- অপরাজিতা কুণ্ডু
স্বপ্ন- কী ভীষণ মায়াময় একটা শব্দ! সেই মায়ায় যাঁরা জড়িয়েছেন তাঁরাই কেবলমাত্র বোঝেন খর দুপুরের আধো-অন্ধকার ঘরের খসখস টাঙানো জানলার আর্দ্র মুগ্ধতা। সেই স্বপ্নিল জাদু তার জাদুকাঠির পরশে রঙিন অভ্রগুঁড়ো ছড়িয়ে দেয় বাতাসে বাতাসে। তারপর শুধু হাত মুঠো করার অপেক্ষা। তারপর শুধু একবুক আশা নিয়ে ঋজুতার অপেক্ষা। তারপর অপেক্ষার অবসানে শুধুই গোধূলির রাঙা আলো।
আমরা স্বপ্ন দেখি। আমরা স্বপ্ন দেখাই। আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু স্বপ্ন কেন দেখি, ঘুমের কোন পর্যায়ে দেখি, সাদা-কালো নাকি রঙিন স্বপ্ন দেখি! এই সমস্ত কঠিন কঠিন তত্ত্ব কথায় আলো ফেলার জন্য তো স্বপ্ন বিজ্ঞানীরা রয়েছেন। হাতের কাছে গুগল দাদাও মজুত। আমরা বরং কিছুক্ষণ মজে থাকি স্বপ্নময় রূপকথায়।
মাথার মধ্যে হাজারো বোঝা নিয়ে ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্নের পালা শেষে চমকে জেগে ওঠার অভিজ্ঞতার সম্মুখীন জীবনের কোনও না কোনও পর্যায়ে আমরা প্রায় সকলেই হই। আবার সুখস্বপ্নের রেশে ঠোঁটের কোণে আলতো হাসির প্রসাধনে স্নিগ্ধ ঘুমও আমাদের বড় প্রিয়। কিন্তু এসবই তো শারীরবৃত্তীয় কথা। তাতে আমাদের তেমন আগ্রহ নেই। থাকবেই বা কী করে! ছোট থেকেই যে আমাদের নিজস্ব একটা জগৎ গড়ে ওঠে, একটা সোনা-সোনা রূপকথার জগৎ, একটা স্বপ্নের জগৎ।
প্রতিমা নির্মাণের মতোই অবচেতন মনে স্বপ্ন-কাঠামোর অন্বেষণ চলে; ধীরে ধীরে খড়, মাটির পরতে আদল পেতে থাকে আমাদের স্বপ্ন। রাঙিয়ে দিয়ে যায় আমাদের। নানা রঙের দিনগুলিতে হারিয়ে যাই আমরা। তারপর! খুঁজে পাই নিজেদের? প্রতিমাতে চক্ষুদান, প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়? হয়, কারণ কথাতেই আছে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। তাই নিজ স্বপ্নে যাঁরা বিশ্বাস করেন, ভরসা রাখতে পারেন ভবিষ্যৎ করায়ত্ত হয় তাঁদেরই।
জীবনানন্দ চেয়েছিলেন স্বপ্নের হাতে নিজেকেই তুলে দিতে (কবিতা : স্বপ্নের হাতে), অমলকান্তি ‘রোদ্দুর হতে চেয়েছিল’। এই সবই তো কল্পনার উড়ান। বাস্তবেও কত ছোট ছোট স্বপ্ন ফোটে প্রতিদিন, সুবাস ছড়ায়; দিনের শেষে একবুক শান্তি নিয়ে ঘুমন্ত রাত পার করে স্বপ্ন দেখা সাহসী মনটা। সেইসব স্বপ্নের রূপ-রং-আকার-প্রকৃতি-কাল-ভাষা-উপলক্ষ্য ভিন্ন হলেও লক্ষ্য এক, হয়তো বা যাপনও এক। চায়ের দোকানে কাপ ধোয় পাশের বস্তির যে ছোট্ট ছেলেটা, সে প্রতিরাতে উলটো দিকের ফুটপাথের আইসক্রিম ভ্যানটাকে যখন স্বপ্নে দেখে তখন তার ছেঁড়া কাঁথা গোলাপি গোলাপি গন্ধ ছড়ায়। কোনওক্রমে কোনও এক শুভক্ষণে এক স্কুপ স্ট্রবেরি আইসক্রিম যদি তার মুখে গলেই যায় স্বপ্নপূরণের তৃপ্তি ঘিরে থাকে তাকে সারাদিন। একইসঙ্গে রাতের গোলাপিগন্ধী গল্পটা হারিয়ে ফেলে সে। কোনটা বেশি মন খারাপের নিক্তিতে মেপেও তাই বুঝে ওঠা যায় না সর্বদা।
