জনরোষের মোক্ষম হাতিয়ার নিটোল ডিম

জনরোষের মোক্ষম হাতিয়ার নিটোল ডিম

শিক্ষা
Spread the love


চিরঞ্জীব রায়

সেদিন সোনারপুরের রাস্তার ধারে একদল মহিলা পরম ‘টার্গেট’-এর অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। হাতে তাঁদের মারাত্মক অস্ত্র— এক-একটি নিটোল কাঁচা ডিম। ইতিহাস সাক্ষী, এই ছবির স্থান-কাল-পাত্র অনায়াসে বদলে দেওয়া যায়। স্থানটি নিমেষেই হয়ে যেতে পারে প্রাচীন রোম নগরী বা রোমান সাম্রাজ্যের কোনও এক উত্তাল সময়। আর লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন কোনও দাপুটে রাষ্ট্রনেতা, যাঁর চারপাশ ঘিরে ধরেছেন একদল ক্ষুব্ধ রোমান নারী। যুগের পরিবর্তনে মানুষের পোশাক কিংবা প্রতিবাদের ভাষা বদলালেও, কেবল হাতের ওই ছোট্ট ডিমটি কিন্তু এক্কেবারে অপরিবর্তিতই রয়ে গিয়েছে।

তৃতীয় সুর, ষষ্ঠ সুর… রাজরোষের শিকার হয়ে নিরীহ তরুণ গুপি হাস্যকর সাজে গাধার পিঠে চড়ে গ্রামছাড়া হল। অথবা ভরা রাজসভায় দুষ্ট চূড়ামণি ধৃষ্টতা দেখিয়ে রাজবধূর বস্ত্রহরণে প্রবৃত্ত হল। এই সবই সেই আদিকাল থেকে কোনও ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীকে জনসমক্ষে প্রকাশ্যে চরম অসম্মানিত করার অতি চেনা পন্থা। জাতি-ধর্ম-দেশ-কাল-সংস্কৃতি নির্বিচারে প্রকাশ্যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের এই প্রাচীন প্রথা বিশ্বজুড়ে চলেই আসছে। কখনও সামাজিক শাস্তি দিতে, কখনও অন্যায় নিবৃত্ত করতে, কিংবা কখনও স্রেফ নিজের শাসন জাহির করতে বা প্রতিহিংসা নিতে এই পথ বেছে নেওয়া হয়।

কখনও কারণে, কখনও অকারণে নানাবিধ রূপ ধারণ করে জনরোষ আছড়ে পড়েছে। জনগণের উদ্দাম ক্ষোভ মানুষের মনের দখল নিলে সুস্থ বিচারবুদ্ধি কাজ করার সুযোগ পায় না। ফলে হেনস্তার শিকার হওয়া মানুষটির ব্যক্তিগত মর্যাদা বা মানবাধিকার লুণ্ঠিত হল কি না, উন্মত্ত জনতা তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আমল দেয় না। মধ্যযুগীয় এবং সদ্য আধুনিক হয়ে উঠতে থাকা ইউরোপ কিংবা ঔপনিবেশিক আমেরিকায় তথাকথিত দোষীকে কাঠের খাঁচায় ভরে প্রকাশ্যে রাখা হত। আমজনতা যাতায়াতের পথে তাদের নিয়ে চূড়ান্ত ঠাট্টাতামাশা করত, আবর্জনা ছুড়ে মারত, থুতু দিত। সুতরাং, গাধার পিঠে চড়া আমাদের গুপি গায়েনই প্রথম নয়। হাস্যকর পোশাক পরিয়ে কিংবা নগ্ন করে উলটো গাধার পিঠে চড়ানোর এই ‘স্কিমিংটন রাইড’-এর প্রথা তখনও পশ্চিমা সমাজে বেশ জনপ্রিয় ছিল।

ডাইনি অপবাদ দিয়ে কিংবা যৌন অনাচারের অভিযোগে নারীকে নগ্ন করে ঘোরানো বা মাথা কামিয়ে দেওয়ার প্রথা মোটেই কেবল ভারতের অশিক্ষিত গ্রামগঞ্জের নিজস্ব আবিষ্কার নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তী সময়েও তথাকথিত সভ্য, শিক্ষিত ইউরোপ তাদের দেশের  ‘ভ্রষ্টা’ নারীর জন্য অবিকল একই শাস্তির বিধান করত। নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দিদের মাথা কামিয়ে দেওয়া ছিল এমনই এক পরিচিত অপমানজনক প্রক্রিয়া। পাশ্চাত্যের গণশাস্তিতে সরাসরি পিটিয়ে মারার উদাহরণ কিছুটা কম হলেও নৃশংসতার অভাব ছিল না। কখনও ‘দোষী’-র সারা দেহে আলকাতরা মাখিয়ে তার ওপর পাখির পালক সেঁটে দিয়ে নগর পরিক্রমা করানো হত। আরও কড়া শাস্তির ক্ষেত্রে অপরাধীকে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করতে কান কেটে নেওয়া হত— অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আংশিক বা পুরোটাই। এর পাশাপাশি অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও মানসিক নির্যাতন ছিল এবং আছে; আজ সমাজমাধ্যমের খবরদারিতে যার আধুনিক নাম হয়েছে ‘ট্রোল’।

