বিমল দেবনাথ
শীত এলে ‘চলো যাই, চলো যাই। চলো যাই চলে যাই, দূর বহুদূর…’ গানটা গুনগুন করে ওঠে মনে। বাউল বাতাসের মতো হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। যেতে চাইলেই তো যাওয়া যায় না। যাওয়ার আগে ও পরে থাকে অনেক কারণ। কারণ যখন একার থাকে না, অনেকের হয়ে যায়, তখন নজরে আসে। তবে কি একা যাওয়া যায় না? যায়। ‘যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব… তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাব, একাকী যাব না, অসময়ে।’ একা হারিয়ে গেলে জীবনের ঠিকানা কাকে দিয়ে যাব? অসময় এলেই তদ্বিপরীত পরিযানের প্রয়োজন হয় বেঁচে থাকার জন্য- ‘সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাব’ কথাটা প্রমাণ করার জন্য।
হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ স্তন্যপায়ীর দেশে বা দেশান্তরে জোটবদ্ধ চলার আর এক নাম ‘মাইগ্রেশন’ বা পরিযান। পরিযানে যারা থাকে তাদের ‘পরিযায়ী’ বলা হয়। এই পরিযায়ী শব্দটা ‘করোনা’র আগে তেমনভাবে নাড়া দিত না। আগে মাইগ্রেশন বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠত মাসাই মারা-সেরেঙ্গেটির মহাপরিযানের দৃশ্য। লক্ষ লক্ষ তৃণভোজী স্তন্যপায়ী যেমন- ওয়াইল্ডিবিস্ট, জেব্রা, গেজেল হাঁটছে, দৌড়াচ্ছে। চলতে চলতে বাচ্চা প্রসব করছে। ঘাস খাচ্ছে। খেতে খেতে নিজেরাও খাদ্য হয়ে যাচ্ছে অন্য কারও। বড় বিড়াল (সিংহ, চিতা, চিতাবাঘ) ও কুমির ওঁত পেতে বসে থাকে জঙ্গলে ও জলে, বছরের সেরা উদরপূর্তির জন্য। কেউ চলে যায় চিরতরে। ‘যোগ্যতমের বেঁচে থাকা’ তথ্যে যারা বেঁচে যায় তারা বিজয়ী। ওদের যাত্রাপথ আমাদের পথের মতো ‘ফোর লেন’, ‘সিক্স লেন’ হয় না। ওদের জীবন বদ্ধ হয়ে থাকে এক অতি বৃহৎ চক্রপথে। সেই চক্রপথ কমপক্ষে ৮০০ িকলোমিটার, যেটা কোনও কোনও বছর বেড়ে হতে পারে ১৮০০ কিলোমিটার। পথে পড়ে তানজানিয়া দেশের সেরেঙ্গেটি সহ নকরোরো, মাসাওয়া সংরক্ষিত বন, ম্বালাগেটি, গ্রুমেটি নদী এবং কেনিয়ার মাসাই মারা সংরক্ষিত বন ও তার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বিখ্যাত মারা নদী। জীবনচক্রে এই চক্রপথ অনন্ত। তবুও ‘মানুষ যেমন তার মৃত্যুর অজ্ঞানে নেমে পড়ে।’ তারাও যাত্রায় নেমে পড়ে।
করোনার পরে পরিযায়ী শব্দটা অনেক বেশি পরিচিত। নদীভাঙনের উদ্বাস্তু পরাণীর শিশিরভেজা ধুলোর উঠোনে, শীত পড়লে যখন উড়ে এসে বসে পাখি, মেয়ে মালতী বলে ওঠে, ‘মা দেখো দেখো পরিযায়ী পাখি। মোহনচূড়া। স্যর বলেছে- পাখিটা শীতকালে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ইউরোপ, উত্তর এশিয়া থেকে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে চলে আসে আমাদের দেশে। এখানে পুষ্ট হয়ে গরম পড়লে আবার ফিরে যায় নিজেদের দেশে। এই রকম কত পাখি আসে! তুমি কিছু জানো না।’ মালতী কি জানে তার বাবাও পরিযায়ী? আমরা কতজন জানি এই যাওয়া আসার কারণ। আসল কারণ তো এইখানে ‘তাদের প্রথম ডিম জন্মিবার এসেছে সময়।’
প্রজনন ও ভরণ-পোষণ জন্য কত মানুষ, কত পাখি, কত তৃণভোজী প্রাণী পরিযানে যায়। পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও কক্ষপথীয় গতির ফলে যখন উত্তর গোলার্ধে তীব্র শীতে জল জমে বরফ হয়ে যায়, পরিবেশ অনুকূল থাকে না; তখন মোহনচূড়ার মতো অনেক পাখি চলে আসে দক্ষিণ গোলার্ধে। উজ্জ্বল দারুচিনি রঙের আমাদের চখাচখি পাখি, তারাও কি কম দূর থেকে আসে? সে আসে তিব্বত, উত্তর এশিয়া থেকে। ফুলের মতো ফুটে থাকে আমাদের জলা ও নদীতে।
