পীযূষ গোয়েল
একটা সময় ছিল যখন ভালো ছাত্র মানেই ছিল—হয় ডাক্তার, নয় ইঞ্জিনিয়ার, আর নিদেনপক্ষে সরকারি অফিসের বড়বাবু। বাবা-মায়েরাও এর বাইরে কিছু ভাবতে ভয় পেতেন। ‘ব্যবসা’ বা ‘উদ্যোগ’ শব্দগুলো মধ্যবিত্ত ড্রয়িংরুমে খুব একটা জাতে উঠত না। কিন্তু হাওয়া বদলাচ্ছে এবং সেই বদলটা এতটাই জোরালো যে খোদ আন্তর্জাতিক দুনিয়াও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে। স্টার্টআপ ইন্ডিয়া (Startup India) উদ্যোগের হাত ধরে ভারতে এক নতুন অর্থনীতির জন্ম হচ্ছে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম আর ‘চাকরিপ্রার্থী’ নয়, বরং ‘চাকরিদাতা’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’-এর যে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, তার আসল কারিগর কিন্তু এই ঝুঁকি নেওয়া তরুণ তুর্কিরাই।
বিশ্বের স্টার্টআপ মানচিত্রে ভারত এখন প্রথম সারির খেলোয়াড়। ২০১৫ সালে লালকেল্লা থেকে যখন স্টার্টআপ ইন্ডিয়ার ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন অনেকেই একে নিছক রাজনৈতিক চমক ভেবেছিলেন। কিন্তু এক দশক পর ফিরে তাকালে দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রতিটি জেলা ও ব্লকে উদ্যোগের চারাগাছটি মহীরুহে পরিণত হতে শুরু করেছে। ২০১৬ সালে সরকারিভাবে এই প্রকল্পের সূচনার পর থেকে তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি থেকে নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই পুরোনো খোলস ছেড়ে নতুনের আবাহন।
ভারত মানেই শুধু সস্তায় শ্রম—এই তকমা ঝেড়ে ফেলার সময় এসেছে। গত এক দশকে ‘ডিপ টেকনলজি’ এবং উদ্ভাবনে জোর দেওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন সূচকে ভারত ৮১ থেকে একলাফে ৩৮ নম্বরে উঠে এসেছে। ১৬,৪০০-র বেশি নতুন পেটেন্টের জন্য আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ ভারতীয় স্টার্টআপগুলো এখন আর বিদেশিদের কপি-পেস্ট করছে না, বরং মৌলিক গবেষণায় মন দিয়েছে। কৃত্রিম মেধা বা এআই (AI) মিশনের হাত ধরে রোবোটিক্স, সেমিকনডাক্টর এবং মহাকাশ প্রযুক্তিতেও ভারতের নাম উজ্জ্বল হচ্ছে।
স্টার্টআপ মানেই কি শুধু বেঙ্গালুরু, মুম্বই বা গুরুগ্রাম? এই ধারণাটা ভাঙাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এবং পরিসংখ্যানে স্বস্তির খবর—দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ স্টার্টআপ এখন উঠে আসছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শহরগুলি থেকে। শিলিগুড়ি, রায়গঞ্জ বা কোচবিহারের মতো ছোট শহরের ছেলেমেয়েরাও আজ গ্লোবাল মার্কেটে পাল্লা দেওয়ার সাহস দেখাচ্ছে। ২০১৬ সালে যেখানে মাত্র ৪টি রাজ্যে স্টার্টআপ নীতি ছিল, আজ তা ছড়িয়েছে ৩০টিরও বেশি রাজ্যে। ২ লক্ষেরও বেশি স্বীকৃত স্টার্টআপ আজ ভারতের অর্থনীতির ইঞ্জিনে নতুন জ্বালানি। এর চেয়েও বড় কথা—নারীশক্তির উত্থান। স্বীকৃত স্টার্টআপগুলির ৪৫ শতাংশেই অন্তত একজন মহিলা ডিরেক্টর রয়েছেন।
সরকার এখানে চালক নয়, বরং সহায়কের ভূমিকায়। ‘অ্যাঞ্জেল ট্যাক্স’ বিলোপ করা, কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া এবং লাল ফিতের ফাঁস আলগা করার ফলে অক্সিজেন পেয়েছে নতুন কোম্পানিগুলো। ‘গভর্নমেন্ট ই-মার্কেটপ্লেস’ বা জেম (GeM) পোর্টালে ৩৫ হাজারেরও বেশি স্টার্টআপ যুক্ত হয়েছে, যারা ৫১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্ডার পেয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি কেনাকাটায় বড় বড় কর্পোরেটের একচেটিয়া অধিকার ভেঙে ছোটদের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
চ্যালেঞ্জও আছে। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে ব্রিটেনের বা ইজরায়েলের মতো দেশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে হবে। ২১টি আন্তর্জাতিক সেতু বা ‘ব্রিজ’ সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। কিন্তু আসল লড়াইটা মানসিকতার। যে দেশে সরকারি চাকরির জন্য হাহাকার, সেখানে দাঁড়িয়ে এই ‘উদ্যোগী’ হওয়ার মন্ত্র কতটা স্থায়ী হবে, তা সময় বলবে। তবে একটা কথা স্পষ্ট—ভারতীয় যুবসমাজ আর শুধু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে নেই। তারা ঝুঁকি নিতে শিখেছে। ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রি মানেই যে শুধু অন্যের অধীনে কাজ করা নয়, বরং নতুন কিছু তৈরি করা—এই বোধটা জাগছে। এই আত্মবিশ্বাসটুকুই আগামীর ভারতের আসল পুঁজি।
(লেখক কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী)