আইন এখন অনেক কড়া ও তীক্ষ্ণ হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষা গুরুত্ব পাওয়ায় প্রতিবাদ-প্রতিরোধের জেরে প্রাচীন গণশাস্তি তেমন নখদাঁত বের করতে পারে না। তাই প্রত্যন্ত গ্রামে আজও মাথা মুড়িয়ে দেওয়া গেলেও, কান কেটে নেওয়ার উদ্যোগ বা উৎসাহ মানুষকে বাধ্য হয়েই সংবরণ করতে হয়। কিন্তু দেশ-কাল-সংস্কৃতির সমস্ত বেড়াজাল ভেঙে আদি ও অকৃত্রিম সেই নিটোল বস্তুটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা জনরোষের অস্ত্র হিসেবে, অথবা নিছক সামাজিক সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে সুযোগ পেলেই আজও বিশ্বময় মানুষের হাতে হাতে উঠে আসে। এই ডিম নিক্ষেপ কান কেটে নেওয়ার মতো স্থায়ী শারীরিক নির্যাতন করে না ঠিকই, কিন্তু অতি নীরবে সর্বসমক্ষে একজনের মান এক লহমায় ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। লক্ষ্যবস্তুর পুরো অস্তিত্বটাকেই নিমেষের মধ্যে চূড়ান্ত দুর্গন্ধযুক্ত এবং অস্পৃশ্য করে দিয়ে যায়।

ইতিহাসের পথ বেয়ে পিছনে হাঁটলে মধ্যযুগের ইউরোপে প্রকাশ্য হেনস্তার অস্ত্র হিসেবে ডিমের প্রথম পরিচয় মেলে। দেখা যাচ্ছে, ছোটখাটো চোরছ্যাঁচড় ধরা পড়লে তাদের ভিড় বাজারের নির্দিষ্ট থামের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে জনগণ মহোৎসবে কাঁচা ডিম ও পচা সবজি ছুড়ে মারছে। তবে ডিমের প্রথম শিকার কে ছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কিছু প্রাচীন জনশ্রুতি অনুযায়ী, আনুমানিক ৬৩ খ্রিস্টাব্দে রোমান গভর্নর ভেসপাসিয়ানের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ইহুদিরা প্রথম কাঁচা ডিম ছুড়েছিল। ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীতে সম্মানহানির এই আপাত নিরীহ অথচ অত্যন্ত কার্যকরী পদ্ধতিটির জনপ্রিয়তা ও পরিসর দুই-ই বাড়ল। কাঁচা ডিম এবার সটান ঢুকে পড়ল এলিজাবেথান থিয়েটার থেকে শুরু করে আমেরিকা ও কানাডার জনপ্রিয় ‘ভওডভিল’ থিয়েটারের হলে। অভিনেতাদের খারাপ অভিনয় দেখলেই দর্শক পরম সমাদরে তাঁদের ডিম ছুড়ে স্বাগত জানাতে লাগলেন— যা ছিল হাতেনাতে শিল্পের নির্মম সমালোচনা এবং বিনোদনের মাঝেই আর এক রগরগে উপরি বিনোদন!

শতাব্দী গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র মজবুত হল। সেইসঙ্গে বিপ্লব, বিদ্রোহ ও জনরোষ প্রকাশের ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি ডিমের মাহাত্ম্যও বহুগুণ বৃদ্ধি পেল। সমাজবিরোধীদের দিয়ে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা ভায়া থিয়েটারের ফ্লপ অভিনেতা হয়ে অবশেষে রাজনেতাদের দরজায় গিয়ে পৌঁছাল। কাঁচা ডিম কোন এক অলক্ষ্য অনবধানে রাজনৈতিক প্রতিবাদের অত্যন্ত মানহানিকর এক অস্ত্রের চেহারা নিল। ১৯১০ সালে নারীর ভোটাধিকারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া ব্রিটিশ সাফ্রেজেট আন্দোলনের কর্মী এথেল মুরহেডের নাম যেমন উইনস্টন চার্চিলের সভায় ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িয়ে আছে, তেমনই ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাক্তন গভর্নর আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার থেকে শুরু করে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের নামও উঠে গিয়েছে এই উড়ন্ত ডিমের ঘায়ে অসম্মানিতদের তালিকায়।