আমাদের দাগি রাজহাঁস (বারহেডেড গুজ) আসে মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, তিব্বত থেকে হিমালয় পাড়ি দিয়ে। ডানার তলায় থাকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট! ভাবতেই মনটা কেমন উদাস হয়ে ওঠে। রাজার মতো মাথা উঁচু করে যখন হাঁটে, ওদের মাথায় দাগ দেখা গেলেও একবারও মনে হয় না ওদের দাগি। ওটা তো বয়সের মাপকাঠি। মনের ভেতর কবি বলে- ‘তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে।’ আমাদের জলায় ঘুমন্ত বুদ্ধের জল-ছবির মধ্যে দেখি মাউন্ট এভারেস্ট।
এদের মতো ফিরে ফিরে আসে- গাডোয়াল, নর্দার্ন শোভলার, ইউরেশিয়ান উইজেন, মালার্ড, হুইসলিং ডাক, ফালকেটেড ডাক, স্পট বিল, কমনশেলডাক, নর্দার্ন পিন টেইল, বৈকাল টিল, রেড ক্রেস্টেড পোচার্ড, আর কত কী! শুধু কি জলের হাঁস, আসে স্থলের পাখিও।
শুধু স্তন্যপায়ী, পাখি নয়, কীটপতঙ্গরাও পরিযানে যায়। হিমালয় থেকে বুনো মৌমাছি (এপিস ডরসাটা) বসন্ত বাতাসে ফুলের গন্ধে উতলা হয়ে শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে চলে যায় সুন্দরবনে। মধু খায়, পরাগ সংযোগ ঘটায়, প্রজনন করায়, নিজেরাও করে; তারপর নতুন প্রজন্ম নিয়ে ফিরে আসে মৌসুমি ও (বায়ুর) হিমালয়ের আলিঙ্গনের আগে।
পরিযান বিভিন্ন ধরনের, যেমন- বাসস্থানের অক্ষাংশ ধরে উত্তর থেকে দক্ষিণে, দ্রাঘিমাংশ ধরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে, উঁচু থেকে নীচু অঞ্চলে এবং তদ্বিপরীত। এছাড়াও আছে দিনের সময়কাল, আংশিক, সম্পূর্ণ, প্রাত্যহিক, চক্রচর ও মরশুমি পরিযান। পরিযান ঘটে খাদ্য ও প্রজননের জন্য। তাছাড়াও আরও কিছু ফ্যাক্টর কাজ করে। যেমন- ছোট দিন, আলোকপর্যাবৃতি (Photoperiodism) এবং মরশুমের পরিবর্তন। পরিযান সফল হয় দলের বা ঝাঁকের অভিজ্ঞ দলপতি, শরীরে চর্বির পরিমাণ, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সহজাত প্রবৃত্তি, অন্তর্নিহিত শক্তির মধ্যমে পৃথিবীর চুম্বকীয় প্রভাব বুঝতে পারা, এবং সূর্য ও তারাকে অনুভব করে।
ডুয়ার্সেও হাতিরা মরশুমি পরিযান করে। ধান, ভুট্টার মরশুমে উত্তরবঙ্গের বন থেকে হাতিরা পরিযান করে। কখনও দেশান্তরীও হয় নেপাল, ভুটানে। শুখা মরশুমে সমতলের পর্ণমোচী বন যখন ধূসর হয়ে ওঠে, হাতিরা ছোট ছোট দলে চলে যায় পাহাড়ের ঢালে মিশ্র-চিরহরিৎ বনে। সেখানে থাকে বাঁশ, কলা গাছ ও কিছু সবুজ গুল্ম ও গাছ। বর্ষায় সমতলের বন যখন আবার সবুজ হয়ে ওঠে, ওরা ফেরে ওদের চেনা পথে। এ পথ যে থাকে ওদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সহজাত প্রবৃত্তিমার্গে। ওরা কী করে বুঝবে সেখানে মানুষ থাবা বসিয়েছে। ফলত বাধে দ্বন্দ্ব। মরে হাতি, মরে মানুষ। পরিযানের নিয়ম মেনে তারাও চলার পথে, বনে প্রজনন করে, প্রসব করে- আফ্রিকার মহাপরিযানের মতো। এই জন্মমৃত্যু খেলা চলছে অবিরত। শুধু কি হাতি? মরছে পরিযায়ী পাখি। ওদের কী দোষ? বছর পরে ফিরে এসে যদি দেখে চেনা জায়গা অচেনা হয়ে গেছে; অভিবাসন স্থল নষ্ট হয়ে গেছে, হাজার হাজার মাইল দূর থেকে এসে, ওদের আর কিছুই করার থাকে না। তদ্বিপরীত পরিযানে অক্ষম হয়ে পড়ে। এমন হতে থাকলে হারিয়ে যেতে পারে চিরতরে।
অথচ ওরা কাজ করে ইকো সিস্টেম ঠিক রাখতে। পরিযানকে নিয়ে শুরু হয়েছে মাইগ্রেশন পর্যটন। এখানেও শুরু হয়েছে বার্ড পর্যটন। সৃষ্টি করছে শ্রম দিবস। উন্নত করছে স্থানীয় অর্থনীতি। তবে পরিযায়ীদের অভিবাসনের স্থান কি ঠিক থাকছে? মতামত দেবে পাঠক- মানুষ। পাখিরাও কি ভাবছে এই নিয়ে… কবির ভাষায় বলি- ‘স্কাইলাইট মাথার উপর, আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।’ কী কথা কয়?
