জয়জিৎ বণিক
হাতের স্মার্টফোনটা অন করুন। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপের ইনবক্সে যে ভিডিওটা সবেমাত্র ফরওয়ার্ড করলেন, কিংবা রিলস স্ক্রল করতে করতে যে স্লোগানটা আপনার মনে গেঁথে গেল- ওটা কিন্তু কাকতালীয় নয়। ওটা আসলে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কোনও ‘ওয়াররুমে’ বসে থাকা এক অদৃশ্য বাহিনীর নিখুঁত ছক।
আজকের রাজনীতি আর ময়দানের ধুলোবালি মাখা সেই পুরোনো ‘মিছিল-মিটিং’-এ আটকে নেই। এখন খেলাটা হয় ল্যাপটপের নীল আলোয়, এক্সেল শিটের জটিল অঙ্কে, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মগজাস্ত্রে। সামনেই ২০২৬-এর মহাযুদ্ধ। বাংলার মাটি দখলের লড়াইয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সেনাপতিদের নাম আমরা সবাই জানি। কিন্তু এঁদের পেছনে যে ‘অদৃশ্য সৈনিক’রা দিনরাত এক করে রণকৌশল সাজাচ্ছেন, তাঁদের ক’জন চেনে? আইআইএম বা ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট (আইএসআই) থেকে পাশ করা ঝকঝকে তরুণ-তরুণী, যাঁরা হয়তো কোনওদিন রাজনীতির পতাকাই ধরেননি, আজ তাঁরাই ঠিক করে দিচ্ছেন- নেতা কী বলবেন, কোথায় যাবেন, আর কার সঙ্গে হাত মেলাবেন।
কর্পোরেট চাণক্য ও আইপ্যাক রহস্য
একসময় রাজনীতি ছিল ‘নেতা’ আর ‘কর্মী’র আবেগের সমীকরণ। আজ সেখানে ঢুকে পড়েছে ‘পলিটিকাল কনসালট্যান্ট’ বা রাজনৈতিক পরামর্শদাতা। প্রশান্ত কিশোর বা পিকে এখন দৃশ্যত নেই, কিন্তু তাঁর তৈরি করা সেই ‘কর্পোরেট মডেল’ এখন তৃণমূল কংগ্রেসের ধমনীতে মিশে গিয়েছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই আমূল পরিবর্তনের প্রধান কান্ডারি। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগ বা ‘ক্যারিশমা’ দিয়ে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ঝেড়ে ফেলে নির্বাচনের বৈতরণি পার হওয়া কঠিন। তাই দরকার পেশাদারিত্ব। আজ তৃণমূল ভবনের অন্দরে কান পাতলে শোনা যায়, কোন প্রার্থীর নাম তালিকায় থাকবে আর কে বাদ পড়বেন- তা ঠিক করতে স্থানীয় প্রভাবশালী ‘দাদা’ বা ‘দিদি’দের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় আইপ্যাকের সার্ভে রিপোর্ট।
এই তরুণ তুর্কিরা- যঁাদের অনেকেই আইআইটি বা ন্যাশনাল ল’ স্কুল থেকে পাশ করা- গ্রামে গ্রামে ঘুরে ডেটা সংগ্রহ করেন। কার জনপ্রিয়তা কমছে, কার বিরুদ্ধে কাটমানির অভিযোগ- সব তথ্য নিমেষে পৌঁছে যায় ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের দপ্তরে। ইডি যখন আইপ্যাকের দপ্তরে হানা দেয়, তখন বোঝা যায় এই ‘অদৃশ্য শক্তি’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিরোধীরাও জানে, তৃণমূলের আসল ‘ব্রেন’টা কোথায় লুকিয়ে আছে।
‘অগ্নিকন্যা’ থেকে ‘বাঘিনী’: ব্র্যান্ডিংয়ের নতুন খেলা
রাজনীতিতে এখন ‘ইমেজ’ বা ভাবমূর্তিই সব। আর এই ইমেজ তৈরির কারিগররাই ঠিক করে দেন, কখন মমতাকে ‘স্নেহময়ী দিদি’ সাজতে হবে, আর কখন হতে হবে ‘ক্ষুরধার বাঘিনী’। একটা সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর অনুগামীরা ‘অগ্নিকন্যা’ বলতেন। সেটা ছিল বাম জমানার লড়াইয়ের প্রতীক। কিন্তু ছাব্বিশের ভোটের আগে আইপ্যাক বুঝেছে, এখন দরকার এক লড়াকু অভিভাবকের ইমেজ। সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আইপ্যাকের তৈরি ভিডিওটি খেয়াল করেছেন? ১ মিনিট ৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মমতা মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে তুলে দাঁড়িয়ে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সেই ছবিই গ্রাফিকসের জাদুতে রূপ নিচ্ছে এক ক্রুদ্ধ ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগ্রেস’-এ।
