মুম্বই থেকে পুনের বারামতী যাওয়ার সময় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার (Ajit Pawar Dying)। এনসিপি (এসপি) নেতা শারদ পাওয়ারের ভাইপোর পুড়ে যাওয়া দেহাবশেষের পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অন্ত্যেষ্টি হলেও তাঁর অকালমৃত্যু এনসিপি-র (NCP) পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের রাজনীতিকে একটি সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
মহারাষ্ট্রে তাঁর সমসাময়িক নেতাদের মধ্যে অজিত পাওয়ার ছিলেন সেরকম বিরল নেতা যিনি কংগ্রেস (Congress), শিবসেনা এবং বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। সবথেকে বেশিবার উপমুখ্যমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ডও তাঁর। তাঁর মৃত্যু তাই মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। ভারতে আকাশপথে একাধিক দুর্ঘটনায় হাই প্রোফাইল মানুষের মৃতের তালিকায় অজিত নতুন সংযোজন।
অতীতের ঘটনাগুলির মতো তাই একাধিক প্রশ্ন উঠছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অজিতের চার্টার্ড বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়েছিল নাকি পাইলটদের ভুলে, তা নিয়ে নানা মত শোনা যাচ্ছে। সাধারণভাবে মনে করা হচ্ছে, বিমানবন্দরের দৃশ্যমানতা কম থাকায় ওই বিপর্যয় ঘটেছে। বিমানটির ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করে তদন্ত চলছে। বারামতী বিমানবন্দর নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।
অতীতেও ওই বিমানবন্দরে দুর্ঘটনা ঘটেছিল। মূলত প্রশিক্ষণ ও ভিভিআইপিদের উড়ানের জন্য ওই বিমানবন্দরটির ব্যবহার হয়। সেখানে বিমান ওঠানামার জন্য অত্যাধুনিক বন্দোবস্ত না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। আতশকাচের তলায় এসেছে অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রকও। তাদের আওতায় ডিরেক্টর জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন (ডিজিসিএ)।
গত দেড় বছরে ভারতের অসামরিক বিমান চলাচলে একাধিক বিপর্যয় ঘটেছে। এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। বেসরকারি বিমান সংস্থা ইন্ডিগো’র গাজোয়ারি দেখা গিয়েছে। মাত্রাছাড়া ভাড়া উশুল করা হয়েছে। যখন-তখন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জরুরি অবতরণ করেছে বিমান। সবই হয়েছে অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রকের নাকের ডগায়।
ঘটনা ঘটলে তবে প্রতিক্রিয়া দেয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রক। ডিজিসিএ নড়েচড়ে বসে। কিন্তু বিপর্যয়ের আঁচ পেলেও আগাম সক্রিয় হয় না। অজিতের দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটির মালিকানা যাদের, তাদের দাবি, বিমানটি নাকি নিরাপদতম। তা সত্ত্বেও কেন দুর্ঘটনা, তার জবাবদিহি করার অন্যতম দায় ওই সংস্থার।
অজিতের সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে তাঁর নিরাপত্তারক্ষী, বিমানের দুই পাইলট এবং এক ক্রু সদস্যের। এই পাঁচজনের মৃত্যুর দায় সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা, ডিজিসিএ এবং অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রক এড়াতে পারে না। দুর্ঘটনাটিতে নাশকতার তত্ত্ব তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শারদ পাওয়ার, দেবেন্দ্র ফড়নবিশরা অবশ্য সেই তত্ত্ব খারিজ করে দিয়েছেন।
তবে মৃত্যু ছাপিয়ে এই মুহূর্তে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রশ্ন হল, অজিতের শূন্যস্থানে কে? অজিতহীন এনসিপি-র ভবিষ্যৎ নিয়েও নানাবিধ জল্পনা। এনসিপি মহারাষ্ট্রে বিজেপির নেতৃত্বাধীন মহায্যুতি সরকারের শরিক। অজিতের স্ত্রী সুনেত্রা এবং ছেলে পার্থের মধ্যে কাউকে মন্ত্রীসভায় নেওয়া হবে কি না বা বারামতী আসনে প্রার্থী করা হবে কি না- নির্ভর করছে পাওয়ার পরিবার এবং বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর।
এনসিপি নেতারা অবশ্য সুনেত্রাকেই স্বামীর শূন্যস্থানে বসানোর চিন্তাভাবনা করছেন। রাজনৈতিকভাবে সুনেত্রা কখনও অজিতের বিকল্প নন। সেক্ষেত্রে এনসিপি-র জনপ্রতিনিধিদের বিজেপিতে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর আগে অজিত দুই এনসিপি এবং পাওয়ার পরিবারের মধ্যে যাবতীয় বিরোধ দূর করতে সক্রিয় হয়েছিলেন।
শারদের সময় থেকে অজিত এনসিপি-র ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্র ছিলেন। ফলে এনসিপি-র অজিত ও শারদ গোষ্ঠীর সংযুক্তির সম্ভাবনাও যথেষ্ট। সেক্ষেত্রে সুনেত্রাকে টপকে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে উঠে আসতে পারেন বারামতীর সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে। সাম্প্রতিক পুরভোটে দুই গোষ্ঠীর জোটের সময় অজিতের সঙ্গে সুপ্রিয়াকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছিল।
এনসিপি-র দুই গোষ্ঠী মিশে গেলে শারদ-সুপ্রিয়ার শেষপর্যন্ত ‘ইন্ডিয়া’ জোটে থাকা নিয়ে সংশয় দেখা দিতে বাধ্য। অজিতহীন মহারাষ্ট্রের ‘পাওয়ার পলিটিক্স’-এর রাশ বিজেপি না শারদ- কার হাতে যায়, সেটাই দেখার।
