ। অর্থাৎ, মনের কথার আড়াল কখনও সম্পূর্ণ সরে না। প্রেমের সম্পর্কে মনের কথার নিগূঢ় সন্ধানের বিপদের কথাও অব্যর্থ ইঙ্গিতে জানিয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ: আমার নয়ন তব নয়নের নিবিড় ছায়ায়/ মনের কথার কুসুমকোরক খোঁজে/ সেথায় কখন অগম গোপন গহন মায়ায়/ পথ হারাইল ও যে।’
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