এটা শুধুই ভিডিও এডিটিং নয়, এটা ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। কয়েক মাস আগেই মমতা বলেছিলেন, ‘আহত বাঘ কিন্তু ভয়ংকর।’ সেই কথাটিকেই ভিজুয়াল এফেক্ট দিয়ে মানুষের অবচেতনে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’- অভিষেকের মুখ দিয়ে এই স্লোগান প্রথম বের হলেও, এর জন্ম কিন্তু কোনও এসি ঘরের হোয়াইট বোর্ডে। স্ট্র্যাটেজিস্টরা জানেন, বাঙালি আবেগপ্রবণ, তাই বাঘের উপমা তাঁদের রক্ত গরম করবেই। মমতার এই ‘রিব্র্যান্ডিং’- অগ্নিকন্যা থেকে বাঘিনী- নেপথ্যের এই কারিগরদেরই মস্তিষ্ক প্রসূত।
বিজেপির ‘ওয়াররুম’: সংঘ ও প্রযুক্তির ককটেল
অন্যদিকে, বিজেপির রণকৌশল একটু আলাদা। তারা পুরোপুরি আউটসোর্সিং-এ বিশ্বাসী নয়। তাদের শক্তি হল- আরএসএস-এর সাংগঠনিক ভিত্তি আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ‘মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট’। বিজেপি এবার বাংলাকে বেশ কয়েকটি ‘জোন’-এ ভাগ করে হাইটেক ‘ওয়াররুম’ খুলেছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ, যা বিজেপির শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত, সেখানে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রদীপ ভাণ্ডারীর মতো জাতীয় মুখপাত্রদের আনাগোনা সেখানে এমনি এমনি নয়। এঁরা টিভি ডিবেটে যেমন দাপিয়ে বেড়ান, তেমনই নেপথ্যে থেকে উত্তরবঙ্গের জনবিন্যাস বা ডেমোগ্রাফিক সমীকরণ অনুযায়ী ঘুঁটি সাজাচ্ছেন।
বিজেপির এই ‘অদৃশ্য বাহিনী’-তে একদিকে যেমন আছেন নীতিন নবীন বা মঙ্গল পান্ডের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা, তেমনই আছেন অমিত মালব্যর আইটি সেলের যোদ্ধারা। এঁদের কাজ শুধু প্রচার নয়, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ‘ন্যারেটিভ’ সেট করা। সন্দেশখালি হোক বা আরজি কর- সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুনের মতো হ্যাশট্যাগ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটা এঁরাই করেন এবং অস্বীকার করার উপায় নেই, এই ‘ফেক নিউজ’ বা ‘এডিটেড ক্লিপ’-এর যুদ্ধে বিজেপি তৃণমূলকে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছে।
নেপথ্যের কারিগর : এক নতুন কেরিয়ার
একসময় ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সবাই চাইত গুগল বা মাইক্রোসফটে চাকরি করতে। এখন ট্রেন্ড বদলেছে। আইআইএম আহমেদাবাদ বা বেঙ্গালুরুর ছাত্ররা এখন ইন্টার্নশিপ করছেন রাজনৈতিক দলের ‘স্ট্র্যাটেজি টিম’-এ। বেতন বা প্যাকেজ? কর্পোরেট সিইও-দেরও ঈর্ষা জাগাবে! কেন এই আকর্ষণ? কারণ এখানে শুধু টাকা নয়, আছে ক্ষমতাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ। কোন বুথে কত শতাংশ হিন্দু বা মুসলিম ভোট আছে- তার নিখুঁত অঙ্ক কষে দেওয়াই এঁদের কাজ। নেতার বক্তৃতায় কোথায় পজ দিতে হবে, কোন শব্দটা জোর দিয়ে বলতে হবে- সবটাই স্ক্রিপ্টেড। আমরা যে স্বতঃস্ফূর্ত ভাষণ শুনে হাততালি দিই, তা আসলে বহুবার রিহার্সাল দেওয়া পারফরমেন্স।
বাম-কংগ্রেস : মান্ধাতা আমলের হাতিয়ার?
