এত যুদ্ধ করে পেলাম কী? কবি সুকান্ত বলতে পেরেছিলেন, তিউনিসিয়ায় পেয়েছি জয়, ইতালিতে জনগণের বন্ধুত্ব, ফ্রান্সে পেয়েছি মুক্তির মন্ত্র…। কিন্তু একবিংশ শতকে কী বলতে পারি আমরা। ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে গুঁড়িয়ে গিয়েছে গাজার শেষ হাসপাতালটাও। গোলাগুলিতে, মিসাইল হানায় হাজার হাজার প্যালেস্তিনীয় রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত, জখম। তাঁদের চিকিৎসার সামান্যতম বন্দোবস্তটুকুও আর নেই গাজায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
যেখানে জনপদের পর জনপদ বিধ্বস্ত, মৃত্যুর হিসেবটাই যেখানে প্রহসনের মতো, সেখানে চিকিৎসাকেন্দ্র, হাসপাতাল টিকে থাকাটাই তো দুরাশা। একই পরিস্থিতি ইউক্রেনে। গুঁড়িয়ে যাওয়া শহর, আবাসনের পর আবাসনের ভগ্নস্তূপ বুকে একটা দেশে প্রতি মুহূর্তে মানুষ মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকে। তাতেও কি বলা যায়, গাজায় জয়ী হয়েছে ইজরায়েল। হয়তো প্যালেস্তিনীয় ভূখণ্ডটা দখলই করে ফেলবে একদিন। কিন্তু ধ্বংসের ওপর দাঁড়িয়ে সেই যুদ্ধ জয় তো মানবিকতার বিজয়কেতন ওড়াবে না।
জোর করে দেশ দখলে পেশিশক্তির আস্ফালন থাকে। কিন্তু যুদ্ধে হাজার হাজার নিহতের সঙ্গে কফিনবন্দি হয়ে যায় সহমর্মিতা, পারস্পরিক মর্যাদাবোধ, আন্তর্জাতিক সৌভ্রাতৃত্ব ইত্যাদি। পড়ে থাকে শুধু ধ্বংস, বিপুল ক্ষয়ক্ষতি। গাজায় এই ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী হানাদারি করতে গিয়ে ইজরায়েল ২০২৪-এর শেষদিন পর্যন্ত খরচ করে ফেলেছে ভারতীয় মুদ্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সাহায্য করতে ২০২৪-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ৬৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলেছে একা আমেরিকা।
ইউরোপীয় দেশগুলি আরও প্রায় সাড়ে ৬০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। ওই দেশগুলি ও আমেরিকা আরও যে পরিমাণ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে, তার মোট পরিমাণ প্রায় ২৬০ বিলিয়ন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২২ লক্ষ কোটি টাকা। এর বাইরে আছে যুদ্ধের জন্য ইউক্রেনের নিজস্ব ব্যয়। ভারত-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সংঘাতকে পুরোদস্তুর যুদ্ধ বলা যাবে না। তাতে হয়তো বলা যাবে, উচিত শিক্ষা দেওয়া গিয়েছে সন্ত্রাসবাদের আঁতুড় একটি রাষ্ট্রকে।
এই বয়ানে কোনও অসংগতি নেই। কিন্তু ভারতও কি কম খেসারত দিল? সীমান্তের গ্রামগুলিতে অন্তত ১০ হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। প্রাণহানির খবরও আছে। শেষপর্যন্ত যুদ্ধবিরতি না হলে একটি সমীক্ষার হিসেব অনুযায়ী ভারতের রোজ খরচ হতে পারত ন্যূনতম ১৪৬০ কোটি টাকা। তবে দৈনিক সেই ব্যয় ৫ কোটি পর্যন্ত হতে পারত বলেও আভাস আছে।
গাজা বা ইজরায়েল, রাশিয়া বা ইউক্রেন, ভারত বা পাকিস্তান, যুদ্ধ যাদের মধ্যেই হোক, সেই খরচ তুলতে হয় সংশ্লিষ্ট দেশের সাধারণ নাগরিকদের পকেট কেটে। হয় যুদ্ধের নামে নতুন কোনও কর বসিয়ে বা বাজেটে বিভিন্ন খাতে শুল্কহার বৃদ্ধি করে। যা-ই করা হোক, তাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হয় অনিবার্য। দিনের পর দিন যুদ্ধ চললে কী পরিমাণ ক্ষতি, কী পরিমাণ খরচ- তার আভাস দিচ্ছে প্যালেস্তিনীয় ভূখণ্ড এবং ইউক্রেন।
ভোলার উপায় নেই, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝে যে প্রবল আর্থিক মন্দা নেমে এসেছিল, তা সামলাতে সময় লেগেছিল প্রায় ১০ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে কিংবা ১৯৬২-র চিন-ভারত যুদ্ধের পর আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া দাম, জীবনযাত্রার মানের নিম্নমুখী প্রবণতা ইতিহাস হয়ে আছে। যুদ্ধ তো রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র সেই যুদ্ধে নাগরিকদের শামিল করে নেয়। জয়, বিজয় যাই হোক না কেন, সেটা শাসকের।
নাগরিকের জন্য পড়ে থাকে সেই ‘নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালাবার সামর্থ্য।’ যুদ্ধে আপত্তি প্রকাশ করলে, এর অসারতা নিয়ে বলতে চাইলে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়ার নতুন প্রবণতা এখন চারদিকে। কিন্তু ভেবে দেখার সময় এসেছে, সুকান্তের ভাষায়, জয়, বন্ধুত্ব বা মুক্তির মন্ত্রের বদলে ‘আজ যত যুদ্ধবাজ দেয় হানা/ হামলাবাজ/ আমাদের শান্তি সুখ করতে চায়/ লুঠতরাজ।’
The submit জিঘাংসার বিষে নীল appeared first on Uttarbanga Sambad.