তবে কি স্বপ্নেই রয়েছে রোমাঞ্চ? যা কিছুই অধরা তাতেই সুখ? না, তা কি হতে পারে! তাহলে তো ভবিষ্যতের ভাঁড়ার শূন্যই থাকত। কারণ আগামীই স্বপ্ন। আগমনীর সুরেই থাকে পূর্ণতার ছন্দ। আর কে না জানেন স্বপ্নে রাঁধা পোলাওতে ঘি একটু বেশিই দিতে হয়। গোলাপ বাগানের স্বপ্ন নিয়ে পথ চলা শুরু করলে উত্তরের ব্যালকনিতে ছোট্ট টবে দুটো গোলাপের সৌন্দর্য উপভোগ যে নিশ্চিত এই কথা বলাই বাহুল্য। তাই স্বপ্ন দেখতে হবে। দেখতেই হবে। লক্ষ্যহীন জীবন আর মাস্তুল ভাঙা নৌকোর অভিন্নতা যে একই রকম পীড়াদায়ক।
আমাদের প্রকৃতি যেমন ভিন্ন, আমাদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত স্বপ্নগুলোও বিভিন্ন। রুচি, সাধ, মূল্যবোধ, মননশীলতা আমাদের স্বপ্নের ভিত গড়ে দেয়। তাই আমরা কেউ বয়ে বেড়াই অনুস্বপ্ন, কাউকে তাড়িয়ে বেড়ায় স্বপ্নের ধারাবাহিকতা। কারও স্বপ্ন একান্তই নিজস্ব, কেউ বহন করে উত্তরাধিকার। দিন শেষে সন্তানের মুখের হাসি, পেট ভরা খাবার, নিশ্চিন্তির ঘুমের স্বপ্নে ঘাম ঝরায় কেউ বারোমাস। কেউ ঘর-দোর ছেড়ে উপচিকীর্ষার স্বপ্নে হয় বিভোর।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সৃষ্ট অমর চরিত্র লালু যেমন প্রাণের মায়া ত্যাগ করে কলেরায় মৃত দেহ দাহ করতে পিছুপা হত না, তেমনই অনেক মানুষ বাস্তবেও আমাদের চারপাশেই রয়েছেন। করোনাকালীন সময়ে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে, গাছ এবং নদী বাঁচাও প্রকল্পে, সাম্প্রতিকতম উত্তরবঙ্গের অসহনীয় বিধ্বংসী অবস্থায় তাঁদের ভূমিকা আমরা দেখেছি, দেখি। এই বিবেকের উচাটনও এক জীবনানন্দীয় স্বপ্ন।
প্রকৃতপক্ষে জীবন ও স্বপ্ন পরস্পরের প্রতিবিম্ব। স্বপ্ন ও লক্ষ্যহীন জীবন মৃত্যুরই নামান্তর। স্বপ্ন ব্যতীত সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয় কখনোই। পৃথিবীর তাবড় তাবড় সফল ব্যক্তি তাঁদের বুকের মাঝে স্বপ্ন লালন করেন এবং তা বাস্তবে রূপায়িত করতে হাসিমুখে সংগ্রাম করেন। তবেই যাপন করতে পারেন সফল জীবন। স্বপ্নের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসই তাঁদের আগামীর পথ চলার পাথেয়।
তবে এই কথাও সব সময় বলা যায় না যে, স্বপ্ন-পরিশ্রম-সফলতার মতো ত্রিমাত্রিক কোনও বিধি রয়েছে। সূত্র মেনে জীবন চলে না, স্বপ্ন তো নয়ই। যথাযথ এবং কঠোর পরিশ্রম করেও ব্যর্থতা আসতেই পারে। কিন্তু হাল ছাড়া যাবে না। ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু।’ পরাজয়ের ভয়, ব্যর্থতার ভয়, সমালোচনার ভয়ে কুঁকড়ে গেলে কাল-আজ-আগামীর কোনও স্বপ্ন, কোনও প্রত্যাশাই পূরণ হবে না। ইচ্ছেপূরণের চাবিকাঠিটা নিজের হাতেই রাখতে হয়। উঠে দাঁড়াতে হয়, ঘুরে দাঁড়াতে হয়, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের ময়দানে থাকতে হয়। একই স্বপ্ন বারবার দেখে ক্লান্ত হলে নিজেকেই ঘৃণা করতে শিখতে হয়। নতুন স্বপ্নও বুনতে হয়। তাই যদি ইচ্ছে হয় কোনও এক নতুন দিনে, এক অন্যরকম নতুন ভোরে জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাফল্যকে চুম্বন করতেই হবে, তবে চুরি হতে দেওয়া যাবে না নিজেকেই ‘পালটে দেওয়ার স্বপ্ন’।
‘আমার কিন্তু স্বপ্ন দেখতে আজও ভালো লাগে…।’