লড়াই যখন হাইটেক মিসাইলের, তখন বাম আর কংগ্রেস যেন এখনও লাঠি-সড়কি নিয়ে যুদ্ধ করছে। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট বা বিধান ভবনে এখনও সেই পুরোনো ধাঁচের মিটিং, লিফলেট বিলি আর মিছিলের ওপর ভরসা। তাঁদের কোনও ‘প্রশান্ত কিশোর’ নেই, নেই কোনও ‘আইটি সেল’-এর সংগঠিত আক্রমণ। সিপিএমের তরুণ প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ঠিকই, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়রা মাঠ কাঁপাচ্ছেন, কিন্তু তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে। কোনও পেশাদার সংস্থা দিয়ে ‘ইমেজ মেকওভার’ বা ‘ডেটা অ্যানালিটিক্স’-এর পথে তারা হাঁটেনি। তাদের যুক্তি, রাজনীতি আদর্শের ব্যাপার, ব্যবসার নয়। শুনতে ভালো, কিন্তু ছাব্বিশের বাংলা কি শুধু আদর্শ দিয়ে চলে? ভোটাররা যখন রিলস আর শর্টস-এ আসক্ত, তখন লম্বা ইস্তাহার কে পড়বে? এই ‘অদৃশ্য ফায়ারপাওয়ার’-এর অভাবেই কি তারা বারবার পিছিয়ে পড়ছে?
গণতন্ত্র নাকি ডেটাতন্ত্র?
দিনশেষে প্রশ্ন একটাই- আমরা কি নেতা বাছছি, নাকি কোনও চতুর স্ট্র্যাটেজিস্টের সাজানো পণ্যের ক্রেতা হচ্ছি? ভোটের আগে যে প্রতিশ্রুতি বা ‘গ্যারান্টি’র বন্যা বয়ে যায়, তা কি নেতার মনের কথা, নাকি কোনও কনসালট্যান্টের ল্যাপটপে তৈরি করা ‘উইনিং ফর্মুলা’? মমতার ‘বাঘিনী’ ইমেজ বা মোদির ‘বিশ্বগুরু’ অবতার- সবই আজ সযত্নে নির্মিত। মঞ্চে আমরা যাঁদের দেখি, তাঁরা আসলে কুশলী অভিনেতা। আসল চিত্রনাট্যকাররা বসে আছেন পর্দার আড়ালে, অন্ধকারের ওপারে। ছাব্বিশের নির্বাচনেও আসল লড়াইটা হবে এই দুই ‘অদৃশ্য বাহিনী’র মধ্যে। আর আমরা, সাধারণ ভোটাররা? আমরা হচ্ছি শুধুই ‘ডেটা পয়েন্ট’—যাদের পছন্দ-অপছন্দকে অ্যালগরিদমে ফেলে অঙ্ক কষা হচ্ছে।
(লেখক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক)