১৯৯২ সালে নির্বাচনি প্রচারের সময় কাঁচা ডিমের হলদে তরল ভিজিয়ে দিয়েছিল প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজরের দামি সুট। ছাড় পাননি উপ প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটও। ২০০১ সালের মে মাসে নর্থ ওয়েলসে ক্রেইগ ইভ্যান্স নামের এক কৃষিকর্মী সরাসরি তাঁর মুখে ডিম ছুড়ে মারেন। প্রাক্তন বক্সার প্রেসকট অবশ্য থমকে না গিয়ে পালটা এক জবরদস্ত ঘুসি চালিয়ে বসেন, যা নিয়ে সাধারণ নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বেশ শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও অবশ্য এই নিয়ে আশ্বস্ত হওয়া উচিত যে, তিনি বেশ নামী আন্তর্জাতিক দলেই আছেন; কারণ মাত্র কিছুকাল আগেই, ২০২২ সালে, ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের দিকে ‘নট মাই কিং’ স্লোগান তুলে ক্ষুব্ধ জনতা দু’-দু’বার ডিম ছুড়েছিল।

প্রশ্ন হল, মারণাস্ত্র বোমা থেকে শুরু করে সাধারণ ইট-পাটকেল বা পাথর থাকতেও মানুষ বারবার এই ডিমের শরণাপন্নই বা কেন হয়? ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, ডিম ছোড়ার এই বিশেষ ‘সংস্কৃতি’ যেখানে শুরু হয়েছিল, সেই প্রাচীন রোমে সেকালে খামারবাড়ির অভূতপূর্ব রমরমা ছিল। সেইসব খামারে প্রচুর হাঁস-মুরগি পোষা হত, ফলে নিত্যদিনের খাওয়াদাওয়ার পরেও ছুড়ে মারার জন্য পর্যাপ্ত ডিম বেঁচে থাকত। তাই মানসম্মান ধুলোয় মেশাতে এই সহজলভ্য বস্তুটিই জনগণের হাতে পরম আস্থার হাতিয়ার হিসেবে উঠে আসে। তাছাড়া পাথর বা বোমা ছুড়লে মারাত্মক জখম বা মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে, যা হেনস্তাকারীকে খুনের মামলায় ফেঁসে চরম বিপদে ফেলতে পারে। ওদিকে ডিমের ঘায়ে গুরুতর আঘাতের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলেও, ডিম নিঃসৃত তীব্র দুর্গন্ধের তরল তৎক্ষণাৎ টার্গেটকে এক চরম তামাশার ও ঘৃণার পাত্র বানিয়ে ছাড়ে। রাজপথে হাতে ডিম নিয়ে ঘোরা বোমা নিয়ে ঘোরার মতো বেআইনিও নয়, কিন্তু জনরোষ প্রকাশ করতে কাউকে মুহূর্তের মধ্যে হীন প্রতিপন্ন করার পক্ষে এক্কেবারে আদর্শ।

ঠিক এই কারণেই বাংলার রাজনৈতিক ময়দানেও আজ ডিমের এমন রমরমা উপস্থিতি। সোনারপুরের সাম্প্রতিক কাণ্ড কিংবা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক আবহাওয়াকে ঘিরে তৈরি হওয়া চাপা উত্তেজনা— এই সবই আসলে সেই আদিম ও আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিক ধারারই এক-একটি আধুনিক সংস্করণ। ইট-পাথরের রক্তক্ষয়ী হিংস্রতাকে এড়িয়ে প্রতিপক্ষকে জনসমক্ষে চূড়ান্ত অপদস্থ ও ট্রোল করার এই চতুর কৌশল যেন আজ এ দেশের রাজনীতিরও অলিখিত ব্যাকরণ হয়ে উঠেছে। সুতরাং, সমাজে ধূর্ত নেতা থেকে ব্যর্থ অভিনেতা যতদিন থাকবেন, এবং থাকবেন তাঁদের ঘিরে মানুষের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ, ততদিন এই সস্তা কাঁচা ডিমও প্রতিবাদের ময়দানে নিজের পূর্ণ স্বমহিমায় বিরাজ করবে। তাতে আর সন্দেহ কী!

(লেখক প্রাবন্ধিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *